ইউরোপের চিঠি
শিল্পী শাহাবুদ্দিন: বঙ্গীয় ও বৈশ্বিক
দাউদ হায়দার
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৪:৩৩
'বাহাত্তুরে বুড়ো'র অপবাদ ঘুচল। শিল্পী শাহাবুদ্দিন আজ থেকে তিয়াত্তুরে তরুণ। বঙ্কিম চ্যাটুজ্যের অগ্রজ 'পালামৌ'খ্যাত সঞ্জীবচন্দ্র (তাঁর একটি বাক্য বহুল প্রচলিত :'বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে') আক্ষেপ করে লিখেছিলেন :'এ ক্ষণে বৃদ্ধ হইয়াছি (তখনও ৫০ পূর্ণ হয়নি)।' দেড়শ বছর আগে হয়তো ৫০ অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই লোকে বৃদ্ধ বলত। তাহলে 'বাহাত্তুরে বুড়ো' প্রবাদ এলো কোত্থেকে? নিশ্চয় বহু লোকের বয়স বাহাত্তর হতো সেকালেও, এবং বৃদ্ধ না বলে বুড়োর তকমা ঠাট্টা, পরিহাসচ্ছলে। পরিহাসে নানাবিধ সূক্ষ্ণ ব্যঙ্গ। বাহাত্তুরে বুড়ো অথর্ব, অকম্মের ধাড়ি। এর সঙ্গে ভীমরতিও যুক্ত।
একালে বাহাত্তরেও তরুণ, জোয়ান। ইউরোপিয়ানরা বলছে পঞ্চাশের পর থেকেই নাকি পোক যোবন। লোকের কথা নয়, সরকারেরও। চাকরির বয়স পঁয়ষট্টি থেকে সাতষট্টি। নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, আইসল্যান্ড সত্তর বছর পর্যন্ত করার পক্ষে। আসল হেতু ভিন্ন। জন্মহার দ্রুত কমছে। অন্যদিকে দক্ষ কর্মী পাওয়া ক্রমশ কঠিন। শ্রমিকের ঘাটতি। ইউরোপও হাড়েমজ্জায় টের পাচ্ছে। কিন্তু অভিবাসীর জন্য দ্বার উন্মুক্ত নয়। নানা ঝক্কিঝামেলা, আইনি গ্যাঁড়াকল। উপরন্তু ভাষার সমস্যা। আরও একটি। কালচারাল আইডেনটিটি। যোগ হয়েছে ধর্মও। রেসিয়াল ব্যাপারটি তো আছেই। সবার ক্ষেত্রে নয় অবশ্যই। শাহাবুদ্দিনের বেলায় প্রশ্নই ওঠে না। ফ্রান্সে ওঁকে দরকার, ইউরোপে, বিশ্বেও। শিল্পের জন্য। কালচারাল একাত্মতার প্রয়োজনে। এবং এই প্রয়োজন আন্তর্জাতিক বলয় রচনায়।
ঠিক যে, গত পঞ্চাশ বছরে বিশ্বের চেহারায় রদবদল। বিশেষত ৯ নভেম্বর ১৯৮৯-এ বার্লিন দেয়ালধস এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতন, কমিউনিজমের বেহাল, বিশ্ব ধনতন্ত্রমুখী। মানুষ ছুটছে এ-দেশে ও-দেশে। জীবিকায়। সহাবস্থানেও শামিল করছে নিজেকে, নিজেদের।
১৯৭৪ সাল থেকে প্যারিসবাসী হয়ে শাহাবুদ্দিন দেখছেন বৈশ্বিক চিত্র। তাঁর ছবির চিত্রায়ণে- রেখায়-অঙ্কনে-রঙে- মানুষের মুখাবয়বে যে ভাষ্য, যে গহন, যে দুঃখদুর্দশা, যন্ত্রণা, মানবিকতা, মানবিকতার মাধুরী প্রোজ্জ্বল। কখনও দ্রোহাত্মক, কখন তেজীয়ান। মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামই উপজীব্য।
মানুষই নয় কেবল; জীব গতিসম্পন্ন পশুরও।
শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধবাদীরা শোর তুলেছেন 'একই ধারার ছবির বলয়ে ঘূর্ণমান। মাস্টারি আছে ছড়ানো ছিটানোর পরিধি ক্ষীণ।' কানে এসেছে এমন কথাও, 'তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি। ওভাররেটেড।' লক্ষণীয়, শব্দটি 'ওভাররেটেড'। কারা করছেন? দর্শক, ক্রেতা, সমালোচক? অন্যকে নিয়ে নয় কেন?
প্রশ্ন জাগে, ইতিহাস ও সমকালের প্রেক্ষাপটে নিন্দুককুল এমন দুই-দিনটি ছবি আঁকুন, যা বোধকে আলোড়িত করে? স্তব্ধতার মুহূর্ত, ঘটনার চিত্রণে মুখাপেক্ষী হই?
কলকাতার 'দেশ' সাময়িকী লেখিকা তিলোত্তমা মজুমদারের সঙ্গে কথোপকথন (সাক্ষাৎকারে) প্রকাশ করেছে। তিলোত্তমার বয়ান, 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ওভাররেটেড।' অর্থাৎ তাঁর বিচারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যতটা তোল্লাই দেওয়া হয়; প্রাপ্য নয়। মুখ আছে, বলতেই পারেন।
৮০-৮৫ বছর আগে মানিক বন্দ্যোপ্যাধায় পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা (আরও কয়েকটি উপন্যাস, ছোটগল্প লিখেছেন) প্রকাশ করেছেন। পাঠক এখনও পড়েন। ধ্রুপদি উপন্যাসের শিরোপায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাকি লেখা বাদ দিলুম। তিলোত্তমার কলমের ধার প্রশংসনীয়, পাঠকপ্রিয়। ঠিক আছে। পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথার মতো উপন্যাস লিখে দেখান, এলেম কতটুকু। ফটকাবাজির ফটকা কথার মূল্য আছে? তিলোত্তমার কোন উপন্যাস পঞ্চাশ বছর টিকবে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথার ধারেকাছে ঠাঁই পাবে? পাকামোর শেষ কোথায়?
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলতেন (আড্ডায়) :''আমি যদি 'পথের পাঁচালী', 'পুতুলনাচের ইতিকথা' লিখতে পারতাম তোদের ইতি-বউদিকে (শ্যামলের স্ত্রীর নাম) তালাক দিয়ে কুসুমকে (পুতুলনাচের ইতিকথার নায়িকা) নিকে করতাম।"
শাহাবুদ্দিনের সমসাময়িকদের (শিল্পী/নিন্দুক) হিম্মত নেই ধারেকাছে ঘেঁষার। 'ওভাররেটেড' বলে নিজেকে বিজ্ঞ, বাহবা দেওয়া।
শান্তিনিকেতনে, কলাভবনে এক সন্ধ্যার আড্ডায় শিল্পী সুব্রম্মণ্য বলছিলেন (আড্ডায় শামিল সোমনাথ হোড়, শর্বরী রায় চৌধুরী) : 'সমালোচকের মুখ আছে।' সোমনাথ বললেন : 'শিল্পীর বুভুক্ষা নিন্দুকের ঈর্ষা।'
শাহাবুদ্দিনকে চেনাজানার নানা দুয়ার, অঙ্গন খুলেছেন, খুলছেন ফটোগ্রাফার অজয় রায়। এপির চিত্রসাংবাদিকের দায়িত্বে ছিলেন ভারতে। পরে আনন্দবাজারে। কয়েকটি তথ্যচিত্র করেছেন। বিশ্বে প্রশংসিত। পুরস্কৃত।
শাহাবুদ্দিনকে নিয়ে অজয় রায়ের তিনটি তথ্যচিত্র দেখে জানলুম, শাহাবুদ্দিন ওঁর জন্মমহল্লায় (নরসিংদী) স্কুল খুলেছেন। গ্যাঁটের কড়ি দিচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।
শাহাবুদ্দিন শিল্পী নন শুধু। জনহিতকরও। নিজেকে বলেন : 'নিমিত্ত'।
এই নিমিত্তে দেশীয় ও বৈশ্বিকতায় যে স্ম্ফুরণ, নমস্য।
স্ত্রী আনা ইসলাম, কন্যাদ্বয় চিত্র ও চর্যা হার্দিক শুভেচ্ছা জানাবেন। আমরাও অংশী।
বাহাত্তুরের বুড়োর জন্ম ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। এক অর্থে তাঁর জন্মদিবস বাংলাদেশের শিল্পেও নতুন মাত্রা, নবতর সংযোজন।
দাউদ হায়দার: কবি
- বিষয় :
- ইউরোপের চিঠি
- দাউদ হায়দার