পাকিস্তান
বাতিল ইমরান এবং গণতন্ত্র ও কারাদণ্ড
ইমরান খান। ছবি: সংগৃহীত
এফ এম শাকিল
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৩ | ০৩:১৯
ইসলামাবাদের আদালত ৫ আগস্ট পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ এক রায় দেন। দায়িত্ব পালনে তাঁর গুরুতর অপরাধ পেয়েছেন আদালত। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় উপঢৌকন বিক্রয়ের বিষয়টি ইমরান খান তাঁর আয়কর ও সম্পদ বিবরণী তালিকায় উল্লেখ করেননি। কাজেই জনপ্রিয় নেতা, ক্রিকেটের সাবেক এ তারকাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর পর ন্যূনতম ৫ বছরের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রীয় পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। আদালতের সিদ্ধান্তের পর পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন দ্রুতই পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ইমরান খানের রাজনৈতিক অভিলাষের পথে ২০২৮ সাল পর্যন্ত লাগাম টানে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই সিদ্ধান্তের সময়টা খেয়াল করার বিষয়। এমন সময় ইমরান খানকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় যখন পাকিস্তান কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১২ আগস্ট বর্তমান জাতীয় পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ইমরান খানের উত্তরসূরি শাহবাজ শরিফ ও বিরোধী নেতা রাজা রিয়াজের মধ্যে এক চুক্তির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘কম পরিচিত সিনেটর’ আনওয়ারুল হক কাকার-এর নাম ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে তিনি শপথ নিয়েছেন।
৭০ বছর বয়সী ইমরান খান জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি সাড়ে তিন বছর পরমাণুসমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান শাসন করেছেন। গত বছর বিরোধীরা একাট্টা হয়ে তাঁকে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। এর মাধ্যমে যেভাবে তাঁর রাজনৈতিক পতন ঘটানো হয়েছে, তাঁর অনেক সমর্থকের মতে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পাকিস্তানি মিত্রদের হাত রয়েছে। এটি সেই নাটকের সর্বশেষ পর্ব, যেখানে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়, ক্যারিশম্যাটিক নেতাদের যারা ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার’ বাইরে গেছেন, তাদের আইনিভাবে পর্যুদস্ত করা হয়েছে।
যেসব সরকার দেশ পরিচালনায় নিজস্ব পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতি গ্রহণ করেছিল, তারাও দ্রুত পতনের শিকার হয়েছে। তারা বিদেশ সমর্থিত ষড়যন্ত্রের শিকার। গণতান্ত্রিক কিংবা ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ শক্তির কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানানো নেতাদের অপসারণ কি পরিকল্পিত কৌশল, নাকি কাকতালীয় ঘটনা? প্রথিতযশা লেখক ও লাহোরের ফরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের অধ্যাপক পারভেজ হুদভয় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। ক্রেডলে প্রকাশিত মন্তব্যে তিনি বলেছেন, ইমরান খানের কারাবাসের ক্ষেত্রে বাইরের প্রভাবের বিষয়টি প্রমাণিত নয়। ‘ইমরান খান নিজের লাভের বেলায় বেপরোয়া ছিলেন। এই আত্মকেন্দ্রিকতাই তাঁর পতন অনিবার্য করে তুলেছিল।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর যে যোগসাজশ, তা ছিল পুরুষতান্ত্রিক নীতি, আগ্রাসী সামরিকবাদ, ভারতবিরোধী প্রবণতা, ইসলামমনা এবং নারীবাদবিরোধী অভিন্ন ভূমিকা নেওয়ার বেলায়। এগুলো তাঁর পতনে ভূমিকা রাখে।
হুদভয়ের ভাষায়, ‘কয়েক বছর তিনি এবং সেনাবাহিনী একই সুরে গান গেয়েছেন এবং খান তাদের সব অভিলাষ পূরণ করেন। এমনকি তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও গৃহায়ন প্রকল্প নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘খান নিজেকে এরদোয়ান হিসেবে ভাবতেন। তাঁর চারপাশে ছিল অনুগত কর্মী বাহিনী, যারা তাঁর খারাপ কাজ দেখেও দেখেনি। ইমরান খান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইপ্রধান নিয়োগের বেলায় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্বিমত করেন। সেখান থেকেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর বিরোধের সূচনা। তা-ই শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ডেকে আনে। তিনি যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে জেনারেল ফয়েজ হামিদকে বসাতে পারতেন, তবে হয়তো পরবর্তী ১০ বছরের জন্য তাঁর ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত হয়ে যেত।’
তবে বিপরীত মতও রয়েছে। যারা জোর দিয়ে বলছেন, গ্লোবাল সাউথজুড়ে উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদের পতনের পেছনে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা (Rules based international order) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইমরান খানসহ এসব নেতা স্বাধীন অবস্থান গ্রহণের জন্য সংকটে পড়েছেন। সমালোচকদের মতে, এখানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা আরও ভয়ানক বাস্তবতাকে আড়াল করছে। এখানে শক্তিশালী দেশের একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রভাব খাটিয়ে ব্যবস্থাকে পক্ষে আনে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ কমই নিয়েছে।
ইতিহাসের পর্যালোচনায় সমালোচকরা দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং এর পশ্চিমা মিত্ররা বিশ্বব্যাপী নির্বাচিত বৈধ সরকারের পতনে সেনা অভ্যুত্থানের বন্দোবস্ত করে প্রায়ই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রদ করে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ প্রযোজিত ক্যু হয় ইরানে। পরের বছর গুয়াতেমালা সরকারকে অস্থিতিশীল করা হয়। এভাবে কয়েকটি অভ্যুত্থানে জড়িত ছিল যুক্তরাষ্ট্র। যেমন ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও চিলি। এগুলো পশ্চিমাদের নির্বিচারে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের উদাহরণ।
গবেষণার তথ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ৮০টিরও বেশি দেশের নির্বাচন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে দুই ডজন গণতান্ত্রিক দেশ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপকে অবমূল্যায়ন করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সংকটের সূচনা করে ২০১৪ সালে। তারা রাশিয়া সমর্থিত নির্বাচিত ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিক্ষোভে ইন্ধন দেয়।
২০২২ সালের এপ্রিলে ইমরান খানের পতনের আগে ইমরান খান অভিযোগ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শক্তি তাঁর পতনে জড়িত। ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটন যদিও সে অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে। এখন পাকিস্তান এগোচ্ছে বটে; কিন্তু ইমরান খানের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব নিঃসন্দেহে দেশটির রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পড়বে। অঞ্চলটিতে একদিকে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয় দশা, অন্যদিকে ইউরেশীয় একত্রকরণ। এ সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন এবং সামনে রয়েছে জাতীয় নির্বাচন। জাতির ভবিষ্যতের ওপর এসবের প্রভাব থাকবে নিঃসন্দেহে।
এফ এম শাকিল: পাকিস্তানি সাংবাদিক; দ্য ক্রেডল থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক