জীবনযাত্রা
অবসর জীবনের বিড়ম্বনা
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ জুন ২০২২ | ১৩:১১
ব্রিটিশরা বলে, মানুষের জীবনকাল তিন পর্ব বা ধাপে এগিয়ে যায় এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে উপনীত হয়। প্রথমে প্রস্তুতিকাল লেখাপড়া, ডিগ্রি, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। পরে কর্মকাল চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশাগত দিক ইত্যাদি। সবশেষে অবসর জীবন, তবে শেষাংশের জন্য পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয়। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন- কোথায়, কীভাবে, কার সান্নিধ্যে থেকে নিজের জীবনাবসান-পূর্ববর্তী চিরায়ত মুহূর্তগুলো উপভোগ করবেন বা আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়ে এ পৃথিবীর অমোঘ বাঁধন ছিন্ন করবেন। জীবদ্দশায় এটাই তাঁদের কাছে অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। আমাদের মতো দেশে, বর্তমান সমাজ-বাস্তবতায় এমনভাবে বাঁচার কথা ভাবা এখনও প্রায় অসম্ভব। এখানে মনে হয়, এর সব দ্বার রুদ্ধ হয়ে আছে।
মৃত্যু সবকিছুকে দ্রুত বিলীন করে দেয়, তা যেমন ধ্রুব সত্য, তেমনি কোনো কোনো কর্মচারীর অবসর জীবন যেন তাঁকে মৃত্যুর চেয়েও নিঃসঙ্গ করে তোলে। তাঁর থাকা, না থাকাকেও হার মানায়। এখানে জীবনভর ক্ষমতার সঙ্গে বসবাস না করতে পারা অপরাধের শামিল। ক্ষমতাহীনের কাছ থেকে তাঁর চিরচেনা চারপাশ দ্রুততার সঙ্গে সরে পড়ে, দূরে চলে যায়। এটা যেন অলিখিত নিয়ম বা বিধিলিপিতে পরিণত হয়ে আছে। এখানে চেয়ারে যিনি সাময়িক উপবিষ্ট তাঁর ব্যস্ততার শেষ নেই। তবে তা যে সামাজিক সম্পর্কের চেয়ে অধিকতর ক্ষণস্থায়ী, তা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না। তাঁর অবস্থা ও অবস্থান যে একদিন অন্যদের চেয়েও দুঃসহ হতে পারে- তাও বেমালুম ভুলে যান। বাঙালির আবেগ, হাসি-কান্না, আতিথেয়তা নিয়ে অতীতে সবাই কমবেশি বলে গেছেন। তবে বাঙালির চোখের পর্দাহীনতা নিয়ে বড় কোনো কাজ নেই আমাদের কথাসাহিত্যে। বাঙালির চিরকালীন মিত্র ও সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজেও তা বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়ে আসেনি। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য অনেক জায়গায় এড়িয়ে গেছেন অতি সতর্কতায়। তিনি 'চোখের বালি' লিখেছেন। তবে বাঙালির চোখের পর্দাহীনতা নিয়ে লেখেননি। তিনি এর অনন্য চিত্রনাট্য রচনা করতে পারতেন।
আরেক আলোচিত বাঙালি নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের বইয়ের নাম 'তর্কপ্রিয় বাঙালি'। তর্ক বা বিতর্ক বিষয়টি হলো জ্ঞানের আধার; সংবেদনশীলতার উত্তম নিদর্শন। সহিষুষ্ণ সমাজের বিদ্যমান সংস্কৃতির ছায়াস্বরূপ। দুনিয়া এখন তর্কে বহুদূর নয় বরং হাতের নাগালের ভেতর। আমি বলি, অমর্ত্যের বইয়ের নাম হতে পারত 'চেয়ারপ্রিয় বাঙালি'। যাঁরা ভালোবাসেন চেয়ার বানাতে; চেয়ারে বসতে নয়। অবশ্য চেয়ারে বসার যোগ্যতা ও সাধনা তাঁদের নেই। অন্যের চেয়ারের সামনে বসে বসে সময় নষ্ট করতে এবং বিনা কারণে নিন্দাপাঠ আর অকারণে স্তুতির লহরি তুলতে। যাঁর সেসব গুণ ও যোগ্যতার লেশমাত্র নেই, তাঁর পক্ষাবলম্বনে শপথসমেত বাগাড়ম্বর করেই আনন্দ পান তাঁরা। যেই না সহসা কারও চেয়ারচ্যুতি ঘটে, অমনি তাঁরা অন্য ঘাটে নৌকা ভেড়ান। তাঁরা দিব্যি ভুলে যান নিকট অতীতকে।
এখানে একজন উচ্চপদস্থ, শিক্ষিত, ব্যক্তিত্ববান, সৎ, সাহসী মানুষও অবসরে জীবন্মৃত অর্থাৎ জীবিত থাকিয়াও মৃত। তাঁর কর্মহীন জীবন ক্রমেই হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। অথচ দীর্ঘ আয়ুস্কালের বদৌলতে এ মানুষটি পুরো কর্মকালের প্রায় সমান সময় অবধি রাষ্ট্র ও তাঁর সমাজকে বিপুল অভিজ্ঞতার নির্যাস ঢেলে দিতে পারতেন। তাঁর গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে যেমন ৭২ বছর হয়েছে, তেমনি বেড়েছে তাঁর মানসিক বল ও আত্মবিশ্বাস, যা পূর্বে ষাটোর্ধ্ব মানুষের মধ্যে এত প্রবলভাবে দেখা যায়নি। তাঁরা স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্য, কমিউনিটি ক্লিনিক, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারিভাবেই সংশ্নিষ্ট থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য কিছু করে যেতে পারতেন; আর তা হতে পারত নামমাত্র সম্মাননার বিপরীতে ও বিনিময়ে। এতে বাধা-বিপত্তির কোনো হেতু থাকতে পারে না।

এটা কোনো গল্প নয়। একেবারেই নয়। অবসরের অব্যবহিত পরেই নাড়ির টানে গ্রামমুখী হলেন একজন সৎ, দেশপ্রেমিক পদস্থ কর্মকর্তা। স্কুলজীবনের সহপাঠী বন্ধুবান্ধবের সাহচর্যকে আলিঙ্গন করে শেষ দিনগুলো গ্রামেই কাটিয়ে দেওয়ার সুপ্ত বাসনা তাঁর। প্রথম থেকেই সহধর্মিণী এবং সন্তানদ্বয় এর ঘোর বিরোধী। কিন্তু তাঁর যুক্তি হলো, পৈতৃক ভিটা ও সম্পত্তি যা-ই আছে এর হেফাজত করতে হবে। পিতামাতার কবরে যাওয়া সন্তানের জন্য ফরজ কাজ। তখনই ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টার পথের নিয়মিত যাত্রী হলেন তিনি। কিছুদিন পর তাঁর হাতে অবসরজনিত সব আর্থিক সুবিধা চলে আসে। তিনি যেন হঠাৎ কোটিপতি বনে যান। তাঁকে পায় কে! এদিকে ঢাকায় একটি ছোট্ট আবাসস্থলের মূল্য পরিশোধ করা তাঁর জন্য অতি জরুরি হয়ে ওঠে। তথাপি প্রাপ্ত অর্থের বিরাট একটা অংশ ছোটবেলার বন্ধুদের মধুর ব্যবহারে বিমুগ্ধ হয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। পরিবারের সদস্যদের বাধা এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়। আমার টাকা আমি কাজে লাগাব, তাতে তোমাদের কী? ব্যক্তিত্ববান মানুষ; দৃঢ়তা নিয়ে কথা বলেন তিনি। ব্যবসা কিছুদিন বেশ আশাজাগানিয়া ছিল, প্রথম প্রথম যেমন থাকে। মাস যায়; যায় বছরও। ব্যবসা আর ভালো চলছে না, নিকটাত্মীয়রা প্রচণ্ড সংক্ষুব্ধ; চারদিক থেকে তেড়ে আসছে নানা অসহযোগিতা। যাতায়াতের নিরাপত্তাই এখন হুমকির মুখে। স্থানীয় নেতাদের কাছেও বিষয়টা প্রীতিকর বলে মনে হচ্ছে না। ও, এবার তবে গ্রামে এসে বাণিজ্য! তাঁর ঘন ঘন বাড়িতে আসার কারণ কী! তা ছাড়া একসঙ্গে ব্যবসাপাতি করলে লাভ-লোকসানের দায় সবারই নিতে হবে। গ্রামে এমন রায় হয়ে গেল তাঁর লালিত জীবন দর্শনের সম্পূর্ণ বিপক্ষে। চাকরির প্রথম জীবনের অনেক আইন জানা তুখোড় ম্যাজিস্ট্রেট, ফৌজদারির বিধিবিধান এবং দণ্ডবিধি নখদর্পণে থাকা মানুষটি অসহায় দিজ্ঞ্বিদিক শূন্য হয়ে সেদিন ফিরে আসেন ঢাকার অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা অ্যাপার্টমেন্টে।
এবার জীবনের নতুন ইনিংস শুরু হলো তাঁর। আমাদের টাকাগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে- স্ত্রী-সন্তানের সাফ দাবি। টাকার অংশীদার আমরাও, তুমি একা নও। বাকরুদ্ধ তিনি। এখন বেশিরভাগ সময় মৌনতায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন। বয়সটা যেন হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে সময়ের আগে। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় বিদীর্ণ হচ্ছে তাঁর হৃদয়। এদিকে দিন দিন পরিবারের সদস্যদের কাছে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মানুষে পরিণত হচ্ছিলেন তিনি। একদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়ে যান খুব সন্তর্পণে এবং বিনাবাক্যে। ভালো জামাকাপড় পরেছেন তিনি। যেমনভাবে নিত্যদিন অফিসে যেতেন। তবে কেউ এগিয়ে এসে জানতে চাননি তিনি কোথায় যাচ্ছেন। তিন-চার দিন পর পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হলো- হোটেল কক্ষে আত্মহত্যা করেছেন একজন সাবেক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। পরিবারের সদস্যরা বরাবরের মতো নিরুদ্বেগ ও নির্লিপ্ত। তাঁদের চোখে-মুখে উৎকণ্ঠার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। উপরন্তু বলে বেড়াচ্ছেন, লোকটা ইদানীং অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। খানিকটা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। কাজেই তাঁর মৃত্যুর জন্য আমরা কাউকে সন্দেহ করি না।
হোসেন আবদুল মান্নান: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
- বিষয় :
- জীবনযাত্রা
- হোসেন আবদুল মান্নান