ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকড় সন্ধানে

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকড় সন্ধানে
×

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২২ | ১২:০০

দেশের বিভিন্ন স্থানে অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সংঘাত দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। অতি সম্প্রতি দেশজুড়ে অত্যন্ত আনন্দমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের রথযাত্রা উৎসব পালন করল; কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা শুনিনি। এর পরপরই নড়াইলের নিভৃত গ্রামে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী, যারা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক নয়, তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ কোন পথে যাচ্ছে- তা নিয়ে চিন্তিত ও বিব্রত। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বহির্বিশ্বে যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে, তা বলা বাহুল্য।
গত ১ জুলাই আমরা হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি আক্রমণের ছয় বছরে বেশ কিছু আলোচনা ও স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। সেখানে আমরা সবাই জঙ্গি আক্রমণ প্রতিরোধ ও দেশব্যাপী এদের তৎপরতা দমনে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেছি। অত্যন্ত সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার জঙ্গিবিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার ফলে গত ছয় বছরে আর কোনো বড় ধরনের জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়নি। দেশজুড়ে আজ জঙ্গিবাদবিরোধী কঠোর জনমত সৃষ্টি হয়েছে। সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না হলেও বাংলাদেশে বর্তমানে জঙ্গিদের তৎপরতা অত্যন্ত সীমিত। তাদের তৎপরতা কমে এলেও যে বিষয়টি এরই মধ্যে সামনে এসেছে তা হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা, যা অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক, প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার পথে এক অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাম্প্রদায়িকতা ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলা যায়, সাম্প্রদায়িকতা থেকেই ধর্মীয় উগ্রবাদের জন্ম হয় এবং সেখান থেকে ক্রমে জঙ্গিবাদ ছড়ায়। সাম্প্রদায়িকতা আমাকে অন্য সব ধর্মীয় বা আদর্শিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে এবং ক্রমেই আমার মানসিকতায় অন্যদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের জন্ম দেয়। সাম্প্রদায়িকতা ক্রমেই ধর্মীয় উগ্রবাদে রূপান্তরিত হয়, যখন আমি আমার ধর্মের অত্যন্ত সংকীর্ণ একটা বিশ্নেষণকে আঁকড়ে ধরি এবং এর বাইরের যে কোনো আদর্শ বা মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করি। আর এর পরবর্তী পর্যায়ে যখন আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করব- আমার অনুসৃত মতবাদে যারা বিশ্বাসী নয়, তাদের শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে; প্রয়োজনে তাদের হত্যা করতে হবে এবং এ জন্য আমি আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত থাকব; তখনই আমি একজন জঙ্গি হয়ে উঠব।
১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলো, তখন একটি জনগণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন সবার মনে ছিল। বস্তুত স্বাধীনতা যুদ্ধের ঊষালগ্নে ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র মুজিবনগরে বিশ্বসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, সেখানেই এই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছিল। এ ঘোষণার আলোকেই ১৯৭২-এ বাংলাদেশের সংবিধান রচিত ও পরে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। এই সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের চার স্তম্ভের একটি বলে উদ্ৃব্দত করা হয় (বাকি তিনটি স্তম্ভ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র)। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধর্মভিত্তিক সব রাজনৈতিক দল, যেমন- জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ বা নেজামে ইসলামীর মতো দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ধর্মকে উপজীব্য করে রাজনীতি বা রাজনীতিতে ধর্মের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার'- এ ধারণার ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশা।
দুঃখজনকভাবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যে অপশক্তি ক্ষমতায় এলো, তারা তাদের ক্ষমতার রক্ষক হিসেবে ইসলামী দলগুলোকে কাছে টেনে নিল। শুরু হলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ইসলাম ধর্মের যথেচ্ছ ব্যবহার। ওই সময়কার নীতিনির্ধারকরা ইসলামের মহান আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন, অথবা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ইসলামের বিধানসম্মত ছিল- এমনটি কেউ বলবে না। বরং ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁরা জড়িত ছিলেন। ইসলামকে তাঁরা ব্যবহার করেছেন সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে। ওই সময়ের সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ ১৯৮৮ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম বানিয়ে দেন। যদিও ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরে এলো; ততদিনে ইসলামী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ প্রবেশ করেছে। ফলে পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া আজও সম্ভব হয়নি।
অধুনা বংলাদেশে মৌলবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের প্রচার-প্রসারে যেসব বিষয় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ১৯৮০-'৮৯ আফগান জিহাদে বেশ কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের যোগদান ও যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব ঘটানোর জন্য জঙ্গি কার্যক্রম শুরু। এর সঙ্গে যুক্ত হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে, এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা বা কানাডা থেকে ইসলামের বিভিন্ন উগ্র মতবাদ, যা আমাদের চিরাচরিত ইসলামী রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের বিপরীতে অবস্থান নিল। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আইসিসের তাণ্ডব, আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান, পাকিস্তানে বিভিন্ন উগ্র ইসলামী সংগঠনের পেছনে রাষ্ট্রীয় মদত এবং সম্প্রতি ভারতে হিন্দুত্ববাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যেসব সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঘটেছে, তাতে জানমালের ক্ষতি যতটুকু না হয়েছে; বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে আরও বেশি। এসব আক্রমণের শিকার হয়েছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। অতি সম্প্রতি নড়াইলের সাহাপাড়ায় যারা আক্রান্ত হয়েছে, তারাও গরিব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একই প্যাটার্ন আমরা দেখেছি সুনামগঞ্জে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে গত দুর্গাপূজায় যে ঘটনা ঘটানো হলো, তার ফলে দেশের বেশ কয়েকটি পূজামণ্ডপ আক্তান্ত হলো। অথচ পরে দেখা গেল, স্থানীয় কয়েকজন মুসলমান যুবক ঘটনাটি ঘটিয়েছে। পুলিশ সেই যুবকদের আটক করল; কিন্তু ধীরে ধীরে সংবাদটি পত্রিকার পাতা থেকে সরে গেল। এই যে বিচারহীনতা বা বিচারিক কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতা, এটাই দুস্কৃতকারীদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের উগ্রতার বিরুদ্ধে। সে জন্যই আমরা দেখেছি, হলি আর্টিসানে নিহত জঙ্গিদের লাশ তাদের পিতামাতা গ্রহণ করেননি; সমাজ ও জাতি তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাদের উচিত, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উচ্চ মহল থেকে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া- বাংলাদেশ কখনোই সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেবে না এবং সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেওয়া যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে দ্রুত, কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
সাম্প্রতিককালে আমরা দেখেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অপব্যবহার করে ধর্মের ব্যাপারে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আমাদের সবারই এসব যোগাযোগমাধ্যমকে অত্যন্ত সাবধানের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে নিজ নিজ ধর্মের বাইরে অন্যের ধর্ম বা আচার-আচরণ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। এ ধরনের মন্তব্য চোখে পড়লে দ্রুত তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আনতে হবে। এ ব্যাপারে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের বড় দায়িত্ব রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রত্যক্ষভাবে মোকাবিলা করেছেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগের আগে কলকাতার দাঙ্গা, যা ইতিহাসে 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস' নামে পরিচিত, সেখানে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের আটকে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে দিনরাত কাজ করেছেন। ১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের আহ্বান সংবলিত 'পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও' নামক পোস্টার বিতরণ করার সময় তিনি পাকিস্তান সরকারের নিরাপত্তা আইনে বন্দি হয়েছিলেন। আজও রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সব নেতৃত্বের কর্তব্য সংকটময় এই মুহূর্তে নিপীড়িত মানবতার পাশে দাঁড়ানো। 'সংঘাত নয়, সম্প্রতি'- এই হোক আমাদের আহ্বান।
ইশফাক ইলাহী চৌধুরী :নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর

আরও পড়ুন

×