ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জেন্ডার সমতায়নে প্রয়োজন নারীবান্ধব ডিসকোর্স

জেন্ডার সমতায়নে প্রয়োজন নারীবান্ধব ডিসকোর্স
×

ফারহানা জামান

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২২ | ০০:২৭ | আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২২ | ০০:৩৩

গত ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস উদযাপিত হয়ে গেল যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল 'টেকসই আগামীর পূর্বশর্ত জেন্ডার সমতায়ন।' এ কথা অনস্বীকার্য যে, একটি জাতির উন্নয়নে প্রয়োজন নারী-পুরুষ উভয়ের অবদান। জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে শুধু পুরুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিলেই চলবে না। পাশাপাশি জাতির এক উল্লেখযোগ্য অংশ যে, নারী তার অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হবে। আজকাল নারীরা নানা ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। শিক্ষকতা, ব্যাংকিং, ব্যবসা, রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সব ক্ষেত্রেই আজ নারীর পদচারণা লক্ষণীয়। তা সত্ত্বেও আজও সফলভাবে সমাজের সর্বক্ষেত্রে জেন্ডার সমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নানা আইন এবং নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এবং কোটা ব্যবস্থা সৃষ্টি করে নারীদের একটা অবস্থানে আনার চেষ্টা করা হলেও পরিবর্তন আসেনি বাস্তবিক চিন্তা-চেতনায়। 

ডিসকারসিভ মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চিন্তা-চেতনা পরিচালিত হয় ল্যাঙ্গুয়েজ বা ডিসকোর্সের মাধ্যমে। নারী শব্দটি শোনামাত্রই মনের চোখে ভেসে ওঠে মা কিংবা জননীর প্রতিকৃতি। তবে এই নারী শব্দটির সঙ্গে যেই সব প্রাসঙ্গিক নেতিবাচক শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার কিছু হলো আবেগপ্রবণ, পরনির্ভরশীল, ত্যাগী, অবলা, ইত্যাদি। ফলে একজন অবলা নারীর কাছ থেকে প্রত্যাশা নেই বেশি কিছু। এমনকি নিজেকে অবলা নামেম চেনেন-জানেন যেই নারী তার নিজের ও নিজের কাছে প্রত্যাশা নেই বেশি কিছু। এমনিভাবে যুগে যুগে শব্দ, বাক্য তথা ভাষার মধ্যেই বুনে দেওয়া হয়েছে নারীর প্রতি বৈষম্যের বীজ। কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটি পোস্ট থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। ব্যাকরণ শিক্ষার নামে নারীর প্রতি অসম্মানজনক কতশত শব্দ যেমন অনুঢ়া, বন্ধ্যা, কাকবন্ধ্যা, মৃতবৎসা ইত্যাদি, কচি শিশুদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় সে কথাই পোস্টটি থেকে উঠে এসেছে। এ শব্দগুলোই পরবর্তীতে নানা নেতিবাচকভাবে নারীকে হেয় করতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই ডিসকোর্স গঠনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন হওয়া জরুরি।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে চলেছে। জিডিপিতে নারীর অবদান বেড়ে চললেও দূর হয়নি লিঙ্গবৈষম্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী মোট শ্রমিকের ৩০.৬৩% হলো নারী এবং এই নারী শ্রমিকের ৯১.৮% অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং নানা ধরনের নিম্ন আয়ের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ফলে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের সমান অবদান আজও নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয়নি। এমন অনেক পেশা রয়েছে যেগুলো পুরুষশাসিত এবং যেখানে নারীকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যেমন নারী কৃষক, নারী জেলে ইত্যাদি। জেলেনি শব্দটি যেন শুধু জেলের স্ত্রীবাচক শব্দ হিসেবে পুস্তকেই সীমাবদ্ধ রয়েছে যেমনি রয়েছে কৃষানি শব্দটি। 

আমাদের দেশের গ্রামীণ সমাজের বেশরভাগ নারীই ভূমিহীন হওয়া সত্ত্বেও বাড়ির উঠানে বা সরকারি খাসজমিতে চাষবাস করে বহু নারী সংসারের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। এ ছাড়াও মূলধারার কৃষিকাজের ২১টি ধাপের মধ্যে ১৭টি ধাপের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন নারীরা। তথাপি ও কৃষি কাজে রয়েছে সুনির্দিষ্ট মজুরি বৈষম্য এবং কৃষিকাজে অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে ভূমির মালিকানা শর্ত যেখানে বেশিরভাগ গ্রামীণ নারীই ভূমিহীন। ঠিক তেমনিভাবে খাদ্য চাহিদার জোগান দিয়ে চলেছেন নারী জেলেরা। বাড়ির উঠানের পুকুরে মাছ চাষ থেকে শুরু করে বড় বড় মাছের আড়ত বা ফ্যাক্টরিগুলোতে নারী জেলেদের অবদান অনস্বীকার্য। বিভিন্ন গবেষণা থেকে অ্যাকুয়াকালচারে নারীদের অবদান উঠে এসেছে। ওয়ার্ল্ড ফিসের ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বহু পরিত্যক্ত নারী মাছ চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে সক্ষম হয়েছেন, সক্ষম হয়েছেন পরিবারের হাল ধরতে। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশনের ২০১৭ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশের অ্যাকুয়াকালচার প্রডাকশনে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও মাছ চাষ আজও একটি পুরুষের কাজ বলেই বিবেচিত এবং নারীরা আজও জেলে হিসেবে সমাজে অস্বীকৃত। কোস্ট ট্রাস্টের একটি গবেষণা থেকে উঠে এসেছে যে, প্রায় ১৯ লাখ মানুষ মাছ চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত যার ১০-২০% হলো নারী। মাছ প্রসেসিংয়ের কাজে নিযুক্ত নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় প্রায় ২৫ ভাগ কম। তাছাড়া জেলেনির আয়ের পুরোটাই চলে যায় তাদের স্বামীর হাতে। ফলে ক্ষমতা কাঠামোতে তারা থাকেন পিছিয়ে এবং পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত প্রদানের সুযোগ থেকে হন বঞ্চিত। নারীদের এই বঞ্চনার গল্পের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের লালিত চিন্তা-চেতনা যা কিনা ভাষার মাধ্যমে লালন এবং ধারণ করে চলেছে বাঙালি সমাজ। কৃষিকাজ বা মাছ চাষের মতো পেশা আজও পুরুষশাসিত পেশা বলে গণ্য হওয়ায় এসব কর্মকাণ্ডে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্ব্বেও সে বঞ্চিত হয় তার প্রাপ্য মজুরি থেকে, দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন অনুদান থেকে, উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণ এবং তার ব্যবহারের সুবিধা থেকে। 

তাই প্রয়োজন চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন যার মূলে রয়েছে ভাষার ব্যবহার বা ডিসকোর্স। বর্তমানে ডিসকোর্স নিয়ে চলছে গবেষণা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনে ডিসকোর্স পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই কারণেই বর্তমানে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় পুরোনা ডিসকোর্স পরিবর্তন করে দুর্যোগে পতিত ব্যক্তিকে 'ভিক্টিম', 'অসহায়' অথবা 'বিপন্ন' বলে বিবেচিত না করে নতুন ডিসকোর্সের আলোকে তাকে সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে ভিক্টিম হিসেবে অসহায়বোধ না করে অথবা হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে উন্নয়নকর্মীদের জন্য অপেক্ষা না করে সে তার প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠিক একই রকমভাবে একজন নারীকে কেবল মাত্র জননী, মাতা, গর্ভধারিণী কিংবা প্রসূতি এই রূপে চিন্তা না করে জেলেনি, কৃষানি, পাইলট, রাজনীতিবিদ, বৈজ্ঞানিক অথবা সৈনিক হিসেবে ভাবনার জায়গাটা তৈরি করে দিতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়, টিভি পর্দায় নারীকে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কাজে উপস্থাপন করার মাধ্যমে আগামী প্রজন্ম এর চিন্তা-চেতনায় নারীর ভিন্ন প্রতিকৃতি সৃষ্টি করা জরুরি। আইন প্রণয়ন এবং নারীনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় নারীর অবস্থান সৃষ্টি করার পাশাপাশি চিন্তা এবং মননশীলতার জায়গায় কাজ করা প্রয়োজন। গতানুগতিক ডিসকোর্স পরিবর্তন এবং নারীবান্ধব নতুন ডিসকোর্স গঠন ও তার বহুল চর্চার মধ্য দিয়ে 'নারী' সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের লালিত মনের নেতিবাচক চিন্তা ও চেতনার অবসান ঘটানো সম্ভব। 


আরও পড়ুন

×