ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ট্রেনের টিকিট: নিয়মের হাতই 'লম্বা' হোক!

ট্রেনের টিকিট: নিয়মের হাতই 'লম্বা' হোক!
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০

ট্রেনের টিকিট পেতে যাত্রীদের কী রকম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়- এ আর নতুন করে বলার কিছু নেই। যাত্রীদের এই বিড়ম্বনা আরও প্রকট হয় ঈদের সময়। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বৃহস্পতিবার সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও 'ক্ষমতাধররা' তদবিরের জোরে টিকিট পেয়েছেন অনায়াসে। সমকালে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাকে সহজেই প্রতীয়মান, অনিয়ম কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এমন প্রক্রিয়ায় টিকিট ক্ষমতাবানদের হাতে চলে যাওয়ায় খোদ রেলের কর্মকর্তারাও তাদের কোটায় টিকিট পাননি! মন্ত্রীর কাছে টিকিটের তদবির আসছে তার একান্ত সহকারী সচিবের মাধ্যমে।
মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বাস্তবতা কত কঠিন; এর সাক্ষ্য মিলছে ঈদযাত্রার আগাম টিকিট বিক্রি শুরু না হতেই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা প্রতিবেদনগুলোতে। ২৫ এপ্রিল রেলমন্ত্রী ঈদযাত্রার ট্রেনের টিকিট বিক্রির তৃতীয় দিনে কমলাপুর স্টেশনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে কিছুই করার নেই। আমরা মন্ত্রীর এমন জবাবে বিস্মিত না হয়ে পারি না। তিনি এও বলেছেন, 'সিস্টেম করেছি, টিকিট জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই।' মন্ত্রীর এই বক্তব্য কতটা অসার- এর প্রমাণ মিলেছে টিকিট বিক্রি প্রক্রিয়ায় যুক্ত বেসরকারি সংস্থা সহজ লিমিটেডের সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার মো. রেজাউল করিম রেজার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। রেলের টিকিট যাতে টিকিটপ্রত্যাশীরা সহজে পান, এ জন্য সহজ লিমিটেডের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চুক্তি হয় কিছুদিন আগে। কিন্তু শুরু থেকেই তারা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তাদের কেউ কেউ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ায় পুরো প্রক্রিয়া আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আমরা জানি, এর আগে ঈদযাত্রায় ট্রেনের টিকিটের ১০ শতাংশ সুরক্ষিত ছিল 'ভিআইপি' ও রেলকর্মীদের জন্য। সাধারণ কোটার জন্য রাখা হতো আরও ১০ শতাংশ। ওই টিকিট বিক্রির বিধিবদ্ধ নিয়ম থাকলেও মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের কারও কারও স্বেচ্ছাচারিতায় তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমান রেলমন্ত্রী শুধু রেলকর্মীদের জন্য ২ শতাংশ টিকিট সংরক্ষিত ছাড়া অন্য সব কোটা বাতিল করে দিলেও এর কোনো সুফল রেলযাত্রীরা পাননি। কোটা নেই, কিন্তু 'মৌখিক' নির্দেশে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ফোনে, এসএমএসের মাধ্যমে এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে টিকিটপ্রত্যাশীদের ভোগান্তিসহ সব রকম অনিয়মের দায় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ এড়াতে পারে না। কমলাপুরে রেলের জনৈক বুকিং ক্লার্কের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে তার নির্দেশ ছাড়া যেন ২৮-২৯ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি না হয়- এমন দাম্ভিক উচ্চারণও হতবাক না করে পারে না। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার জন্য প্রতিবারই মন্ত্রী ও রেল বিভাগ থেকে অনেক অমিয় বাণীই শোনানো হয়। কিন্তু এসবই যে কথার কথা- তা সরকারের দায়িত্বশীলদের টিকিট মুঠোবন্দি করার মধ্য দিয়ে তা আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে। টিকিট কালোবাজারি তো বন্ধ করা যায়ইনি, উপরন্তু সাধারণ যাত্রীদের টিকিট সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে হয়রানি-বঞ্চনার চিত্রই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সাশ্রয়ী গণপরিবহন হিসেবে যাতায়াতে ট্রেনই যাদের ভরসা, তাদের নূ্যনতম সেবাও কেন রেল বিভাগ নিশ্চিত করতে পারেনি- এ প্রশ্নের জবাব দায়িত্বশীলদেরই দিতে হবে। প্রযুক্তির বিকাশের এই যুগেও রেল বিভাগ ও অনলাইনে টিকিট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কেন টিকিটপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ না করে আরও কঠিন করে তুলল? টিকিটের কালোবাজারি ঠেকাতে ও সাধারণ যাত্রীদের সহজে টিকিট পাওয়ার নানা উদ্যোগ অতীতে নেওয়া হলেও কোনো কিছুরই সুফল যাত্রীরা পাননি। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করে সুশাসন নিশ্চিত না করার মাশুল যাত্রীদের কেন গুনতে হচ্ছে- এর সহজ জবাব প্রত্যাশিত। সেবাদানকারী কোনো সংস্থার এই ব্যর্থতা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আশু এর প্রতিবিধান দাবি করি। আমরা চাই, হাজারো টিকিট অনিয়মের 'লম্বা হাত' না নিয়ে যাক; আইন বা নিয়মের হাতই লম্বা হোক।

আরও পড়ুন

×