ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরান কেন আঞ্চলিক বিমানবন্দর নিয়ে হুমকি দিচ্ছে, প্রভাব কী হতে পারে

ইরান কেন আঞ্চলিক বিমানবন্দর নিয়ে হুমকি দিচ্ছে, প্রভাব কী হতে পারে
×

ছবি: আল-জাজিরা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫৯

ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে তেহরান। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সহযোগিতা করবে, সেসব দেশের বিমানবন্দর থেকে ইরানের সঙ্গে আর কোনো ফ্লাইট চলতে দেওয়া হবে না।

ইরানের এই হুমকি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিমান পরিবহন খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে আজারবাইজান ও জর্জিয়া ইরানের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সব ফ্লাইটও বৃহস্পতিবার বাতিল করা হয়েছে। বাগদাদ ও মাসকাটের ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে। তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে কিছু ফ্লাইট চালু থাকলেও বেশ কিছু সংযোগ বাতিল হয়েছে।

কেন এই হুমকি
ইরানের বিমান পরিবহন খাতের ওপর চাপ বাড়াতে চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় দেশটির আরও কয়েকটি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা মাহান এয়ারের পাশাপাশি মোট ২৭টি ইরানি বিমান সংস্থাকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাহান এয়ারের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সম্পর্ক রয়েছে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, যেসব বিমানবন্দর বা প্রতিষ্ঠান ইরানি বিমানকে সেবা দেবে, তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইরানি বিমানকে জ্বালানি দেওয়া, অবতরণের সুযোগ দেওয়া কিংবা টিকিট বিক্রির মতো সেবাও এর আওতায় পড়তে পারে।

এর ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরান কি সত্যিই প্রতিবেশী দেশের বিমানবন্দর অচল করতে পারবে?
ইরানের হুমকির ধরন এখনো স্পষ্ট নয়। তেহরান স্পষ্ট করে জানায়নি, তারা কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক নাকি সামরিক পদক্ষেপের কথা বলছে।

অন্য দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডে থাকা বিমানবন্দর ইরান আইনগতভাবে বন্ধ করে দিতে পারে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি অন্য দেশের বিমানবন্দর বা আকাশসীমা বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহকারী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার ও টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি বিমানকে সেবা দিতে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং অস্ট্রিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে উলফগ্যাং পুস্তাই মনে করেন, এবার ইরান আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালাবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

তিনি বলেন, তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীন ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করবে বলে তিনি মনে করেন না। এ ছাড়া অন্য দেশের বিমান সংস্থাগুলোও ইরানে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাব কিছুটা সীমিত থাকতে পারে।

তবে ইরানের জন্য এর মানসিক প্রভাব বড় হতে পারে বলে মনে করেন পুস্তাই। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট একের পর এক বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ ইরানিরা দেশটির ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা সরাসরি অনুভব করবেন।

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের শুরুতেও মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর এসব দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

পরে ধীরে ধীরে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু হয়। তবে স্বাভাবিক সূচিতে ফিরতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমান সংস্থাগুলোর কয়েক মাস লেগেছে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) বলছে, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিত ক্ষতি ৪৩০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের হিসাবে, সংঘাতের কারণে মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ডলার কমে গিয়েছিল। একই সময়ে ট্যুরিজম ইকোনমিকসের পূর্বাভাস ছিল, যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ২৫ শতাংশ কমতে পারে।

পর্যটন খাতে প্রভাব
নতুন নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে ইরানি যাত্রীদের ওপর। বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ইরান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আসন সক্ষমতা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯ শতাংশ কম ছিল।

নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা আরও কমে যাওয়ায় হাজারো যাত্রী তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশের স্থলসীমান্ত ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এর প্রভাব শুধু যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের বিমান পরিবহন খাতের পাশাপাশি পর্যটন ও হোটেল ব্যবসাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে হাজারো কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতেও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। চলমান সংঘাতের মধ্যেই আঞ্চলিক পর্যটন বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী চলাচল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কমেছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

আরও পড়ুন

×