জাতীয় পার্টির চিড় যখন ফাটলে পরিণত
রাজনীতি
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:১০
আবারও ভাঙতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি? গত ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের ভরাডুবিকে কেন্দ্র করে জাপার মধ্যে চরম অস্থিরতা চলছে। সে অস্থিরতা কমানোর ‘দাওয়াই’ হিসেবে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের যেভাবে একের পর এক কো-চেয়ারম্যান, প্রেসিডিয়াম সদস্য পর্যায়ের নেতাকে অব্যাহতি দিয়ে চলেছেন এবং বহিষ্কৃত নেতারা গিয়ে রওশন শিবিরে ভিড়ছেন, তাতে এটা স্পষ্ট– দলটির আরেক দফা ভাঙন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
জাপায় অস্থিরতা অবশ্য শুরু হয়েছিল ৭ জানুয়ারির আগেই, যখন রওশনপন্থিদের দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত করা হয়; এমনকি রওশনপুত্র সাদ এরশাদের পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত এবং নিরাপদ বলে বিবেচিত রংপুর-৩ আসনটিও পাননি। সেখানে জি এম কাদের নিজে প্রার্থী হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে রওশনপন্থিরা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রওশন নিজে দেখা করে জাপাকে কোনো আসন না ছাড়ার অনুরোধ করেন।
জি এম কাদেরের জন্য এ পরিস্থিতি হয়তো শাপেবর হতো, যদি তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের মতো করে নির্বাচনটি করতেন। যে যাই বলুক, তাঁর পক্ষে কথিত ‘তৃণমূলের’ কথা শুনে নির্বাচন বর্জন সম্ভবপর ছিল না। কারণ তেমন পরিস্থিতিতে হয়তো তাঁকে আরও বাজে পরিণতি ভোগ করতে হতো। নিজেদের শক্তিতে নির্বাচন করলে তারা আসন হয়তো বর্তমানের চেয়ে কম পেতেন, তবে দলটির অন্যরকম একটা ভাবমূর্তি তৈরি হতো। কিন্তু সেটা না করে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বরং অনেকটা ২০১৪ সালের মতো প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হতে সরকারি দলের সঙ্গে দেনদরবারে লিপ্ত হন। এর ফলস্বরূপ সরকারি দলের কাছ থেকে ২৬টি আসনে ছাড় পেলেও জাপা জিতে আসে মাত্র ১১টিতে।
একসময় বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনসহ দেশের আরও কয়েক অঞ্চলে প্রভাবধারী দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দলটির জন্য নিঃসন্দেহে এ ফল চরম হতাশাজনক। তবে দলটির দুই প্রধান নেতা বড় লজ্জায় পড়ে যান, যখন দলেরই ভেতর থেকে অভিযোগ ওঠে– জাপা চেয়ারম্যান ও মহাসচিব সরকারের কাছ থেকে শুধু ‘বিপুল’ অঙ্কের নির্বাচনী খরচই নেননি; অন্য প্রার্থীদের না দিয়ে তা আত্মসাৎও করেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতি রওশনপন্থিদের চাঙ্গা করে তোলে। গত ২৮ জানুয়ারি নিজেকে জাপা চেয়ারম্যান ঘোষণা করে জি এম কাদের এবং মুজিবুল হক চুন্নুকে ‘অব্যাহতি’ দেন রওশন এরশাদ। একই সঙ্গে তিনি ৯ মার্চ দলের নতুন সম্মেলন অনুষ্ঠানেরও ঘোষণা দেন।
রওশনের এ ঘোষণাও সম্ভবত হালে পানি পেত না, যদি একটা সমন্বয়বাদী মানসিকতা নিয়ে জাপা চেয়ারম্যান ওই অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করতেন। কিন্তু সে পথে না হেঁটে তিনি ১৪ জানুয়ারি নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে দায়ী করে বক্তব্যদানকারীদের বহিষ্কার করতে থাকেন।
জাপা চেয়ারম্যান ও মহাসচিব যতই বলুন– রওশনের সম্মেলন আহ্বানকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না; তাদের কলমের এক খোঁচায় দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বহিষ্কারের ঘটনা রওশনের পালেই হাওয়া দিচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনি সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক করেছেন কাজী ফিরোজ রশীদকে, যেখানে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা কো-আহ্বায়ক, গোলাম সরোয়ার মিলন যুগ্ম আহ্বায়ক, শফিকুল ইসলাম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হিসেবে বাবলা এবং উত্তরের সভাপতি হিসেবে শফিকুলই মূলত জাপার সভা-সমাবেশে জমায়েত কর্মী সরবরাহ করতেন। এদের পথ ধরে জাপার আরও অনেক ‘বঞ্চিত’ নেতা যে রওশন শিবিরে ভিড়বেন না– তা বলা যায় না।
মনে রাখতে হবে, শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই উত্তরাধিকারের রাজনীতির শিকড় বেশ গভীরে। সেই সূত্র মেনে জাপার নিয়ন্ত্রণ দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আপন ভাইয়ের হাতে যাওয়া যেমন কোনো অস্বাভাবিক ছিল না, তেমনি এরশাদের স্ত্রী হিসেবে রওশনও এ উত্তরাধিকারের কম দাবিদার নন। সরকারের ছত্রছায়ায় হলেও দশম সংসদ নির্বাচনে রীতিমতো এরশাদকে ঘোল খাইয়ে রওশন যেভাবে ৩৪ এমপি বাগিয়ে নেন, তা ছিল ওই সময়ের রাজনীতির অন্যতম চমক। অবশ্য কিছুটা বয়স এবং কিছুটা পরিস্থিতির কারণে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে প্রায় কোণঠাসা ছিলেন তিনি। এখন হাওয়া কতটা তাঁর অনুকূলে আনতে পারবেন, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে।

সত্য, গত কয়েক বছর সংসদের ভেতরে-বাইরে সরকারবিরোধী গরম গরম কথা বলে জি এম কাদের দেশে-বিদেশে অন্যতম বিরোধী মুখ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় দলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ বেশ পোক্ত বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু স্ত্রীর মনোনয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে দেনদরবারের গুরুতর অভিযোগের পর জি এম কাদেরের ওই ভাবমূর্তিতে চিড় ধরেছে। রওশনের বিদ্রোহ সেই চিড়কে যতটা সম্ভব ফাটলে পরিণত করতে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, সামরিক শাসক এরশাদের নেতৃত্বে জন্ম নিলেও দীর্ঘ ৯ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে জনগণের একটা অংশের মধ্যে দলটির প্রতিষ্ঠাতার নীরব সমর্থন গড়ে উঠেছিল। প্রধানত তার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় পার্টি দেশের রাজনীতিতে মোটামুটি শক্ত একটা অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। একে অনেকটা দেশের দুই যুযুধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংঘর্ষিক রাজনীতির ফল বললেও ভুল হবে না। কিন্তু এটাও স্বীকার্য, দলের এ শক্তি বিকশিত করার বদলে নব্বই পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টির শক্তি ক্ষয় হয়েছে বিভক্তি ও বহিষ্কারের ফাঁদে পড়ে। এ কারণেই ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর ছয়বার ভেঙেছে জাপা।
এ কথা ঠিক, দলটির ওইসব ভগ্নাংশ ইতোমধ্যে ইতিহাসের অতল গর্ভে চলে গেছে। ৯ মার্চ সম্মেলনের মাধ্যমে রওশনের নেতৃত্বে আরেকটি জাতীয় পার্টির জন্ম হলে তারও জন্য এমন নিয়তি নিশ্চয় অপেক্ষা করছে। তবে এটা যে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশের জন্য আশাপ্রদ পরিণতি দেখা যাচ্ছে না।
এরশাদের নানা রাজনৈতিক খামখেয়ালি সত্ত্বেও দল কিছুটা হলেও অন্তত রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছিল মূলত এরশাদেরই কারণে। আগেই বলা হয়েছে, জনগণের একটা অংশে তাঁর বেশ ভক্ত গড়ে উঠেছিল। কিন্তু জি এম কাদের তো এরশাদ নন। উপরন্তু ভাইয়ের মতোই যখন তিনি দলকে খামখেয়ালির হাতিয়ার বানান তখন সেখানে ভাটার টান প্রবল হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। রওশনও যে এরশাদ ছাড়া ম্লান– ইতোমধ্যে তা প্রমাণ হয়েছে।
দেবর-ভাবির কোন্দলে আর যাই হোক, জাতীয় পার্টির ক্ষয় ছাড়া জয় নেই। আর নির্বাচনী রাজনীতিতে দুই প্রবল ধারার মাঝে তৃতীয় ধারা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কেবল ক্ষীণতরই হতে থাকে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল