অন্যদৃষ্টি
চিতার বেগে ছুটন্ত মারুফা
আলমগীর শাহরিয়ার
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
সৈয়দপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঢেলাপীর। সেই ঢেলাপীর থেকে ক্রিকেটার মারুফার রাজধানী শহর ঢাকার শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে উঠে আসার গল্প রূপকথাকেও যেন হার মানায়। গল্প বা সিনেমায় মানুষের জীবনের গল্প উঠে আসে। কিন্তু জীবন কখনও কখনও গল্প বা সিনেমারও অধিক। মারুফার জীবনও তাই। দারিদ্র্যের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া বর্গাচাষি পিতা আইমুল্লাহর টানাপোড়েনের পরিবারে ও রক্ষণশীল একটি সমাজে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ের ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন আপাত দৃষ্টিতে অবাস্তবই মনে হয়। কিন্তু স্বপ্ন যখন দুর্বার তখন তাকে রোখে– সাধ্য কার? মারুফার জীবনের বিজয়গাথাও যেন এখানে। হার না মানা, হাল না ছাড়া। অকপটে বলেছেন পিতার সঙ্গে মাঠে কৃষিকাজ আমাকে শক্তি ও সাহস দিয়েছে।
১৬ জুলাই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে প্রথম জয়ের অন্যতম কারিগর মারুফা। ২০১৮ সালের এশিয়া কাপের ঐতিহাসিক ফাইনালের পর ভারতকে আবার হারাল বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের তৃতীয় জয়। বিজয়ের কৃতিত্ব অষ্টাদশী মারুফাকে না দিলেই নয়। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ৪০ রানের জয়ে ৪ উইকেট নেন মারুফা। তাঁর সঙ্গী রাবেয়া নেন ৩ উইকেট। এভাবেই বিজয়ের পথ রচনা করেন। অথচ এই মারুফা বিকেএসপিতে ২০১৮-১৯ সেশনে ভর্তির জন্য নির্বাচিত খেলোয়াড় হলেও অর্থাভাবে ভর্তি হতে পারেননি। গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ হলে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবি। রত্ন চিনতে ভুল করেনি প্রতিষ্ঠানটি। মেয়েদের ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে হয়েছিলেন সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের মুকুটও উঠেছিল তাঁর মাথায়। তখন তিনি মাত্র দশম শ্রেণিপড়ুয়া। পরে মেয়েদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের জন্য ঘোষিত ১৫ জনের দলেও ডাক পান মারুফা আক্তার।
ষাটের দশকেও পুরান ঢাকায় নারীদের ঘর থেকে বের হতে হলে রিকশার চারদিকে পর্দার ঘেরাটোপে বন্দি থাকতে হতো; সেখানে আজকের বাংলাদেশে মারুফা সেই ঘেরাটোপ ভেঙে চিতার বেগে দৌড়ে মাঠে বল করছেন। এই সাহস মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের নারীদের অর্জন। কখনও ধর্মের দোহাই দিয়ে, কখনও সামাজিক রীতিনীতি বা প্রথার দোহাই দিয়ে নারীদের যুগ যুগ ধরে ঘরবন্দি করে রাখা হয়েছে। বাংলায় নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া তাঁর লেখায় বলেছিলেন, ‘যখনই কোনো ভগিনী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে।’ রোকেয়ার দেখানো পথে মারুফারা সে বাধা অতিক্রম করেছেন।
প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মারুফারা তাই নারীদের এগিয়ে যাওয়া ও আগল ভাঙার দারুণ প্রতীক; প্রেরণার উৎস। এ দেশে কর্মক্ষেত্রেও নারীদের জয়জয়কার– প্রশাসন, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, ব্যাংক, এনজিওতে। আমাদের বিশাল পোশাকশিল্পে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সামাজিক অপবাদকে পরোয়া না করে বেরিয়ে আসা বস্ত্রবালিকারা এ দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করেছেন। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও আমাদের অর্জন দেশের সীমানা পেরিয়ে মারুফাদের হাত ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যাক।
চিতার বেগে ছুটছ তুমি, ছুটছে তোমার পা/ আগুন হয়ে জ্বলতে থাকো ভগিনী মারুফা।
আলমগীর শাহরিয়ার: কবি ও গবেষক
alo.du1971@gmail.com
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- আলমগীর শাহরিয়ার