ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

আইন শিক্ষায় অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা

আইন শিক্ষায় অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা
×

ড. তৌহিদুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক, যাতায়াত, পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন স্থানে অবস্থান এবং সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিক কষ্ট লাঘবে উচ্চশিক্ষায় অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার প্রসঙ্গটি বেশ জোরেশোরেই তুলেছিলেন। তার এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ত্রিশটির মতো সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর গুচ্ছ পদ্ধতিতে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করতে চলেছে। কয়েকবার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে মেডিকেল কলেজগুলোর অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা বেশ সফলভাবেই সম্পন্ন হচ্ছে। কাজেই গুচ্ছ পদ্ধতিতে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি এদেশে এখন সময়োপযোগী এবং পরীক্ষিত।
আমাদের দেশে কোনো বিশেষায়িত আইন বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও প্রায় সব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে আইন পড়ানো হয় এবং সবখানেই আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানো হয়। তবে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা আইন অনুষদে ভর্তি হয়। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ডিসিপ্লিন থেকে এসে ছাত্রছাত্রীরা আইনে ভর্তি হতে পারলেও আইন একটি বিশেষায়িত বিষয়। এ বিষয়টি পড়তে হলে যথেষ্ট মেধাজ্ঞান, চিন্তাশীলতা, আইনশাস্ত্রীয় প্রশ্ন, আইনের বাধ্যবাধ্যকতা ও আদর্শিকতা বুঝতে প্রাসঙ্গিক অন্তর্দৃষ্টি এবং ইংরেজি ভাষায় যথেষ্ট পারদর্শিতা দরকার হয়। পৃথিবীর দেশে দেশে আইন শিক্ষা এখন আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ বা অনুষদেই সীমাবদ্ধ নেই; আইন নিয়েই একটি পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে যুক্তরাজ্য, ভারতসহ আরও অনেক দেশে। কাজেই আইন বিষয়ের স্বাতন্ত্র্য এবং এ জন্য একটি আলাদা ভর্তি কাঠামো এখন শুধু একটি দেশীয় দাবি নয়; একটি বৈশ্বিক দাবি হয়ে উঠেছে। এসব কারণে আইন বিষয়ে ভর্তির জন্য এদেশেও দরকার একটি আলাদা ভর্তি পরীক্ষা।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আইন কলেজ এবং দেশের বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ানো হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে আইন পড়ানো হয়, সেখানেও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; কারণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেখানে যে কোনো মানের শিক্ষার্থীকে ভর্তি করে নিতে দেখা যায়। এ ছাড়া আইন কলেজগুলোতে অন্য বিষয়ে ইতোপূর্বে স্নাতকধারী ছাত্রছাত্রীদের আইন পড়ানো হলেও সেখানে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন পড়তে চাইলে একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে যেটি তাদের কাছে বোঝার মতো মনে হয়। এ ছাড়া কোনো কোনো সময় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সূচির সঙ্গে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়সূচি সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং এতে একজন শিক্ষার্থী কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা মিস করতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও যাতায়াতসহ নানাবিধ সমস্যা। এসব থেকে মুক্তি পেতে দরকার আইনে বিষয়ে গুচ্ছ পদ্ধতির অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা।
গুচ্ছ পদ্ধতির অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা নিতে আইন ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বা প্রাইভেট যা-ই হোক, তারা নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদন করে মেডিকেল কলেজগুলোর মতো একটি অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন সমুন্নত রেখে তাদের একত্রিত করতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় একটি নির্দিষ্ট মার্কসের ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান এবং এরূপ ভর্তি পরীক্ষায় একটি নূ্যনতম মার্কস পেলে শিক্ষার্থীদের তাদের মেধাক্রমানুযায়ী জাতীয় মেরিটলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদানুযায়ী শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার ভিত্তিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবে- এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি রায় বলবৎ রয়েছে। এটি অনুসারে কোনো সেমিস্টারে একটি পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চাশ জনের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে না।
আইন বিষয়ে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান। যেমন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আইনি শিক্ষার মান এবং আইনি শিক্ষার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে তেইশটি ন্যাশনাল ল' ইউনিভার্সিটির মধ্যে বাইশটি বিশ্ববিদ্যালয় কমন ল' অ্যাডমিশন টেস্ট (সিএলএটি) নামে ভর্তির জন্য একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় স্তরের ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে। ভারত সরকার, ভারতের বার কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে একটি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয় যেটির ভিত্তিতে সেখানে একটি অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে আইন বিষয়ে ভর্তি হতে ভর্তির পূর্বশর্ত হিসেবে যে কোনো বিষয়ে একটি সন্তোষজনক গ্রেড পয়েন্ট গড়সহ (জিপিএ) স্নাতক ডিগ্রি এবং ল' স্কুল অ্যাডমিশন টেস্টে (এলএসএটি) সন্তোষজনক স্কোর প্রয়োজন হয়। কানাডাতেও এলএসএটির ভিত্তিতে আইন বিষয়ে ভর্তি হতে হয়।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি চুক্তির মাধ্যমে আইন বিষয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘব হবে, অন্যদিকে যোগ্য শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশে আইন শিক্ষার মান ত্বরান্বিত করতে পারবে এবং এতে দেশের বিচার ব্যবস্থা উন্নত হবে।
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×