সমকালীন প্রসঙ্গ
তরুণদের আকর্ষণ করতে পারবে বিএনপি?
এহ্সান মাহমুদ
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
ইউরোপের দেশ জার্মানিতে ২০১৭ সালের নির্বাচনের আগে কে সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ পড়েছিলাম। তার মধ্যে একটি ছিল– কোন দল ক্ষমতায় যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত প্রবীণদের হাতে। বয়স ৩০ বছরের চেয়ে কম– এমন ভোটারদের ভূমিকা ছিল অনেকটা ছোট বিরোধী দলের মতো। অর্থাৎ নির্বাচনে প্রভাব ফেলার মতো ক্ষমতা সেখানকার তরুণ ভোটারদের ছিল না। ৬০ বছরের বেশি বয়সী ভোটারের হার ৩৬ শতাংশ, আর ৩০-এর কম বয়সী ভোটার মাত্র ১৫ শতাংশ। এ কারণে জার্মানির নির্বাচন ও ভোট বিশেষজ্ঞরা এই পরিসংখ্যান দেখে দেশটির গণতন্ত্রকে ‘অবসরভোগীদের গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চলতি বছরের ২ মার্চ জাতীয় ভোটার দিবসে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। তাতে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ৪৪০। বাংলাদেশ পরিসংখ্যানমতে, দেশে জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৭ কোটি; ভোটার সংখ্যা তার ৭০ শতাংশ। তবে হালনাগাদ করার পরে এবার চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৯১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪০।
এসব ভোটার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দেবেন। ২ মার্চ পর্যন্ত চূড়ান্ত হালনাগাদে নতুন ভোটার বেড়েছে ৫৮ লাখ ৬৪ হাজার ৪৩০ জন। এ বছর নতুন ভোটার হয়েছেন ৮০ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৯ জন, ভোটার বেড়েছে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ।
ওদিকে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছে বিএনপি। গত বছরের জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকা বিএনপি এবার ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছে। ‘তরুণ প্রজন্ম দেব ভোট, ভোটের জন্য যুদ্ধ হোক’– এমন স্লোগানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ছয়টি বড় শহরে ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল। এতে চট্টগ্রাম, বগুড়া, খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং সর্বশেষ ঢাকায় সমাবেশ করা হবে বলে বিস্তারিত কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। এর আগেও বিএনপি বিভিন্ন পর্যায়ের আন্দোলন করেছে। কিন্তু শুধুই তরুণদের লক্ষ্য করে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার এবারের ঘটনাটি তাই মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে বৈকি।
আমরা স্মরণ করতে পারি, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনের সময় দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার জন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের সময় দেশের ভোটার সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭। ২০১৮ সালে এসে তা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১-তে। গত নির্বাচনের সময়ে নতুন ভোটার অর্থাৎ তরুণ ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি। এবার সেই সংখ্যা ৪ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এখন এই বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার কোন দিকে যাবেন– এটি একটি বড় প্রশ্ন। শুরুতেই উল্লেখ করা জার্মানির ভোটের ফলাফল প্রবীণরা নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশের ভোট দেখা যাচ্ছে তরুণদের নিয়ন্ত্রণেই থাকছে।
তরুণদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী কার্যক্রম করে চলেছে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে বিভিন্ন কাজ করছে তারা। তরুণদের জন্য এ সংগঠন ‘ইয়াং বাংলা’ নামে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এর আওতায় ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হচ্ছে। এটা সত্যি, বিএনপি প্রায় দেড় দশক রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। তাদের স্বাভাবিক কর্মসূচি পালনে যেখানে নানা রকম বাধা-বিপত্তি আসে, সেখানে এ ধরনের আয়োজন করার উপযোগী পরিবেশ-পরিস্থিতি দলটির আছে কিনা– সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে।
দেশে বিপুলসংখ্যক বেকারের তুলনায় বিনিয়োগ হচ্ছে না। কর্মসংস্থানের অভাব; বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণরা কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশ; ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সম্প্রতি কয়েক তরুণের আত্মহননের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমন বাস্তবতায় রজনৈতিক দল হিসেবে তরুণদের কাছে টেনে নেওয়ার মতো কর্মসূচি কি আমরা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিতে দেখেছি? শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধার বিষয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় আনতে হবে।
বর্তমান সরকারের আমলে তরুণদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু দেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ নির্বাচন ও ভোটাধিকারের ব্যাপারে এক ধরনের উন্নাসিকতা দেখিয়ে চলেছে। তরুণদের একটি অংশ ‘আই হেইট পলিটিকস’ বক্তব্য তাদের সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলে ঝুলিয়ে রাখছে। অথচ এ ভূখণ্ডের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস সবচেয়ে গৌরবের। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছাপ্পান্নতে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সে সময়ের ক্ষমতাসীনদের ভীতি ধরিয়ে দিয়েছিল।
এমন অতীতের দিকে তাকিয়ে যখন একটি বড় রাজনৈতিক দল শুধু তরুণদের জন্যই কর্মসূচি ঘোষণা করে, তখন কিছুটা আশাবাদী হওয়া যায়। বিএনপির এই ‘তারুণ্যের সমাবেশ’ কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, এ ভূখণ্ডের রাজনীতিতে বরাবরই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকা তরুণরা যে আবার সামনে আসছে– এটা নিশ্চিত। বিএনপি যেভাবে তরুণদের ভোট রক্ষায় নামাতে চাইছে, সেটা কতটা সফল হবে– সময়ই তা বলে দেবে।
এহ্সান মাহমুদ: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- এহ্সান মাহমুদ