এক্সপ্লেইনার
ট্রাম্পকে গালিবাফের ‘ম্যাথ মিসাইল’: মার্কিন সুদের হার ইরানের হাতে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ছবি: এএফপি/কোলাজ
আল জাজিরা
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৭ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৫৭
চলমান সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইরান বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত হেনেছে। কিন্তু দেশটির স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি অপ্রত্যাশিত হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন। যেটিকে বলা হচ্ছে ‘ম্যাথ মিসাইল’ বা গণিতের ক্ষেপণাস্ত্র।
যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনায় প্রধান আলোচক ছিলেন গালিবাফ। গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে তিনি একটি পোস্ট দেন। সেখানে ‘টেইলর ইকুয়েশন’-এর একটি সংস্করণ লিখেছেন। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার নির্ধারণের জন্য এই সূত্র ব্যবহার করে।
গালিবাফ লিখেছেন, ‘দেখা যাক, সুদের হার বৃদ্ধি এসওএইচ (হরমুজ প্রণালি) উন্মুক্ত ও এক ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে পারে কি না।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আপনি ২৫ বিপি (বেসিস পয়েন্টস) দিয়ে কৌশলগত জলপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। এটি এসওএইচ রিস্ক প্রিমিয়াম, আর এটা আমরা নির্ধারণ করি।’
এসওএইচ রিস্ক প্রিমিয়াম বলতে গালিবাফ সম্ভবত হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের অতিরিক্ত মূল্য যোগ হওয়াকে বুঝিয়েছেন। তাঁর এই পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ২৫ বিপি (০.২৫ শতাংশ) বাড়িয়ে দেয়।
Straits Taylor Rule: i = r* + π* + 1.5(π−π*) + 0.5(y−y*) + α(SOH−SOH*) + β(BEM−BEM*), α,β > 0 Let’s see if a hike could open SOH or produce a single barrel :) You can’t 25bp a chokepoint and r* isn’t neutral. It’s SOH risk premium, and We set it. Stay unanchored !
— محمدباقر قالیباف | MB Ghalibaf (@mb_ghalibaf) September 16, 2026
সংঘাত শুরুর দিকে গালিবাফ প্রায়ই আর্থিক যুক্তি ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনা পদ্ধতিকে ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি দাবি করতেন, ইরান অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে। এবার তিনি ব্যঙ্গের মাধ্যম হিসেবে গণিতকে বেছে নিলেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি অসাধারণ প্রচারমূলক কৌশল। ২০২৬ সালে অন্য কিছু না হলেও, ইরান তার মার্কিন প্রতিপক্ষকে উসকে দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।’
কিন্তু গণিতের সূত্রটি দিয়ে গালিবাফ আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? টেইলর ইকুয়েশন কী? ইরানের যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারকে প্রভাবিত করেছে?
গালিবাফের উল্লেখ করা টেইলর ইকুয়েশন কী?
এটি একটি গাণিতিক সমীকরণ। অর্থনীতিবিদেরা এটি ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির শক্তির ওপর ভিত্তি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কত হওয়া উচিত তা অনুমান করেন।
১৯৯০ এর দশকের শুরুতে অর্থনীতিবিদ জন টেইলর সূত্রটি তৈরি করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ফান্ডস রেট-এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও ‘আউটপুট গ্যাপ’-এর সম্পর্ক দেখানো হয়। আউটপুট গ্যাপ বলতে প্রকৃত অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের মধ্যকার পার্থক্যকে বোঝায়।
সূত্রটি হলো: সুদের হার= মূল্যস্ফীতি+০.৫ (আউটপুট গ্যাপ)+০.৫ (মূল্যস্ফীতি-২%)+২%
এর অর্থ, মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে গেলে অথবা অর্থনৈতিক উৎপাদন সম্ভাব্য উৎপাদনের চেয়ে বেশি হলে প্রস্তাবিত সুদের হার বাড়ে। মূল্যস্ফীতি কমলে বা অর্থনীতি সম্ভাব্য উৎপাদনের নিচে থাকলে সুদের হার কমে।
এই সমীকরণ একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। তবে কঠোরভাবে অনুসরণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সুদের হার নির্ধারণের সময় মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নীতি নির্ধারকরা অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয়ও বিবেচনা করেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন সুদের হার বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্ক, যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিপুল বিনিয়োগ মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ শক্তিশালী হয়েছে।
তিন বছরের মধ্যে গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো সুদের হার ২৫বিপি বাড়ায় ফেডারেল রিজার্ভ। এরপর ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াই পেট্রলের দাম বাড়িয়েছে। সুদের হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
আইজি গ্রুপের বিউচ্যাম্প বলেন, বন্ডের ইল্ড (বন্ড বিনিয়োগ থেকে পাওয়া বার্ষিক রিটার্ন) ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মিলে ফেডকে কোণঠাসা পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ পরিকল্পনাবিদ সুসান্নাহ স্ট্রিচার বলছেন, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তাই সুদের হার বাড়ানোর পেছনে অবশ্যই চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপরিশোধিত তেলের বাড়তি দামের প্রভাব আছে।
ইরান কি মার্কিন সুদের হার নির্ধারণ করছে?
সংক্ষেপে বললে, না। যুদ্ধ ও তেলের দাম বৃদ্ধি ফেডের সিদ্ধান্তে অবশ্যই প্রভাব ফেলছে। তবে এগুলোই সুদের হার নির্ধারণের একমাত্র কারণ নয় বলে সতর্ক করেছেন সুসান্নাহ স্ট্রিচার।
সুসান্নাহ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পরিচালনার পেছনে বিপুল ব্যয়ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। শক্তিশালী মূলধনী বিনিয়োগ এবং দেশের অভ্যন্তরের স্থিতিশীল চাহিদা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়েছে। তাই নীতিনির্ধারকরা পুরো পরিস্থিতিই বিবেচনায় নিয়েছেন।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ পরিকল্পনাবিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতিকে প্রভাবিত করে এমন কিছু বিষয়ের ওপর তেহরানের প্রভাব আছে। যেমন- যুদ্ধ ও তেল সরবরাহ। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা মার্কিন সুদের হার নির্ধারণ করছে না। ফেডারেল রিজার্ভ আরও বিস্তৃত পরিস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সুসান্নাহ স্ট্রিচার ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসকে প্রভাবিত করেছে। তবে সুদের হার কোথায় নির্ধারণ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভের। নীতিনির্ধারকরা আরও অনেক অর্থনৈতিক তথ্য বিবেচনা করেন।
গালিবাফের গাণিতিক ব্যঙ্গের পেছনে কী আছে?
ইরানি স্পিকারের পোস্টের একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নিগার মোর্তাজাভি। তিনি বলেন, গালিবাফ বোঝাতে চেয়েছেন, মার্কিন সুদের হার বাড়লেই হরমুজ প্রণালি খুলবে না।
গালিবাফ ফেডারেল রিজার্ভের গাণিতিক ভাষা প্রয়োগ করে বোঝাতে চেয়েছেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি অংশ সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে। সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তেহরান প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা রাখে।
নিগার মোর্তাজাভি আরও বলেন, এটি (গালিবাফের পোস্ট) সুদের হার নির্ধারণের কোনো প্রস্তাব নয়। বরং ইরানের হাতে থাকা সুবিধাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানে পোস্টের সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ফেড যখন সুদের হার বাড়ায়, গালিবাফ তখনই পোস্ট করেন। তিনি বারবার অর্থনীতি নিয়ে পোস্ট করে মার্কিন নাগরিকদেরকে যুদ্ধের মূল্য সংক্রান্ত বার্তা দিতে চেয়েছেন।