দক্ষিণ এশিয়া
বিজেপির হিন্দুত্ববাদ ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা
মাহবুব উল্লাহ
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০
সাহিত্যিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন- 'ধর্ম সাধারণ মানুষের কালচার, কালচার সাধারণ মানুষের ধর্ম।' মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এ মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে, আচার-আচরণের সঙ্গে সর্বাত্মকভাবে জড়িয়ে আছে। ধর্মে মানুষের বিশ্বাস ঠুনকো কোনো বিষয় নয়। অনেক সময় ব্যক্তি মানুষ ধর্মের কারণে জীবন দিতে পারেন।
ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী ও অজ্ঞেয়বাদী। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী। এ কারণে ধর্মানুভূতিতে আঘাত করলে চরম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মকেন্দ্রিক সংঘাত বিশাল জায়গা নিয়ে আছে। ইউরোপে দীর্ঘকাল ধরে ধর্মযুদ্ধ হয়েছে। ক্রুসেডে খ্রিষ্টান ও মুসলমান বহু বছর ধরে পরস্পর প্রাণ সংহার করেছে। ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় হিসেবে দেখা ইহজাগতিকতাবাদের উৎপত্তি হয়েছিল ইউরোপে। ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের মধ্যে দীর্ঘকাল চলতে থাকা সংঘাত থেকে জনজীবন রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ম করা হলো- চার্চ ও রাষ্ট্র পৃথক থাকবে। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে চার্চকে এড়িয়ে চলতে হবে। এ সত্ত্বেও চার্চের প্রভাবহীন রাষ্ট্র এখনও পাশ্চাত্যে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এ কারণে দেখা যায় ব্রিটেনের রাজা বা রানী 'চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান'। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে বাইবেলে হাত রেখে শপথ নিতে হয়। সে দেশের মুদ্রায় লেখা থাকে- 'ইন গড উই ট্রাস্ট'। রোমান ক্যাথলিক চার্চ নিঃসন্দেহে অতীত দিনের মতো পরাক্রমশালী নন। তা সত্ত্বেও ভ্যাটিকান ও পোপের মর্যাদা বলে দেয়, পোপ খ্রিষ্টজগৎ ও বিশ্বপরিসরে প্রভাবশালী। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পোপ এখনও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পোপের কিউবা সফর কিউবাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যথেষ্ট পরিবর্তন এনেছে।
এদিকে ভারতে বিজেপি সরকার রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পরিসরে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। হিন্দুত্ববাদ বিজেপির রাষ্ট্রীয় দর্শন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের ঘোষণা বিজেপি সরকার দেয়নি। ১৯৫০-এ ভারতের সংবিধান প্রণয়নকালে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ রাষ্ট্রদর্শনের অংশ ছিল না। পরবর্তী সময়ে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তাহলে কি কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ধ্বজাধারী এবং বিজেপি হিন্দুত্ববাদের লালনকারী? বিষয়টি এ রকম সাদা বা কালো নয়। রাজীব গান্ধী তাঁর এক নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেছিলেন অযোধ্যা থেকে। ঘোষণা দিয়েছিলেন- ভারতকে 'রামরাজ্য' করা হবে। অযোধ্যা থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু প্রতীকী দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানেই বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করা হয়েছিল রামমন্দির
প্রতিষ্ঠার জন্য।
বিজেপির শাসনামলে অবশ্য ভারতের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মুসলমানরা খুব বিপদে আছে। তারা ধর্ম অনুমোদিত কর্মকাণ্ডের চর্চা করতে পারছে না। গোমাংস ভক্ষণের কল্পিত অভিযোগে অনেককে প্রাণ হারাতে অথবা হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। বিজেপি হিন্দুত্ববাদী দর্শনের উপকরণগুলো পাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ-আরএসএস থেকে। আরএসএস ভারতে বহু কালজুড়ে সক্রিয়। তাদের ঘৃণ্যবাদী প্রচারণা হিন্দু ও মুসলমানকে পৃথক প্রকোষ্ঠে ঠেলে দিয়েছে। ঘৃণা-বিদ্বেষ স্ম্ফুলিঙ্গ হয়ে ভবিষ্যতে কোনো এক খারাপ সময়ে ভারতীয় মুসলমানরা হলোকস্টেরও শিকার হতে পারে- এমন আশঙ্কা অনেকের। সম্প্রতি বিজেপির এক নেতা আসামে গিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন- নেহরুর কারণেই ভারত বিভক্ত হয়েছিল। এখন 'হারানো' ভূখণ্ডগুলো ভারতে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ধরনের মৌখিক উচ্চারণ সাময়িকভাবে তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করলেও এর সুদূরপ্রসারী ফল অত্যন্ত ভয়াবহ।
চলতি বছরের মে মাসের শেষদিকে এক টিভি বিতর্কে বিজেপির মুখপাত্র নূপুর শর্মার একটি ধর্মীয় অবমাননাকর মন্তব্য ভারতীয় মুসলমানদের পাশাপাশি বেশ কিছু মুসলিমপ্রধান দেশের সরকার ও জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের মুসলমানদেরও ক্ষুব্ধ করেছে। এসব ক্ষোভের জের ধরে বিজেপি নূপুর শর্মাকে দল থেকে সাময়িক বহিস্কার করে। একই সঙ্গে দিল্লি মিডিয়া ইউনিটের প্রধান নবীন কুমার জিন্দালকেও টুইটে আপত্তিকর মন্তব্যের স্ট্ক্রিনশট শেয়ার করার জন্য দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। বিজেপি বলেছে, তারা কোনো সম্প্রদায় বা ধর্মকে অবমাননা বা অবজ্ঞা করে- এমন মতাদর্শের বিরুদ্ধে। ক্ষুব্ধ ইসলামী দেশগুলোকে শান্ত করার প্রয়াসে ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ওই মন্তব্য ভারত সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না এবং সেগুলো দলের 'প্রান্তিক পাত্রপাত্রীদের মতামত'।
নূপুর শর্মা আসলে কোনো প্রান্তিক চরিত্র নন। পদচ্যুতির আগ পর্যন্ত ৩৭ বছর বয়সী এ আইনজীবী মোদি সরকার ও দলের সমর্থনে রাতের পর রাত টিভি টকশোতে হাজির হয়েছেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্রী নূপুর শর্মা ২০০৮ সালে রাজনৈতিক জীবন শুরু করে সে বছরই আরএসএস ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এভিবিপি) প্রার্থী হিসেবে ছাত্র সংসদে সভাপতি নির্বাচিত হন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা আইনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে দেশে ফেরার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উত্তরোত্তর ব্যাপক ও গভীরতর হতে থাকে।
নূপুর শর্মা একজন বেপরোয়া নারী। ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় দখল থাকার ফলে তিনি অনেক দর্শক-শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁকে ২০১৩ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির মিডিয়া কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়। দুই বছর পর এই রাজ্যে নতুন নির্বাচন হলে তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন। নূপুর জিতবেন- এমনটা কেউ আশা করেননি। কিন্তু তাঁর উদ্যমী প্রচারণা তাঁকে বিজেপির রাজনীতির পাদপ্রদীপের নিচে নিয়ে আসে। তাঁকে দিল্লিতে দলের দাপ্তরিক মুখপাত্র নিযুক্ত করা হয়। ২০২০ সালে তিনি হন বিজেপির 'জাতীয় মুখপাত্র'। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নূপুর শর্মা ভারতীয় দর্শকদের কাছে একটি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। বেশিরভাগ সন্ধ্যায় তিনি টিভির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ভিন্নমত পোষণকারীদের নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি, গালমন্দ করতেন। দল থেকে বহিস্কারের পর এক বিবৃতিতে নূপুর শর্মা লিখেছেন- তিনি 'নিঃশর্তভাবে' তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করেছেন। তার পরও তিনি হাল ছাড়েননি। দাবি করলেন, 'হিন্দু দেবতা শিবের প্রতি ক্রমাগত অপমান এবং অসম্মানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এমন সব কথা তিনি বলেছেন।'
নূপুর শর্মাকে কড়া ভর্ৎসনা করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন- তাঁর ওই একটি মন্তব্যের জেরে গোটা দেশ অশান্তিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় এসে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতেও বলেছিলেন আদালত। এটাও বলা হয়েছে, তাঁর একটা মন্তব্যের জেরে সারাদেশে মানুষের ভাবাবেগ আহত হয়েছে। রাজস্থানের উদয়পুরে যে হিন্দু দর্জিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, সে প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন আদালত। বিচারপতিরা বলেছেন, তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের কী ফল হতে পারে, সেটা ভাবেনইনি নূপুর শর্মা।
মুসলমানদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে নূপুর শর্মা যে কুৎসিত মন্তব্য করেছেন, সে জন্য তাঁর বিচার হওয়া উচিত। রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ঐক্য ও সংহতি কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব তা নিয়ে ভারতীয় নেতৃত্ব ও জনগণ অবশ্যই চিন্তাভাবনা করবে। বিশাল ভারতে কিছু বিষয়ে সহমত থাকলেও বিরোধী মতের পরিসরটি হেলাফেলা করার মতো নয়। রাষ্ট্র ভারতকে টিকে থাকতে হলে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও শিখদের হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া ধর্মবিশ্বাসকে কিছুতেই আঘাত করা যাবে না। ভারত যেসব বিপদকে নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে মনে করে, সেগুলোর চেয়েও অনেক বড় ধরনের ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে নূপুর শর্মার আপত্তিকর মন্তব্যের মতো বিষয়গুলো।
ড. মাহবুব উল্লাহ:অর্থনীতিবিদ; সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়