ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব

নতুন বছর সংঘাত, সংকট আর অনিশ্চয়তার

নতুন বছর সংঘাত, সংকট আর অনিশ্চয়তার
×

মাহবুব উল্লাহ্

মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২৩:১০

নতুন বছর আসছে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ কিরিবাতিতে প্রথম সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে নতুন বছরের সূচনা হবে। ধীরে ধীরে নতুন বছরের সূর্যালোক ছড়িয়ে পড়তে থাকবে পশ্চিম দিকে। পূর্ব গোলার্ধ আলোকিত করে সূর্য কিরণের ছটা ছড়িয়ে পড়বে পশ্চিম গোলার্ধে। দুনিয়ার দেশে দেশে আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেবে বিশ্ববাসী। যে কোনো নতুনের আগমন মানুষকে উদ্বেলিত করে, আহ্লাদিত করে। কিন্তু সে উদ্বেলিত ভাব কতটা স্থায়ী হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। যুদ্ধ, বিগ্রহ, অর্থনৈতিক মন্দা, রোগব্যাধির সংক্রমণ, জলবায়ুর যথেচ্ছাচার পৃথিবীবাসীকে খুব আনন্দে রাখেনি। দুঃখ-বেদনায় জর্জরিত হওয়ার অনেক কারণ আছে। তবু মানুষ আশাবাদী হতে চায়। বিশ্বাসের সঙ্গে বুক বেঁধে আস্থাশীল চিত্তে ভবিষ্যতের দিনগুলো ভালোই কাটবে বলে ভাবতে চায় মর্ত্যলোকের মানুষ। আশাবাদী হওয়াই মানুষের ধর্ম। আশা না থাকলে এই পৃথিবীর বুকে মানুষ বাঁচতে পারত না। শিশুসন্তানকে হারিয়ে মানুষ অশ্রু ঝরায়। তারপরও সেই বেদনা ভুলে গিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে। এই স্বপ্ন দেখাটা মানুষের চিরন্তন অভ্যাস। মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’। তাঁর মতো করে সব মানুষ খুব বড় না হলেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক স্বপ্ন দেখে; যার মাথার ওপর চাল নেই, সে স্বপ্ন দেখে একদিন তার একটি পর্ণকুটির হবে। 

বর্তমান পৃথিবীতে আটশ কোটি মানুষের বাস। অনেক বিজ্ঞানী গবেষণা করে দেখেছেন পুরুষ মানুষের ডিএনএতে পরিবর্তন আসছে, যার ফলে সন্তান উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হতে পারে। ফলে আটশ কোটি মানুষের এই পৃথিবী এখন যতই জনাকীর্ণ মনে হোক না কেন একদিন ভয়াবহভাবে জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়ালের কাছে মানুষ বড় অসহায়। যুগের পর যুগ কেটে গেছে, তার সমান্তরালে কেটেছে অনেক জনমিতিক উত্তরণ। জনমিতিক উত্তরণের অনিশ্চিত খেয়ালে যদি পরিস্থিতি বিপরীতমুখী হতে শুরু করে তাহলে হয়তো আমাদের এই পৃথিবী ধনধান্য পুষ্পে ভরে উঠবে। গাছের শাখায় পাখি আবার গান গাইবে, নদীতে স্রোত ফিরে আসবে। নতুন যুগের প্রযুক্তিহীন মাঝি হয়তো আবার ভাটিয়ালি গানে দুই পাড়ের মানুষকে মুগ্ধ করে তুলবে। আমরা জানতাম, ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস,/ ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।’ এই সুখ-অসুখের দ্বন্দ্বে দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে অশান্তি-সংঘাত লেগে থাকত। এক পাড়ের মানুষ অপর পাড়ের মানুষকে ঘৃণা ও ক্রোধের চোখে দেখত। আমরা আশা করব নতুন যুগের মাঝির গান এই দুই কূলের মানুষের মধ্যে যে অসূয়া ও দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে তার অবসান ঘটাবে। এমন এক পৃথিবী গড়ে উঠবে, যেখানে যত সুখ-সমৃদ্ধি সবাই ভাগ করে নেবে। ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে/ যাবে না ফিরে।’ 

বর্তমান বিশ্বে যে ক’টি তপ্ত অকুস্থল রয়েছে তার মধ্যে অবস্থান করছে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ও দক্ষিণ চীন সাগর। ইউক্রেন সম্পর্কে পাশ্চাত্য শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে এসেছে ইউক্রেনকে রক্ষা করা যাবে না। সুতরাং ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সমাধানটি আশা করা যায়, তা হলো এক ধরনের জাতিসংঘভিত্তিক অছি ব্যবস্থা। মজার ব্যাপার হলো, সোভিয়েত রাশিয়ার দুর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ ইউক্রেনের নাগরিক ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের বন্ধন কত শক্তিশালী। এই বন্ধন ছিন্ন করার যে কোনো চেষ্টা নিঃসন্দেহে রক্তপাতের সূচনা করবে। রক্তপাতের মাধ্যমেই এই বন্ধন পুনরুদ্ধার হবে। হয়তো আসছে বছর এই বন্ধন নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হবে। দুঃখজনক রক্তপাতের অবসান হবে। ইউক্রেন বিশ্বসভ্যতাকে অনেক কিছু দিয়েছে। ইউক্রেনের সমুদ্রজাহাজ ও উড়োজাহাজ শিল্প খুবই উন্নত হয়ে উঠেছিল। ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম শস্যভান্ডার। তাই বিশ্বকে দেবার অনেক কিছুই আছে ইউক্রেনের। আমরা স্বপ্ন দেখি ইউক্রেনে যে কোনো মূল্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ইউক্রেন পৃথিবীকে যা দিতে পারে তা দিয়ে সবার প্রত্যাশা পূরণ করবে। বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন নিয়ে যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, ইউক্রেন সমস্যার সমাধান হলে সেই আশঙ্কার কালো মেঘ কেটে যাবে। 

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আশা প্রকাশ করেছেন, তাইওয়ান শান্তিপূর্ণভাবে চীনের সঙ্গে মিলিত হবে। ১৯৪৯-এর বিপ্লবপূর্ব চীনে তাইওয়ান ও চীন মূল ভূখণ্ডের একই রাষ্ট্র ছিল। চীনের দক্ষিণপন্থি কুওমিংটাং শাসকরা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বিপ্লবী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অবশিষ্ট সৈন্যসামন্ত ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়। 

তাইওয়ানে নির্বাচন হতে চলেছে। বেশ কয়েকটি দল এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ দলগুলোর মধ্যে যেমন ঘোর চীনবিরোধী আছে, সেই সঙ্গে চীনের প্রতি সহানুভূতিশীলও আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ানে বিতর্কিত সফরে গেলে চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। চীনের যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের আকাশসীমা ছুঁইছুঁই করে। চীন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল তাইওয়ানের পক্ষ থেকে অযাচিত কোনো পদক্ষেপ তারা সহ্য করবে না। চীন এখনও বলছে তাইওয়ানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণ চীনের লক্ষ্য। কিন্তু প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ থেকে চীন বিরত থাকবে না। চীনের সীমান্ত নিয়ে অনেক মজার মজার গল্প আছে। 

১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধ হলে ভারত চরমভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু চীন ভারতের কাছ থেকে দখল করা ভূখণ্ড ধরে রাখেনি। এটাই হলো চীনের সীমান্ত কূটনীতি। চীন এখন মানচিত্র দিয়ে দেখাচ্ছে অরুণাচল প্রদেশ তার রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের অংশ। এদিকে ভারতও কম যায় না। ভারতের সংসদ ভবনে একটি ম্যুরালের তৈরি মানচিত্র স্থাপন করা হয়েছে, যা অশোকের যুগের মহাভারতকে প্রদর্শিত করছে। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় বাংলাদেশে আমরা সে রকম কিছু দেখছি না। 

১৯৪৮ থেকে ফিলিস্তিন জ্বলছে। ফিলিস্তিনে গণহত্যা চলছে। ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব আবাস ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে পরবাসীতে পরিণত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি শিশুরা সাহিত্যের যে বই পড়ে তাতে আছে– পাখিদেরও বাসা আছে কিন্তু আমাদের কোনো বাসগৃহ নেই। ফিলিস্তিনিদের যুগ-যুগান্তের বাসগৃহ থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে ইসরায়েলিদের বাসস্থান নির্মাণ করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের ক্ষেতখামার, ফসল, পালন করা পশু সবই দখল করে নিচ্ছে ইসরায়েলিরা। পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দেসে ফিলিস্তিনিদের নামাজ আদায় করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এখন গাজায় নৃশংস, নিষ্ঠুর, রক্তক্ষয়ী গণহত্যা চলছে, তা থেকে মনে হয় ইসরায়েল চাইছে পুরো গাজাকে বিরান প্রান্তরে পরিণত করতে। বিশ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। গাজার যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছে। যতটুকু শক্তিতে কুলায় তারা ইসরায়েলি আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিচ্ছে। 

বিশ্বব্যাপী ইহুদি সম্প্রদায় এখন আর আগের মতো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ নয়। তাদের মধ্যে যাদের নৈতিকতাবোধ, ন্যায়বোধ ও শ্রেয়বোধ আছে তারা এই যুদ্ধের নিন্দা করছে এবং যুদ্ধের অবসান চাচ্ছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসরায়েলের অন্যায় যুদ্ধের প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। মার্কিন সরকার ইসরায়েলঘেঁষা নীতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও মার্কিন জনগণের অন্তত ৬০ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মেরূকরণ শুরু হয়েছে। তুরস্ক ফিলিস্তিনে যোদ্ধা পাঠিয়েছে। একটি চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ ফিলিস্তিনে গেছে। এই জাহাজ থেকে আকাশ ও জলপথে আক্রমণ সম্ভব। এসবের পাশাপাশি আঞ্চলিক গেরিলা যোদ্ধা, যাদের মধ্যে রয়েছে হিজবুল্লাহ ও হুতি যোদ্ধা, তারা ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের বিরোধমূলক সম্পর্কের অবসানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে। রক্তপাতে ধ্বংস হওয়ার উপক্রম ফিলিস্তিনের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর অকল্পনীয় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়াও ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াতে কসুর করছে না। সিরিয়ার গোলান মালভূমি এখনও ইসরায়েলের দখলে। এই সিরিয়া কিছুতেই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বেইমানি করতে পারে না। 

বিখ্যাত র‌্যাডিক্যাল অর্থনীতিবিদ সামির আমিন হিসাব করে দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বিশ শতকের তুলনায় একুশ শতকে এসে অর্ধেক হয়ে গেছে। বিভিন্ন ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োগ সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। চীনের মতো বড় দেশের প্রবৃদ্ধি যদি হ্রাস পায় তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। এ পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদী বিশ্ব সংকট থেকে উত্তরণের ভালো কোনো উপায় নেই। পুঁজিবাদী বিশ্বতে যুদ্ধবিগ্রহ বাধিয়ে লুণ্ঠন ও দেশ দখলের মধ্য দিয়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। মূল সমস্যাটা এখানেই। আসছে বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে এ সংকটকেই দায়ী করতে হবে। পুঁজিবাদীরা বুঝতে পারে না, যুদ্ধ সমস্যার সমাধান নয়। প্রথম মহাযুদ্ধের ফলে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার উদ্ভব ঘটেছিল। তার সঙ্গে উদ্ভব ঘটেছিল পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উত্থান ঘটল মহাচীন, ভিয়েতনাম, লাওস, কিউবা ও উত্তর কোরিয়ার। এসব পরিবর্তন যদি মানবসভ্যতার জন্য কল্যাণকর হয় তাহলে এগুলোকে অভিনন্দিত করতে হবে। যদি কল্যাণকর না হয় তাহলে উন্নততর কোনো ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। সে জন্য হয়তো আমাদের প্রয়োজন হবে নতুন যুগের জন্য একজন কার্ল মার্কসের।

মাহবুব উল্লাহ্ : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক

আরও পড়ুন

×