ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কূটনীতি

বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকার 'ওপেন সিক্রেট'

বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকার 'ওপেন সিক্রেট'
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২২ | ০৩:০৪

বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'ষড়যন্ত্র' একটি বহুল উচ্চারিত শব্দ। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল প্রায় সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র খুঁজে পায়। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন ধারণায় প্রশাসনসহ জনগণের একটি অংশ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ছে, একবার শীর্ষস্থানীয় একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দেশের সমৃদ্ধ উপজেলা কলাপাড়ায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনগুলো দীর্ঘ হয়ে থাকে এবং কোনো কোনোটা ২০-৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। এ ধরনের লাইনে এক জায়গায় সমস্যা হলে পুরো লাইনই বন্ধ করতে হয়। তিনি কথা শেষ করেছিলেন এই বলে- দেশের কোথাও কোথাও ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্র বা নাশকতার সম্পর্ক আছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।

ষড়যন্ত্র খোঁজার বিপদ হলো, যারা খোঁজে তারা বিষয়টিতে এতটাই মানসিকভাবে ডুবে থাকে যে, মোটামুটি সবকিছুতেই এটা খোঁজে। গত তিন দশক ধরে দেশের রাজনীতিকদের একাংশ নির্বাচনের আগে বিদেশি দূতাবাসগুলোতে ষড়যন্ত্র খুঁজে পেতে উদ্‌গ্রীব। তাঁরা সেই কথা বিভিন্নভাবে প্রকাশও করেন, যা আমরা সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানতে পারি।
জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩ হলেও বাংলাদেশের জন্য সব দেশ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। আবার সব দেশের কাছে বাংলাদেশও গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের বিচারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য এই আমেরিকাই আবার এককভাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ।

অতএব, বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী ভাবছে, সেটা স্বাভাবিকভাবেই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কী বলছেন কিংবা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ নিয়ে কী বলছেন, তার ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের চেষ্টা ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের মধ্যে সব সময় দেখা যায়। টেলিভিশনের টকশোগুলোও এসব আলোচনা লুফে নেয়।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চিন্তাভাবনা কী; কোন কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে কাজ করতে চায়; সে সবই 'ওপেন ডকুমেন্ট'। সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ 'ইন্টিগ্রেটেড কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজি বাংলাদেশ' লিখে সার্চ দিলে প্রথমেই একটি লিঙ্ক দেখাবে। ২৩ পৃষ্ঠার সেই ডকুমেন্টে যে পাঁচটি মূল লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে, তার বাইরে বাংলাদেশকে নিয়ে আমেরিকার অন্য কোনো ভাবনা নেই। কেউ যদি বাংলাদেশস্থ আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতা ও বিবৃতি দেখে কিংবা আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট কিংবা অন্য কোনো দপ্তরের বক্তব্য দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন, সবই এই ইন্টিগ্রেটেড কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজির অংশ। আমেরিকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির কাজ ও বক্তব্যও এই কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজির অংশ।

বাংলাদেশিরা বিশেষত রাজনীতিকদের যেহেতু বেশিরভাগ সময় কৌশলগত পরিকল্পনা থাকে না বা থাকলেও পরিকল্পনার জায়গায় পরিকল্পনা রেখে তাঁরা নিজেদের মতো কথা বলেন; সংগত কারণেই তাঁরা নিজেদের আয়নায় আমেরিকাকেও দেখেন। ফলে তাঁরা কখনও সন্দেহ থেকে, কখনও আন্দাজ থেকে কিংবা নিছক কিছু একটা বলতে হবে বলে আমেরিকা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন।

প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করা যেতে পারে, গত ৫ এপ্রিল আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টে সেক্রেটারি ব্লিংকেনের সঙ্গে এক সভায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, 'আমি সব সময় আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ আমি যখন গৃহহীন, বেকার ও রাষ্ট্রহীন ছিলাম, তখন যুক্তরাষ্ট্র আমাকে একটি বাড়ি ও চাকরি দিয়েছিল এবং এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ।' এমন বক্তব্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ মাত্র। কারণ এটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের অংশ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। অথচ ইন্টিগ্রেটেড কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজি থেকে দেখা যায়, আমেরিকা বাংলাদেশকে কখনোই নতজানু দেশ হিসেবে দেখতে চায় না, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল দেশ হিসেবে দেখতে চায়; যে দেশ নিজেদের নিরাপত্তায় আরও বেশি সক্ষম। এটি স্ট্র্যাটেজি পেপারের পাঁচটি মূল লক্ষ্যের ১ নম্বরে বলা হয়েছে।

কারও মনে হতে পারে, আমেরিকার এই চাওয়াটা বাংলাদেশের সব বন্ধুরাষ্ট্রের চাওয়ার মতোই। তবে অন্যদের সঙ্গে আমেরিকার পার্থক্য হলো- দেশটি যা চায় সেটি যাতে বাংলাদেশ অর্জন করতে পারে সে লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজও করে। যে কারণে দেখা যায়, গত মাসে ঢাকায় দুই দেশ যৌথভাবে ৪৬তম বার্ষিক ইন্দো-প্যাসিফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনারের আয়োজন করেছিল। এটি ছিল এ অঞ্চলের স্থল বাহিনীগুলোর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বৃহত্তম সম্মেলন।

দ্বিতীয় লক্ষ্যে বলা হয়েছে- আমেরিকা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চায়, যেখানে সুশাসন ও মানবাধিকার থাকবে। অন্যের মতের প্রতি সহিষুষ্ণতা থাকবে। এই লক্ষ্যের কথা শুনলেই বিরোধী দলগুলো মনে করে, আমেরিকা বোধ হয় তাদের পক্ষে কথা বলছে এবং এ ধরনের প্রচারে তৎপর হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি তাঁর দেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এভাবে- 'আমি একটি বিষয় অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র (কখনোই) সুনির্দিষ্টভাবে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না।'

গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য সুস্পষ্ট। দেশটির রাষ্ট্রদূত বলেছেন, আমেরিকা চায় 'আন্তর্জাতিক মানদণ্ড' অনুযায়ী একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান, যেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে নিজেদের সরকার নির্বাচন করতে পারবে। আমেরিকা আরও মনে করে, 'বিক্ষোভকারী, রাজনৈতিক দল, সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য আইনের শাসনকে সম্মান করা এবং সহিংসতা, হয়রানি এবং ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।'

স্ট্র্যাটেজি পেপারের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে প্রশংসার বিষয়টিও রয়েছে। যেমন ৩ নম্বর লক্ষ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে অভিঘাত-সহনশীল দেশ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার প্রচেষ্টার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন।

প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশকে নিয়ে আমেরিকার ইন্টিগ্রেটেড কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজির বাইরে কি কিছু আছে, যা এখানে বলা নেই? গোপন কিছু? এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বলবে- ঘোষিত লক্ষ্যগুলোই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সব দপ্তরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: লেখক, উন্নয়নকর্মী ও অনুবাদক

আরও পড়ুন

×