গায়ক-অভিনেতা নয়, চীনা তরুণদের মাঝে জনপ্রিয়তা বাড়ছে এক নৃবিজ্ঞানীর
দেশ দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেক চীনা তরুণ। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
বিবিসি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:১১ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:২২
চীনে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়া তরুণদের কাছে অনেকটা পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন বিয়াও শিয়াং (৫৪)। তিনি পপ সংগীত শিল্পী কিংবা চলচ্চিত্র অভিনেতা নন, নৃবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক। কেউ কেউ তাঁকে ‘আইডল’ বলে মনে করেন। কারও ভাষায় বিয়াও ‘স্বর্গ থেকে পাঠানো এক তারকা’।
দেশটিতে অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে অনেক বিষয় জেন-জি প্রজন্মকে ভাবিয়ে তুলছে। এর মধ্যে আছে চাকরি, প্রেমের সম্পর্কের সম্ভাবনা ও অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চাপ। এমন পরিস্থিতিতে অধ্যাপক বিয়াও তরুণদের উদ্বেগ ও তা মোকাবিলার দিকনির্দেশনা দেন।
জার্মানিতে বসবাসরত বিয়াও শিয়াং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির পরিচালক। তিনি চীন ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন।
শিয়াং মনে করেন, চীনা সমাজ বর্তমানে পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে আছে। দ্রুত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পাশাপাশি মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজছে। কারণ, চীনা সমাজে বৈপরীত্য স্পষ্ট। ব্যাপক অগ্রগতি সত্ত্বেও তরুণরা হতাশ। এসবের পেছনে কী কাজ করে, সেটি বিশ্লেষণ করাই তাঁর কাজ।
চীনের নেতা শি জিনপিংও সামাজিক বৈপরীত্যের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, উন্নত জীবনের জন্য মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ভারসাম্যহীনর বিষয়টি প্রধান দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে থাকা বিষয়গুলো সহজে মনে রাখার জন্য শিয়াং কিছু শব্দ ব্যবহার করেন। এর একটি হলো ‘ফ্লোটিং’। টিকে থাকার জন্য যারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে তাদেরকে তিনি ফ্লোটিং হিসেবে চিহ্নিত করেন। এ ধরনের মানুষ অনেকটা হামিংবার্ডের মতো। তারা মাঝ আকাশে স্থির থাকতে ক্রমাগত ডানা ঝাপটায়।

আরেক ধরনের মানুষকে অধ্যাপক শিয়াং ‘দ্য নিয়ারবাই’ বলে চিহ্নিত করেছেন। এ ধরনের মানুষ নিজেদের নিয়ে এবং দূরের কোনো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। এ দুইয়ের মাঝখানের জায়গাটি তাদের কাছে উপেক্ষিত থাকে। ফলে এক সময় তারা নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করে।
সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অধ্যাপক শিয়াং। সেখানে নানা বয়সী প্রায় ৫০০ শ্রোতা ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে কয়েকজনকে শিয়াংয়ের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
চীনের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোও শিয়াংয়ের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি নিজেও পড়াশোনা করেছেন। মিলনায়তনে জায়গা না থাকায় কর্তৃপক্ষ শিয়াংয়ের ভাষণ অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করেছিল।
চীনা গণমাধ্যমের ভাষ্য, দেশটিতে একটি কথা এখন বেশ প্রচলিত। সেটি হলো- ‘সংশয় থাকলে বিয়াও শিয়াংকে জিজ্ঞেস করুন।’
সিঙ্গাপুরের অনুষ্ঠানে শিয়াং বলেন, তরুণরা নানা মাধ্যমের কাছে থেকে যোগ্যতার স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া থেকে শুরু করে চাকরির নিরাপত্তাও স্বীকৃতির মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এতে মানুষ ক্লান্ত ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিয়াংয়ের পরামর্শ, নিজের সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়ার স্বাস্থ্যকর উপায় হলো অন্য মানুষের কথা শোনা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা জানা। এটি আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার বদলে আত্মবোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।

চীনে কোনো কিছু নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করাটা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। অনেক মতামত কঠোরভাবে নজরদারি করা হয়। অধ্যাপক শিয়াং বলেন, ‘সমস্যাটা কোথায়, তা সবাই জানে। কিন্তু এ নিয়ে কথা বলতে তারা অনিচ্ছুক। তবে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বিষয়টিকে বর্ণনা করতে পারলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
চীনা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম রেডনোটের এক ব্যবহারকারী শিয়াং সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি ব্যক্তিগত চাপের পেছনে বৃহত্তর সামাজিক কারণগুলো তুলে ধরেন। সব সময় দুর্বল ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখেন।’
আরেকজন লিখেছেন, ‘তিনি কখনো ফাঁকা বা শুধু ভালো লাগার জন্য কথা বলেন না। বরং বাস্তব জীবনের সংকটগুলো মোকাবিলায় আমাদের পাশে দাঁড়ান।’
সিঙ্গাপুরের ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এক তরুণী বলেন, স্কুল থেকে বাস্তব জীবনে প্রবেশের সময় অনেকে অনিশ্চয়তায় থাকেন। কীভাবে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা না জানায় মানুষ প্রায়ই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললে দেশে ফিরে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তাই ওই তরুণী নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, মানুষের জীবনে নির্ভরতার জায়গা প্রয়োজন। অধ্যাপক শিয়াংয়ের কথাগুলো শুনলে মনে হয়, তিনি আসলেই অন্যের পরিস্থিতি বোঝেন।
- বিষয় :
- উদ্বেগ
- প্রযুক্তি
- সামাজিক দূরত্ব
- তরুণ প্রজন্ম
- অধ্যাপক