ফিরে দেখা
২১ ফেব্রুয়ারির বিক্ষোভে আমিও ছিলাম
এ.আর. শাহজাহান ইউসুফ
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০
জন্মের সময় খুবই রুগ্ণ এবং স্বাভাবিক শারীরিক ওজনের অনেক কম ছিলাম আমি। অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার ডেকে এনেছিলেন আমার বাবা এ.এফ.এম. ইউসুফ। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন সরকারি কর্মকর্তা। সেই অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার চেষ্টা করেও কিছু করতে না পেরে বলেছিলেন- 'এ ছেলে বাঁচবে না।' আমার বাবার এক বন্ধু ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। আব্বা তাকে ফোন করে বাসায় ডেকে আনলেন। তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে আমাকে ওষুধ দিতে থাকলেন। সন্ধ্যার সময় আমি কেঁদে উঠলাম।
আমাদের বাসায় একজন বয়স্ক গৃহকর্মী ছিলেন, কলকাতার বাসিন্দা। তিনি বলে উঠলেন- "ওমা, এ ছেলে বাঁচল কী করে! আমি এ ছেলের নাম রাখলাম 'আল্লাহ রাখা'।" সেই আমি এ.আর. শাহজাহান ইউসুফ নামে ৮৪ বছরেও বেঁচে আছি।
এই দীর্ঘ জীবনে যে তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে আমি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলাম, তার মধ্যে 'একাত্তরে বন্দি শিবিরের অভিজ্ঞতা' সমকালে প্রকাশ হয়েছে (২৮ অক্টোবর, ২০২১)। আরেকটি ঘটনা ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন।
তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা পরিদর্শনে এসে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য দেন। এক পর্যায়ে ইংরেজিতে বলেন- উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; অন্য কোনো ভাষা নয়।
সেই বিশাল জনসভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ছিলেন সম্মুখভাগে। তারা প্রবল প্রতিবাদ করলেন- নো, নো। সঙ্গে সঙ্গে আমিও প্রতিবাদ করে বললাম- নো নো। এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম প্রতিবাদ এবং ভাষা আন্দোলনে আমার অংশগ্রহণ। সেই সময় আমার বয়স ১১ বছর।
১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আমি কলকাতায় বেড়ে উঠি। বাবার অফিস ছিল কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় আমরা কলকাতার ৫৮ নম্বর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের আলিয়া ম্যানশন নামে পরিচিত একটি দোতলা আবাসিক ভবনের ওপরতলায় বাস করতাম। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান দুটি মূলত ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে।
দেশ বিভাগের সময় আমার বাবা ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পদে আসীন ছিলেন। পাকিস্তানের দিকে 'অপশন' দিয়ে তিনি সপরিবারে তৎকালীন পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকায় এসে প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েটে যোগদান করেন। এই সময় আমরা বসবাস করতাম ঢাকার নবাবগঞ্জের পানির ট্যাঙ্কের উল্টোদিকে সরকারি বাসভবনের গভর্নমেন্ট রিকুইজিশন হাউসে। যেহেতু বাবা সরকারি কর্মকর্তা; সরকারিভাবে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করার জন্য বরাদ্দ পান। বাড়িটির মূল মালিক ছিলেন গোলাপ শাহ নামে এক ভদ্রলোক।
ভাষা আন্দোলন বিষয়ে আমাকে প্রথম উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তৎকালীন পূর্ববাংলা সেক্রেটারিয়েটের চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারী। তিনি আমার বাবার পিওন ছিলেন, নাম সোলায়মান। আমাদের বাসাতেই থাকতেন। তিনি কিছুটা লেখাপড়া জানতেন বিধায় রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি আমার সঙ্গে জনসভায় যাবে? আজ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বক্তৃতা করবেন। আরও বললেন, তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে ঘোষণা দেবেন এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে। আমি বললাম- কেন উর্দু হবে? বাংলা হবে না? তখন সোলায়মান বললেন- বাংলা হবে না; তোমাকে উর্দুতে লেখাপড়া করতে হবে এবং উর্দুতে কথাবার্তা বলতে হবে। আমি বললাম- না, আমি উর্দু বলব না। আমি এই জনসভায় যাব এবং প্রতিবাদ করব।
বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সোলায়মানের সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছানোর পর সেখানে দেখলাম লাখ লাখ লোকের সমাগম।
আজও মনে পড়ে সেদিনের কথা। সেদিন পূর্ববাংলার লাখ লাখ লোক জনসভায় এসেছিল ট্রেন-বাস, নৌকা, গরুর গাড়ি করে। এমনকি হেঁটে বিভিন্ন জেলার গ্রাম-গঞ্জ থেকেও এসেছিল। রেসকোর্স ময়দান একটি বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
জিন্নাহ সাহেব তার বক্তৃতায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর ছাত্র-জনতা যখন প্রতিবাদ করল, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে জনসভার সম্মুখভাগে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। উপস্থিত অন্য লোকদের দিকে তাকিয়ে অন্য বিষয়ে ভাষণ দিতে থাকলেন।
জনসভার পর ভাষা আন্দোলন সারা পূর্ববাংলায় ছড়িয়ে পড়ল এবং উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার দাবি জানানো হলো। যদিও জনসংখ্যা অনুপাতে বাংলাভাষীই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তা সত্ত্বেও জিন্নাহ সাহেব উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা সফল হয়নি।
এ প্রসঙ্গে অবশ্যই বলতে হয় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। পূর্ববাংলা থেকে নির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য প্রস্তাব করেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। তিনি যুক্তি দেখালেন- পাকিস্তানে বাংলাভাষীই সংখ্যাগরিষ্ঠ; উর্দুভাষী নয়। কিন্তু তারা সেটা মানতে রাজি না হওয়ায় পরিষদ সদস্যদের মধ্যে বাংলা ভাষা নিয়ে ভোটাভুটি হয়। গণপরিষদে পূর্ববাংলা থেকে নির্বাচিত মুসলিম লীগ সদস্যরা বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও উর্দুর পক্ষে ভোট দেন। এটা হলো, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম নেতাদের পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করার কারণে।
গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়- ২৯ ফেব্রুয়ারি পূর্ববাংলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করা হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তমদ্দুন মজলিসের আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১ মার্চ, ১৯৪৯ সালে ছাত্র-জনতা ধর্মঘট পালন করে।
নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে আমরা ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ছাত্ররা মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় উপস্থিত হই। সেদিন সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কলাভবন চত্বরে (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ) এসে জড়ো হতে থাকেন। আমার বড় ভাই এস.টি.আর. ইউসুফও ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনিও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। আমাদের গাইড করে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের স্কুলের দশম শ্রেণির এক ছাত্র, যাকে আমরা 'বড় ভাই' বলে ডাকতাম। আমার বয়স তখন ১৫; নবম শ্রেণির ছাত্র।
যারা ওই দিন ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আমতলায় জড়ো হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আমার তিনজন সহপাঠীর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। তারা হলেন রেজাউল করিম (ভাষাসংগ্রামী), আজিজুর রহমান এবং ছানা উল্লাহ। সকাল থেকেই পুলিশ বাহিনী, ইপিআর বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের বাইরে অবস্থান নেয়। সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে কলাভবন প্রাঙ্গণে আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়- পূর্বদিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। অর্থাৎ ৫ (পাঁচ) জন করে একেকটি দল বের হবে। সে অনুযায়ী আমরা পাঁচজন করে একেকটি দল বের হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে লোহার গেটের দিকে অগ্রসর হই। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আবদুল মতিন (ভাষাসংগ্রামী) ১৪৪ ধারা ভঙ্গের যুক্তি দেখালেন। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়- ১০ জন করে ছাত্রছাত্রী একেকটি দলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোহার গেট থেকে বের হতে থাকবে। আমি তখন আমতলায় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' স্লোগান দিতে থাকি।
প্রথমে ছাত্রীদের একটি দল বিশ্ববিদ্যালয় লোহার গেট দিয়ে বের হয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী তাদের বাধা না দেওয়ায় তারা প্রাদেশিক পরিষদের সামনে চলে যায়। সেখানে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী তাদের অগ্রসর হতে বাধা দেয় এবং লাঠিচার্জ করে। এর মধ্যে আমরা ছাত্ররা দলে দলে লোহার গেট দিয়ে বের হতে থাকলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে এবং ধরে ধরে পুলিশ ভ্যান-ট্রাকে ওঠাতে থাকে। তারপরই পুলিশ 'টিয়ার গ্যাস' ছোড়া শুরু করে।
কাঁদানে গ্যাসের প্রভাবে চোখ প্রচণ্ডভাবে জ্বালা করছিল। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল অনবরত। আমরা ছাত্ররা পুলিশের লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাস ছোড়ার প্রতিবাদে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' স্লোগান দিতে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকি। দুপুর আনুমানিক দেড়টার সময় আমার বড় ভাই এস.টি.আর. ইউসুফ ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিক থেকে এসে আমাকে বলেন, তুমি বাসায় চলে যাও। উত্তরে আমি বললাম, যাব না। তিনি তখন বললেন, তোমার বয়স কম। তুমি টিয়ার গ্যাসের জ্বালা সহ্য করতে পারবে না। এর পর বাধ্য হয়ে আমি বাসায় ফিরে গেলাম।
পুনরায় আন্দোলনে যোগ দিতে বিকেল বেলা বাসা থেকে রওনা দিলাম। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে উপস্থিত হওয়ার পর দেখি, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। পরে জানতে পারলাম, বিকেল ৩টার দিকে গুলি চালিয়েছে তারা। শহীদ হয়েছেন সালাম, রফিক, জব্বার। আহত অনেক ছাত্র।
পরের ইতিহাস সবারই জানা। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন, ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন; পরিশেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি ক্রয় কর্মকর্তা
- বিষয় :
- ফিরে দেখা
- এ.আর. শাহজাহান ইউসুফ