ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরানের গহীন ভিতর

পরানের গহীন ভিতর
×

সালেহীন শিপ্রা

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আপাতচোখে বাংলার প্রকৃতি-প্রেম-নারী-পুরুষ-কাম-রতি-অভিমান-বাসনার মুক্তোয় গাঁথা এক কাব্যহার যেন সৈয়দ শামসুল হকের পরানের গহীন ভিতর (প্রথম প্রকাশ : ১৯৮০)। আমরা যেখানে জানিই যে “পরান” একটি গহীন-গভীর বিষয়, সেখানে কবি শুধু এ শব্দে থেমে থাকেননি, যেন তিনি যে গভীরতা ছুঁতে বা দেখাতে চেয়েছেন তা আরও বেশি গাঢ়। তিনি চেয়েছেন সেই গহীন পরানেরও আরও গহীন ভেতর পর্যন্ত আবিষ্কার করে তা কবিতার ভাষায় প্রকাশ করতে। আর তাতে তিনি সঙ্গ নিয়েছেন এ বাংলারই মাটি, নদী ও প্রকৃতির। তবে এ বাংলা পুরো বাংলাদেশ ঠিক নয়, স্থানিকভাবে তা তার নিজস্ব এলাকা তিস্তা ও যমুনাপারের অঞ্চল, বিশেষ করে কুড়িগ্রাম-রংপুর অঞ্চল।
এ অঞ্চলের প্রকৃতির অংশ যে গাছগুলো তা বিভিন্ন ভঙ্গিতে অঙ্গীভূত হয়েছে তাঁর এ কাব্যের কবিতায়। এখানে গ্রামের শেষ সীমানায় থাকে বটের বৈরাগী চুল, গাবের বাবরি চুল, জিগার গাছের আঠায় আটকে পড়া তুলার ফুল, পথের পাশের বাজপড়া খাড়া তালগাছ। আছে খেজুরগাছ তার টুপটুপে রস নিয়ে, আম আছে সুঘ্রাণ নিয়ে। আছে শিমের মাচা, বাতাসের কোলে মাথা রেখে ঘুমানো কুশাল বা আখক্ষেতের দৃশ্য। এসব এ অঞ্চলেরই প্রকৃতি। যখন কোনো সাহিত্যিক তাঁর লেখায় চরিত্রগুলোর মাধ্যমে কোনো অঞ্চলের উপভাষা (dialect), পোশাক, রীতিনীতি এবং ভূপ্রকৃতিকে হুবহু ফুটিয়ে তোলেন তখন তাকে Local Color Writing বলা হয়। আর সাহিত্যকর্মটি কবিতা হলে তাকে বলে রিজিওনাল পোয়েট্রি বা Place Poetry. জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা যেমন Place Poetry এর অনন্য উদাহরণ। উত্তর বাংলার ভাষা ও কথ্যরীতি যেভাবে এ কাব্যের ৩৩টি অক্ষরবৃত্তের ১৮ মাত্রার সনেটে এসেছে তা পরিমিত, যথাযথ এবং সুন্দর। ক্রিয়াপদ হিসেবে “বারায় (বের হয়), তালাশ করা (খোঁজ করা), ঘুন্নি দেয়া, পিন্ধায়া, ছাড়ান দিয়া, কানতে আছে, পড়তাছে।” এ ছাড়া অন্যসব শব্দ যেমন– নাজাই (শেষ হয়ে যাওয়া), কুশাল (আখ), বেবাক, বারুন, দুফরবেলা, এক্কেরে, কী করুম, গেরেপ্তার ইত্যাদি। ১৫ নম্বর সনেটে পাই,
“তয় কি তোমারে আমি ফাঁকি দিয়া পিছন বাড়িতে
যামু তার কাছে কও আমারে যে দিতে চায় পান?
অথবা জিগার ডালে ফাঁসি নিয়া নিজের শাড়িতে
ভূত হয়া তোমার গামছায় দিমু আন্ধারে টান?”
এই যে অভিমানে নিজের শাড়িতে ফাঁস নিতে চাওয়া নারীর দেখা পাওয়া যাচ্ছে এ সনেটে তাতে মনে হতে পারে যে ৩৩টি সনেটজুড়ে কেবল একজন নারীর মনোলগই উপস্থিত। কিন্তু ভালোভাবে খেয়াল করলে ভিন্ন ভিন্ন সনেটে ভিন্ন 

ভিন্ন নারীর দেখা পাওয়া যায়। ভূমিকা সনেট বা ১ নম্বর সনেটে গ্রাম্য হাটে যে বাজিকরের বর্ণনা তার ভেতরে সৃষ্ট ও স্রষ্টার যেন এক হেঁয়ালিমাখা সম্পর্কের আভাস পাই। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের উত্থান-পতন, নদীর ভাঙনে গড়া ও হারিয়ে ফেলা যেন এক জাদুর মতোই ঘটতে থাকে। মানুষের জীবনে অন্য মানুষ আসা, আবার হারিয়ে যাওয়া। জীবনে প্রেম আসা আবার হারিয়ে যাওয়া। ২ নম্বর সনেটেই আন্ধার তোরঙ্গে কি জানি তালাশ করা এক নারীর দেখা পাই, দেখা পাই তার বৈরাগী মন, ছায়াঘেরা উঠোনে নিকটজনদের লাশ আর পাই,
“জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন
তাই কি তোমার দেহে ল্যাহা তিন বাইন তালাক?”
অথচ ৪ নম্বর সনেটে আবার এক সংসারী নারী পাই যে কিনা স্বামীর কাছে অবহেলিত।
“আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছান নিয়ে ক্যান অন্য ধানক্ষেত রোয়?–
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।”
৫ নম্বর সনেট আবার এমন যে, না আছে যাওয়ার ঘর, না তার কাছেও কেউ ফেরে। কেবল শূন্যতার বুনন–
“আসুম? আসার মতো আমি কোনো ঘর দেখি নাই।
যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়া গ্যাছে যে বেবাক”
এবং
“পাখিরা উড়াল দিয়া গ্যাছে গিয়া, এখন বিরান,
এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান,
সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর কী সে খায়?”
আবার ৬ নম্বর সনেটে পাই ভিন্ন এক সংসারী নারী। দুপুরে যখন কামের লোকেরা ব্যস্ত, বাচ্চারা দূরে তখন শরীরী প্রেম এইভাবে বর্ণনা করেছেন কবি,
“তোমার খামাচির দাগ এখনো কি টকটকা লাল,
এখনো জ্বলন তার চোতরার পাতার লাহান।
শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কী সোন্দর গাল,
না হয় দুফুরবেলা একবার দিছিলাম টান।”
আবার পরের সনেটেই একলা একজন যার সব হারিয়ে গেছে। চোর যুবতীদের নিয়ে তার ভয়, তার বুকের ভেতরে শিস দিয়ে সন্ধ্যা হাঁটে। সব হারিয়ে ফেলা হঠাৎ অচেনা জগতে সে নিজের দুঃখের সাথে বৃক্ষ ও নদীর দুঃখের তুলনা করে,
“মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান,
আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার।
আমার তো গ্যাছে এক, কত লক্ষ কোটি গ্যাছে তার।”
পরের দুই সনেট এই দুঃখের বর্ধিত আলাপ ও ব্যাখ্যা যেন। কেবল প্রশ্ন নিয়ে আসে। কেন মোচড়ায় মানুষের মন? দুঃখ দিয়ে সুখ পায় এমনকি চলে যায় অপরের ঘরে। সেখানে একাকিত্ব বর্ণিত হয়,
“আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক,
আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর,
আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোঁক।”
এইসব পতিপ্রেমী নারীর পাশে আবার এক অন্য নারীর দেখাও পাই, যাকে কেউ ডাক দেয়, আর সেভাবে যে ডাকের জবাব দেবে কিনা। তার মনে যমুনার ছিপছিপা নাও ছিনতাই করে তার সাথে নিরুদ্দেশ হওয়ার বাসনা প্রস্ফুটিত থাকে।
আবার “ইসের বেটি”-কে ডাক দিয়ে বিয়ের কথা বলতে থাকা সনেটে নারীর শরম লুকানোর জায়গাকে শিমুলের চেয়েও লাল বলছেন, বলছেন বিয়ের পর এ শরম আর থাকবে না।
যেন এক সব হারানো নারী তার পার করে আসা জীবনের পরতে পরতে থাকা নারীজীবনের সাথে কথা বলছে একের পর এক।
“কিসে যে চালনা করে, এই দেহ এই ভবিষ্যৎ–
কিছুই বুঝি না শুধু আচানক শেষ হয় পথ।”
শুধু কি নারীরই মনোলগ? কিছু সনেট নারী-পুরুষ ছাপিয়ে মানবসত্তার উত্তরহীন প্রশ্নের দিকে ধাবিত।
“আমার মতন যারা ছিল এই মাটির উপর, এখন কবরে গ্যাছে,
করি আমি তাদেরই বাজার। এরেই বন্ধন কয়?,
এর থিকা মুক্তি কারো নাই।”
কিংবা,
“আসলে ভাষাই হইলো একমাত্র ভাবের পালক”
“ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর”
“মানুষে মানুষে নাই কোনো ভেদ দুঃখের ভিতর।”
এ কাব্যের পরতে পরতে যমুনা আর তিস্তা। তাদের নানান রূপ। কখনও চারপাশ ছাপিয়ে বন্যা, কখনও খরায় মলিন তাই ডেকে আনে আকালের দিন, কখনও যমুনার বিধ্বংসতায় দুঃখী হয়ে ওঠা যমুনারই কিনার, কখনও দুই গাঙ এক হয়ে যাওয়া, কখনও সে কাল যমুনা যে কিনা নিয়ে গেছে রঙিলা নাও।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন তো এক হার না মানা প্রাণ। ৩২ নম্বর সনেটে তাই ধ্বংসের পরে ধ্বংস থেকে জেগে ওঠার দেখা পাই। হাল না ছেড়ে পাই আবার শুরুর প্রতিজ্ঞা,
“তবুই আবার আমি ধনেশের মত দিয়া ডাক
আবার পাথার বন পথ ঘাট বাজার সংসার
তালাশ করুম আর গাভীনের করুম সন্ধান,
আবার দেখুম আমি ছাই-পোকা মাজরার ঝাঁক,
কিভাবে আমার খ্যাত করে সব শস্য ছারখার,
আবারও বুনুম আমি এই খ্যাতে কাউনের ধান।” 
 

 

আরও পড়ুন

×