ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিবেশী

আদানির সংকট বনাম মোদির জনপ্রিয়তা

আদানির সংকট বনাম মোদির জনপ্রিয়তা
×

জয়তী ঘোষ

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২২:৪৯

গত দুই দশক ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গুজরাটি এই ব্যবসায়ীকে এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হতে সাহায্য করেছে। আদানির ধূমকেতুসম উত্থান এমনকি তাঁর রাজনৈতিক গুরুকেও ছাড়িয়ে যায় এবং তাঁকে ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্পের পোস্টার বয় করে তুলেছিল। কিন্তু সেই গল্প চলে তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও শেয়ারবাজার কেলেংকারির অভিযোগ ওঠার আগ পর্যন্তই। এর পর বলা চলে তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে ধস নামে। কয়েক দিনের মধ্যে ১১০ বিলিয়ন সম্পদ হারানোর পর আদানি হয়ে উঠেছেন মোদির ভারতে ক্রোনিজম বা স্বজনতোষণের বিপদের একটি সতর্কতামূলক গল্প।

আদানি এবং মোদির মধ্যে অংশীদারিত্বের কথা বলতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০০২ সালে। ওই সময় নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে দাঙ্গা হয়। ওই ঘটনায় সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। সেখানে জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় মোদি ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন। সেই গণহত্যার পর মোদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় এবং ভারতের ব্যবসায়ী নেতারা তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছিলেন আদানি। তাঁর এই আনুগত্যের জন্য আদানিকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। পরের দশকে আদানি গোষ্ঠীর প্রবৃদ্ধি হয় বিপজ্জনক গতিতে। তারা একাধিক রাজ্য সরকারের দরপত্রে জিতেছে এবং খাদ্য আমদানি-রপ্তানি, কয়লা ও খনির ব্যবসা, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং অবকাঠামো ক্ষেত্রে কাজ করে তাঁর ব্যবসায়িক বিস্তৃতি ঘটেছিল।

বছরের পর বছর ধরে আদানি ও মোদির সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তখন তিনি আদানির ব্যক্তিগত জেট বিমানে দিল্লি যান। মোদির সঙ্গে আদানির বিশেষ সম্পর্কের কারণেই তাঁর কোম্পানি লাভজনক সরকারি কাজ পায় এবং দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগের জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতের ঋণ পেতে সাহায্য করে। এর মধ্যে কিছু চুক্তি কিংবা ঋণ ছিল বিতর্কিত। সরকার আদানির ব্যবসা নিশ্চিত করতে বারবার নিয়ম ও বিধি পর্যন্ত সংশোধন করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৭ সালে সরকার গড্ডায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আদানির বিদ্যুৎ প্লান্টকে নির্বাচন করেছিল। অভিযোগ উঠেছে, আদানিকে সেখানে ৫ বিলিয়ন রুপি (প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা) লাভ দেওয়ার জন্য নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ২০১৯ সালে মোদি সরকার আদানির কোম্পানিকে ছয়টি নতুন বেসরকারি বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল। আদানির কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি এত দ্রুত হয়েছে; এক দশকেরও কম সময়ে আদানির সম্পদ ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০ বিলিয়ন ডলার, যা আদানিকে বিশ্বের তৃতীয় ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে (জানুয়ারির শেষের দিকে তাঁর সম্পদ কমতে শুরু করে এবং এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে)।

অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আদানি তাঁর ব্যবসা এবং মোদির সমালোচনা দমন করার প্রচেষ্টায় আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে গেছে এমন সংবাদের জন্য সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন আদানি। গত বছরের শেষের দিকে আদানি ভারতীয় চ্যানেল এনডিটিভির দখল নেন। মোদির সমালোচনাকারী গুটিকতক সংবাদমাধ্যমের অন্যতম ছিল এনডিটিভি।

আদানির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মিডিয়া শক্তি এবং ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে আদানি গ্রুপের সাফল্যে মনে হয়েছিল, আদানি অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু এই বিভ্রমটি ২৪ জানুয়ারি ভেঙে যায়, যখন হিনডেনবার্গ রিসার্চ এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বলা হয়- আদানি করপোরেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কারচুপি করেছেন। যখন আদানি গ্রুপ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ রক্ষার কথা বলেছে, সে সময় হিনডেনবার্গ রিপোর্ট 'মোক্ষম অস্ত্র' হিসেবে কাজ করেছে। তাতে বাজারেও তার দ্রুত প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে মুডি অ্যানালিটিকসে আদানি গ্রুপের বেশ কয়েকটি কোম্পানির রেটিং অনেক কমে গেছে এবং এমএসসিআই বাজার ইনডেক্সে চারটি কোম্পানির ক্রেডিট কমিয়েছে, যা সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়। এর পর আদানি আস্থা ফেরানোর বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও তা তেমন কাজে আসেনি।

এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি নীরব। এমনকি ভারতের বিরোধী দলগুলো তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনতোষণের অভিযোগ আনলেও তিনি মুখ খোলেননি। সরকার দাবি করেছে, ভারতের 'শক্তিশালী' নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই কেলেঙ্কারির বিষয়গুলো দেখবে, যদিও তাদের কার্যক্রমে আস্থা রাখা কঠিন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়াকে বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা 'নীরব অপারেটর' হিসেবে কাজ করার জন্য অভিযোগ করেছেন। সংস্থাটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, তারা আদানির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত করছে এবং আদানি গ্রুপকে তার বক্তব্য জানাতে ছয় মাস সময় দিয়েছে। সংস্থাটি অবশ্য আদানি গ্রুপের শেয়ার এবং করপোরেট বন্ডের পতনের দিকে নজর দেওয়ার ফলে প্রমাণ পেয়েছে, কিছু লেনদেন দেশের বাইরে থেকে হয়েছে।

আদানি গ্রুপ তার অবস্থা ফেরাতে পারুক আর না পারুক, এর বর্তমান সংকট অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কয়েকটি গ্রুপের ওপর ভারতের অত্যধিক নির্ভরতার অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। যে কারণে ভারতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সে অর্থে হয়নি। উল্টো হতাশাজনক বেকার বৃদ্ধি, বিনিয়োগের হার হ্রাস এবং পরিবেশগত ধ্বংসের মধ্যে ফেলেছে ভারতকে। রিলায়েন্স, টাটা এবং আদিত্য বিড়লার মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে সরকারের উচিত এই অবস্থাটিকে পথ পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা। ছোট এবং মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করলে সামাজিক সেবা সম্প্রসারণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নতি টেকসই হবে।

এই কেলেঙ্কারির ঘটনা নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করা হলেও, রাজনৈতিক পতনের মূল্যায়ন এত তাড়াতাড়ি করা কঠিন। নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি কয়েক বছর ধরে অসংখ্য দুর্নীতি কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ওপর তাদের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের কারণে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। তবে আদানির পতনে ভিন্ন ফল হতে পারে। কারণ এটি মোদির অর্থনৈতিক দর্শনের খারাপ দিক উন্মোচন করেছে। একটি একক গোষ্ঠীকে অন্তহীন আর্থিক সুবিধা দেওয়া এবং তাদের জন্য নিয়ম পরিবর্তন যে কার্যকর উন্নয়ন কৌশল নয়- সেটিই এখানে স্পষ্ট।

জয়তী ঘোষ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট; জর্ডান টাইমস থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×