শ্রদ্ধাঞ্জলি
জীবনানন্দ দাশ: প্রেম ও প্রকৃতির বিশ্বজনীন কবি
জীবনানন্দ দাশ [জন্ম :১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯-মৃত্যু :২২ অক্টোবর, ১৯৫৪]
সৈয়দা আইরিন জামান
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০
'আমার পায়ের শব্দ শোনো-
নতুন এ- আর সব হারানো- পুরানো।'
উদ্ধৃত পঙ্ক্তি দুটি কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' কাব্যগ্রন্থের 'কয়েকটি লাইন' কবিতার অন্তর্ভুক্ত। জীবনানন্দ সম্পর্কে প্রবোধ সান্যাল বলেছেন, `The greatest poet and philosopher of the age.' তিরিশের দশকে সাহিত্যিক উত্থান পর্ব থেকে আজ অবধি তিনি একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবেই কাব্য পাঠক এবং কাব্য সমালোচকের কাছে সমাদৃত হচ্ছেন। সমালোচকরা তাকে 'কবির কবি বা Poet’s Poet অভিধা দিয়েছেন। কবির কবিতা পাঠ করলে মনে হয়, আমাদের চিরচেনা পৃথিবীর বিশাল একটি অধ্যায় তিনি আমাদের জন্য অনুবাদ করে রেখে গেছেন। ক্লিনটন বি. সিলির ভাষায় : 'জীবনানন্দ নিঃসন্দেহে সাধারণ ছিলেন না, কবি হিসেবে নন বা মানুষ হিসেবে নন। তিনি সোজা কথায় অসাধারণ নির্জনতম একজন কবি।'
জীবনানন্দের প্রথম এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে 'ঝরা পালক' (১৯২৭) ও 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' (১৯৩৬)। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'বনলতা সেন' ১৯৪২ সালে 'কবিতা ভবন' থেকে এক পয়সার একটি কবিতা সিরিজে প্রকাশিত হলে চারদিকে রীতিমতো সাড়া পড়ে গিয়েছিল। তারও আগে 'বনলতা সেন' কবিতাটি জীবনানন্দ যখন কবিতা পত্রিকায় প্রকাশের জন্য ডাকযোগে পাঠান, তখনই কবিতাটি পাঠের পরে বুদ্ধদেব বসু এবং প্রেমেন্দ্র মিত্র মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রেমেন্দ্র মিত্রই প্রথম জানিয়েছিলেন 'বনলতা সেন' কবিতার সঙ্গে অ্যালেন পো রচিত `To Hellen' কবিতার সাদৃশ্যের কথা। জীবনানন্দ 'বিদিশা' এবং 'শ্রাবস্তী' শব্দ দুটি প্রয়োগ করেছেন ক্ল্যাসিক চেতনাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য আর 'অ্যালেন পো'-এর লেখায় এভাবে গ্রিস ও রোমের স্মৃতি জাগরিত :
To the glory that was Greece
and the grandeur that was Rome.
জীবনানন্দ তার পাঠকের কাছে প্রথমত এবং প্রধানত 'বনলতা সেন'-এর কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত। কবিতাটি প্রকাশের পর থেকেই এটি ধ্রুপদি বা ক্ল্যাসিক কবিতা হিসেবে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনই পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষেও অবস্থান করছে। স্বাভাবিকভাবেই এই 'বনলতা সেন'কে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন রয়েছে। 'বিভাব' জীবনানন্দ দাশ জন্মশতবর্ষ স্মরণ সংখ্যায় জীবনানন্দের লেখা Literary Notes বা দিনলিপি (পাঁচ নম্বর খাতা) পড়লে বোঝা যায় 'Y' বর্ণের আড়ালে তিনি তার একজন প্রেমিকার নাম গোপন করেছেন। এই 'Y' জীবনানন্দের খুড়তুতো বোন।
শোভনা দাশগুপ্ত (বেবি : y)। তারা বিশের দশক বরিশালে কাটিয়েছেন। তিরিশের দশকের প্রথমভাগে জীবনানন্দ কলকাতার প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকার সময়ে আমার 'Y' বলে একজন মহিলাকে একান্তভাবে বিশেষিত করেছেন। এই নারী স্বয়ং কবির পরিচিত সেই গ্রাম্য কিশোরী :
... কাঁচপোকা টিপ তুমি কপালের 'পরে
পরিয়াছ- তারপর ঘুমায়েছ; কল্ক্কাপাড় আঁচলটি ঝরে
পানের বাটার 'পরে; নোনার মতন নম্র শরীরটি পাতি
নির্জন পালঙ্কে তুমি ঘুমায়েছ ...
(অশ্বত্থ বটের পথে, রূপসী বাংলা)
প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক'-এর কোনো কবিতায় প্রেম যে গভীর ছায়া ফেলেছে তা নয়, তবে কাউকে খুঁজে না পাওয়ার বেদনা কবিকে জেরবার করে তুলেছে :
একদিন খুঁজেছিনু যারে
বকের পাখার ভিড়ে, বাদলের গোধূলি-আঁধারে,
মালতীলতার বনে,- কদমের তলে,
নিঝুম ঘুমের ঘাটে,- কেয়াফুল,- শেফালীর দলে!
-যাহারে খুঁজিয়াছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে
(একদিন খুঁজেছিনু যারে, ঝরা পালক)
আবার ছায়া-প্রিয়া কবিতাটিতে কিশোর বেলার সই-এর কথা বলেছেন : এল আমার ছায়া-প্রিয়া
কিশোর বেলার সই গো!
তবে এই কাব্যগ্রন্থের 'নীলিমা' কবিতাটি সমসাময়িক কাব্যপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'র প্রথম কবিতায় প্রেমিকার উদ্দেশ্যে কবির সকল গান উৎসারিত :
তুমি তা জানো না কিছু- না জানিলে
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;
(নির্জন স্বাক্ষর, ধূসর পাণ্ডুলিপি)
এই কাব্যগ্রন্থের '১৩৩৩' কবিতাটিতে কবি অতীতচারী হয়েছেন। মানস প্রেমিকার ফিরে আসা-না আসার দ্বিধাদ্বন্দ্ব কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। তার চোখ ম্লান হয়ে গেছে। কবি ছিঁড়ে গেছেন, ফেড়ে গেছেন। প্রেমিকা ফেরেনি, ফেরার কোনো সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন না। এক কথায় '১৩৩৩' কবিতাটি প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লেখা প্রেমের শোকগাথা :
'তোমার শরীর,-
তাই নিয়ে এসেছিলে একবার; - তারপর,- মানুষের ভিড়
রাত্রি আর দিন
তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন দিকে জানিনি তা,- হয়েছে মলিন।
... তুমি চ'লে গেছ, তবু কেন আমি
রয়েছি দাঁড়ায়ে!
নক্ষত্র সরিয়া যায়,- তবু কেন আমার এ পায়ে
হারায়ে ফেলেছি পথ-চলার পিপাসা!
একবার ভালোবেসে কেন আমি ভালোবাসি সেই ভালোবাসা!'
(১৩৩৩, ধূসর পাণ্ডুলিপি)
এই কবিই পঁচিশ বছর ব্যবধানে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হবার একান্ত অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন। পঁচিশ বছর শেষ হবার অভিপ্রায়ে তিনি বিলাপ করেছেন :
... নক্ষত্র যে বেগে
ছুটিছে আকাশে,
তার চেয়ে আগে চ'লে আসে
যদিও সময়,-
পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয়!-
(পঁচিশ বছর পরে, ধূসর পাণ্ডুলিপি)
'বনলতা সেন' কাব্যগ্রন্থেও 'কুড়ি বছর পরে' নামক
প্রায় একই অন্তর্বয়নের একটি কবিতা রয়েছে।
'বনলতা সেন' এককভাবে জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ।
এ প্রসঙ্গে নরেশ গুহ লিখেছেন- 'বনলতা সেন' যখন ষোলো পৃষ্ঠার বই হয়ে প্রথম বেরিয়েছিল তখন আমাদেরই কোনো বন্ধু- কবিতা লিখতেন না তিনি- একসঙ্গে তার পনেরো কুড়ি কপি কিনে সব বন্ধুকে উপহার দিয়েছিলেন। সেসব কবিতা একা একা উপভোগ করা তার কাছে মনে হয়েছিল স্বার্থপরতা। 'বনলতা সেন' কবিতায় 'বনলতা সেন' নামক এক অনন্যসাধারণ নারীকে কবির তাবৎ অস্তিত্বের সঙ্গে লীন হয়ে থাকতে দেখা গেছে। এই নারীর সান্নিধ্য কবি এক সময় পেয়েছিলেন এবং সেই নারী কবিকে স্বল্প সময়ের জন্য শান্তিও দিয়েছিল। বনলতার হৃদয়গ্রাহী দৃষ্টির অতলে কবিসত্তা অবগাহন করেছে।
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন'! পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
(বনলতা সেন, বনলতা সেন)
'হাজার বছর শুধু খেলা করে' কবিতায় 'বনলতা সেন' কবিতার বনলতাকে আবার জাগ্রত অবস্থায় দেখা যায়।
এই কাব্যগ্রন্থে 'আমি যদি হতাম', 'শঙ্খমালা', 'নগ্ন নির্জন হাত' ইত্যাদি কবিতা মূলত প্রেমের কবিতা। 'আমি যদি হতাম' কবিতায় কবি বনহংসরূপী ঈপ্সিতার পাখনায় নিজের পালক এবং নিজের পাখনায় সঙ্গিনীর রক্তের স্পন্দন অনুভব করেছেন। আকাশের রূপকথাপ্রতিম গল্পগাথার ভেতরে যেন তাদের অবগহান। 'শঙ্খমালা' কবিতায় যে নারী কবিকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে ঘর থেকে বের করে নিয়েছে, পরে সেই নারীকেই তিনি আর খুঁজে পাচ্ছেন না। 'নগ্ন নির্জন হাত' কবিতায় কবি হাজার বছর পূর্বের এক সত্তার ভেতরে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলেছেন :
'আকাশের রূপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম- তোমার পাখনায় আমার পালক আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন- নীল আকাশে খই ক্ষেতের সোনালী ফুলের মতো অজস্র তারা,'
(আমি যদি হতাম, বনলতা সেন)
'চোখে তার
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার;
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র- কবেকার শঙ্খিনীমালার;
এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।'
(শঙ্খমালা, বনলতা সেন)
'অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো;
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,
খুজি না।'
(নগ্ন নির্জন হাত, বনলতা সেন)
'হায় চিল' কবিতায় কবির রাঙা রাজকন্যা সদৃশ ঈপ্সিতা রূপ নিয়ে দূরে চলে গেছে। তার অস্তিত্ব কবি নিজের ইন্দ্রিয় ঘনত্ব দিয়ে অনুভব করছেন :
'পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে। আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে।'
(হায় চিল, বনলতা সেন)
'দুজন' এবং 'অঘ্রাণ প্রান্তরে' কবিতা দুটি প্রেমোত্তর বিচ্ছেদের কবিতা। ইয়েটস-এর 'এফেমেরা' কবিতার সঙ্গে এই দুটি কবিতার সাদৃশ্য রয়েছে।
জীবনানন্দের নারী প্রলুব্ধ করে কিন্তু কাউকে রুদ্র করে না। অন্তর ঐশ্বর্যে এই নারী অনন্তকাল মঙ্গল প্রদীপ হাতে যেন প্রতিনিয়ত আরাধ্য এক নান্দনিক প্রতিকৃতি।
জীবনানন্দের নারী একই সঙ্গে শরীরী প্রতীক হয়েও এক প্রতীকায়িত সত্তা।
একদিকে ঘাই হরিণীর ডাক, অন্যদিকে বনলতার হেলেনীয় সৌন্দর্য তার নারীকে করেছে মিশ্র প্রতিমা। ব্যোঁদলেয়ারের নির্বেদ ও বিষণ্ণতা তার প্রেমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা বৈষ্ণবীয় বিরহের চেয়ে আলাদা।
'বনলতা সেন' কাব্যগ্রন্থের কবিতা রচনার পূর্বেই জীবনানন্দ তার বিবাহিত বেকার জীবনের অস্বস্তিকর দিনগুলিতে 'রূপসী বাংলা'র কবিতাবলি লিখেছিলেন। মধুসূদন দত্তও ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে জীবনের পীড়িত দিনে 'চতুর্দশপদী' কবিতা রচনা করেছিলেন। 'রূপসী বাংলা' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে। জীবনানন্দের পারিবারিক বন্ধু ভূমেন্দ্র গুহ আমাদের জানাচ্ছেন যে ১৯৩৪ সালের মার্চ মাসে একটি বিশেষ ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে জীবনানন্দ 'রূপসী বাংলার' কবিতাসমূহ লিখেছেন। এ বিষয়ে জীবনানন্দ লিখেছিলেন : 'এরা প্রত্যেকে আলাদা স্বতন্ত্র সত্তার মতো নয় কেউ, অপরপক্ষে সার্বিক বোধে এক শরীরী; গ্রামবাংলার আলুলায়িত প্রতিবেশ-প্রসূতির মতো ব্যষ্টিগত হয়েও পরিপূরকের মতো পরস্পর নির্ভর। ...' কবি তার এই কবিতাগুলি 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' নামে প্রকাশের কথা ভেবেছিলেন, যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সালে সাহিত্যসমালোচক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর উদ্যোগে 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
জীবনানন্দের পূর্বে ঈশ্বরগুপ্ত, রঙ্গলাল, মাইকেল, হেমচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ প্রমুখ কবি, লেখকের লেখায় স্বদেশপ্রেম এবং স্বদেশচেতনার অবয়ব নির্মিত হয়েছিল। এমনকি জীবনানন্দের সমসাময়িক কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং জসীম উদ্দীনের বিষয়ে বলতে হয় : নজরুল দেশপ্রেমের চূড়ান্ত ভাষ্যকার- যিনি তার সশস্ত্র শব্দবাহিনী নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন আর জসীম উদ্দীন দেশপ্রেম এবং লোকজ জীবনের স্বতন্ত্র স্বর সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে জীবনানন্দের স্বদেশপ্রেমের অন্তর্তলীয় রূপ এবং অন্তর্নিহিত শক্তি তাকে কবি-প্রসিদ্ধির তুঙ্গে পৌঁছে দিয়েছে।
নিসর্গের রূপকার জীবনানন্দ বাংলার রূপ-সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে এই বাংলায় অবস্থান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন : 'তোমরা যেখানে সাধ চ'লে যাও- আমি এই বাংলার পারে/র'য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; (তোমরা যেখানে সাধ, রূপসী বাংলা) বাংলার প্রতি অগাধ ভালোবাসার সূত্র ধরে তিনি অনায়াসেই বলতে পারেন :
'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর ...
(বাংলার মুখ আমি, রূপসী বাংলা)
এই কাব্যগ্রন্থের একষট্টিটি কবিতার মধ্যে একত্রিশটি কবিতায় একান্নবার তিনি বাংলাদেশের (বাংলা) নাম উল্লেখ করেছেন। প্রাক-ভারত বিভক্তির পূর্বে সার্বভৌম বাংলাদেশের নাম কী হবে, জীবনানন্দের পক্ষে তা অনুমান করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি তার প্রিয় মাতৃভূমিকে অখণ্ড ভারতবর্ষ থেকে বিমুক্ত করে 'রূপসী বাংলা' নামকরণ করেছেন :
'লেগে থাকে চোখে মুখে- রূপসী বাংলা যেন বুকের উপর'
(তোমার বুকের থেকে, রূপসী বাংলা)
প্রকাশের সময় তাই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে- 'আবহমান বাংলা, বাঙালি'কে।
'তুমি কেন বহু দূরে' কবিতায় কবি অনাগত স্বদেশভূমির অস্তিত্ব দেখতে চেয়েছেন পৃথিবীর মানচিত্রে :
'তুমি কেন বহু দূরে- ঢের দূরে- আরো দূরে- নক্ষত্রের অস্পষ্ট আকাশ
তুমি কেন কোনোদিন পৃথিবীর ভিড়ে এসে বলো নাকো একটিও কথা।'
মানুষের তৈরি করা সভ্যতা ধ্বংস হয় কিন্তু প্রকৃতি অমলিন রয়ে যায়। পুরোনো ইতিহাসের প্রতিও কবির আকুলতা : 'এশিরিয়া ধূলো আজ- বেবিলন ছাই হ'য়ে আছে।'
(সেইদিন এই মাঠ, রূপসী বাংলা)
ইতিহাসের ঐতিহাসিক চরিত্রকে তিনি তার কবিতায় পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তিনি বল্লাল সেন, রায়গুণাকর, দেশবন্ধু, চণ্ডীদাস, রামপ্রসাদ, রাজবল্লভ ইত্যাদি ঐতিহাসিক চরিত্রের উল্লেখ করেছেন :
এবার বল্লাল সেন আসিবে না জানি আমি- রায়গুণাকর
আসিবে না- দেশবন্ধু আসিয়াছে খরধার পদ্মায় এবার,
... ... ...
আসিয়াছে চণ্ডীদাস- রামপ্রসাদের শ্যামা সাথে সাথে তার :
(অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া, রূপসী বাংলা)
বুদ্ধের স্বপ্ন দেখার বিষয়টি কবি ইতিহাস থেকে জানতে পেরেছেন। অনুধাবন করেছেন রোম, এশিরিয়া, উজ্জয়িনী, গৌড়-বাংলা, দিল্লি, বেবিলনের স্বপ্নের কথা :
'... স্বপ্ন কি দেখেনি বুদ্ধ- নিউসিডিয়ায় বসে দেখেনি মণিকা?
স্বপ্ন কি দেখেনি রোম, এশিরিয়া, উজ্জয়িনী, গৌড়-বাংলা, দিল্লী, বেবিলন?
(তুমি কেন বহু দূরে, রূপসী বাংলা)
ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি কবি রূপকথা গাথা এবং গীতিকার নায়িকাদের তার কবিতায় সমাসীন করেছেন। চন্দ্রমালা, কাঞ্চনমালা, কঙ্কাবতী, শঙ্খমালা প্রমুখ নারী বহু যুগের ওপার থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়েছে। মঙ্গল কাব্যের লেখক এবং অধিকাংশ চরিত্র স্বমহিমায় এই কাব্যগ্রন্থের নানা কবিতায় স্থান করে নিয়েছে :
... বেহুলাও একদিন গাঙ্গুড়ের জলে ভেলা নিয়ে-
কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়-
... ... ...
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিলো ইন্দ্রের সভায়
(বাংলার মুখ আমি, রূপসী বাংলা)
'ধনপতি, শ্রীমন্তের, বেহুলার, লহনার ছুঁয়েছে চরণ'
(এখানে আকাশ নীল, রূপসী বাংলা)
বাংলার নদী, বৃক্ষ, পাখি, ফুল, ফল, শাকসবজি, পোকা, ঘাস, গুল্ম, পশু- ইত্যাদি বহুমাত্রিক অবয়বে কবির কবিতার সঙ্গে একীভূত হয়েছে। 'ঠোঁটভাঙা দাঁড়কাক' এবং 'পেঁচার নম্রতা'র চিত্রকল্প খুব চমৎকারভাবে কবি এঁকেছেন। বাদুড়ের ডানায় অঙ্কিত রেখা আমাদের অন্য এক কল্পলোকে ভ্রমণ করায় :
'বাদুড় আঁধার ডানা মেলে হিম জ্যোৎস্নায় কাটিয়াছে রেখা'
(এ-সব কবিতা আমি, রূপসী বাংলা)
বাংলার অবারিত এবং অকৃত্রিম সৌন্দর্যের মাঝেই জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতি এবং প্রেমের অপরূপ রূপের সন্ধান পেয়েছেন :
'পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;'
(সন্ধ্যা হয়- চারিদিকে, রূপসী বাংলা)
রূপসী বাংলা'র কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে আবহমান বাংলার রূপ-বৈভবের চিহ্ন অঙ্কিত। রূপসী বাংলার রূপের ভেতরে তিনি অনুসন্ধান করেছেন লোকজ পুরাণকে, আবার ইতিহাসের প্রবহমানতাকেও ধারণ করেছেন।
অতিলৌকিক আবহের দ্বারাও আচ্ছন্ন হয়েছেন। পাতা ঝরে পড়ার বিষণ্ণতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াকে তিনি সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করেও দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় :
'আমি চ'লে যাব বলে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে'
বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর জীবনানন্দ সমকাল পেরিয়ে মহাসময়ের পথে যাত্রা করেছেন। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থসমূহে তিনি বহুলাংশে একজন ইতিহাসচারী, বৈশ্বিক এবং রজনীতিসচেতন কবি। া
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
- সৈয়দা আইরিন জামান