আন্তর্জাতিক
তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটল কেন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেছেন, তাইওয়ান সরকার যদি দেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র তাতে সায় দেবে না। ব্রিটিশ দৈনিক দি ইনডিপেনডেন্টসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠককালে ব্লিংকেন এ কথা বলেন। শনিবার তিন দিনের সফরে ব্লিংকেন বেইজিং যান।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন চীন সরকার, যারা ১৯৪৯ সাল থেকে সেখানে ক্ষমতাসীন– বরাবর তাইওয়ানকে তাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ‘এক চীন’ নীতিতে বিশ্বাসী বলে দাবি করলেও এত স্পষ্ট করে এর আগে কখনোই তাইওয়ানের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেনি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটি। বরং চীনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল থেকে ১০০ মাইল দূরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপটি স্বাধীন দেশের মতো তৎপরতা চালাতে পারছে কার্যত মার্কিন সর্বাত্মক সহায়তার বদৌলতে। বর্তমানে তাইওয়ানের সমরাস্ত্র আমদানির প্রধান উৎস যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভবত এসব কারণেই ব্লিংকেনের ওই বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উল্লেখ্য, তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বে জাপান এবং দক্ষিণে ফিলিপাইন অবস্থিত। দুটি দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। মার্কিন সেনা ঘাঁটি আছে দুই দেশেই। তা ছাড়া দ্বীপরাষ্ট্রটির আশপাশে আরও কয়েকটি দ্বীপ আছে, যেগুলোতে মার্কিন প্রভাব একচেটিয়া। ফলে কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাইওয়ানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। আরেকটি বিষয় হলো, অন্তত সপ্তদশ শতক থেকে তাইওয়ান চীনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৮৯৫ সালে এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চীন দ্বীপটি জাপানের দখলে দিতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হওয়ায় চীন দ্বীপটি ফিরে পায়। কারণ মাও সে তুং-এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন কুওমিনটাং ঐক্যবদ্ধভাবে ওই দখলদারিত্বের অবসান ঘটায়। কিন্তু দুই দলের মধ্যকার গৃহযুদ্ধের কারণে ১৯৪৯ সালে দ্বীপটি আবার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। কুওমিনটাং মার্কিন তথা পশ্চিমা সমর্থন নিয়ে তাইওয়ানকে মূল চীন হিসেবে দাবি করে সেখানে শাসন চালায়।
এমনকি জাতিসংঘও ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত দেশটিকে মূল চীন হিসেবে গণ্য করে তার সদস্যপদ বহাল রাখে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে এক প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে একমাত্র চীন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে তাইওয়ান সংস্থাটির সদস্যপদ হারায়। তা সত্ত্বেও জাতিসংঘের ১৪টি সদস্য দেশ এখনও তাইওয়ানকে স্বাধীন দেশ বলে মনে করে। দেশগুলো যে মার্কিন প্রভাবপুষ্ট হয়েই এমন কাজ করছে– তা না বোঝার কারণ নেই।

ব্লিংকেন যে চীন সরকারের মন পাওয়ার জন্যই বেশ চাঁচাছোলা ভাষায় তাইওয়ানের স্বাধীন অস্তিত্বকে এক প্রকার অস্বীকার করলেন– সেটাও না বোঝার কিছু নেই। তবে প্রশ্ন হলো, চীনের মন পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতটা জরুরি হয়ে পড়ল কেন? গত শতকের শেষ দশকের সূচনায় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে প্রায় সবার ওপরেই ছড়ি ঘোরাচ্ছিল। শুধু তাই নয়; গত এপ্রিলে তো তাইওয়ান নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র চীনকে উপর্যুপরি হুমকি দিচ্ছিল; বিশেষত গত আগস্টে মার্কিন প্রতিনিধি সভার তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি চীন সরকারের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে তাইওয়ান সফর করার পর পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে মোড় নেয়। মনে হচ্ছিল, বাইডেন প্রশাসন যেন ইউক্রেনে রুশবিরোধী প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না; চীনের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধই যে কোনো সময় শুরু করতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শান্তিপ্রিয় সবাই প্রমাদ গুনলেন; এক ইউক্রেন যুদ্ধ যেভাবে বিশ্বকে টালমাটাল করে দিয়েছে, তার ওপর তাইওয়ানকেন্দ্রিক যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলবে– যেন এক রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর।
অন্যদিকে হেনরি কিসিঞ্জারের মতো লোকেরাও হিসাব করে দেখলেন, চীন-রাশিয়া দুটিকে একসঙ্গে মোকাবিলা করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। কিসিঞ্জার শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও জেরাল্ড ফোর্ড প্রশাসনেই প্রায় পুরো সত্তর দশক প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন না; পরবর্তী সময়েও মার্কিন কূটনীতি তাঁরই আঁকা ছকে এগিয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস। ফলে আজ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মার্কিন স্বার্থের সবচেয়ে বড় পাহারাদার বলে মনে করা হয় তাঁকে। কিন্তু তাঁর শততম জন্মদিনের কিছু আগে তিনি বাইডেন প্রশাসনকে যে কোনো উপায়ে চীনকে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাদা করার পরামর্শ দেওয়ার পরও গত এপ্রিলে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে প্রতিনিধি সভার স্পিকার ম্যাকার্থির সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে অবশ্য বিশ্বপরিসরে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথমত, দীর্ঘ যুদ্ধের পর রাশিয়া ইউক্রেনের বাখমুতে তাৎপর্যপূর্ণ জয় পায়, যা ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ভাবিয়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, চীনের নীরব কূটনীতির ফলস্বরূপ চিরবৈরী সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইসরায়েল ছাড়া সেখানকার সব দেশ চীনের প্রতি আস্থাশীল হয়ে এমন কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যার ফলে দীর্ঘদিনের খাসতালুক থেকে উৎখাত হওয়ার শঙ্কা জাগে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মনে। এ অবস্থায় অন্তত পরাশক্তির ভাবমূর্তি রক্ষার্থে চীনের সঙ্গে সমঝোতার কোনো বিকল্প থাকে না তাদের কাছে।
এরই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি বাইডেন প্রশাসন চীনের প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা শুরু করে। যদিও চীন সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার এ ধরনের বৈঠক করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করে। ব্লিংকেনের সদ্য সমাপ্ত সফরটি কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তা হয়নি, কারণ চীন অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই মার্কিন আকাশে গোয়েন্দা বেলুন ওড়ায়; যা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে গুলি করে নামাতে হয়। নিজের মুখ রক্ষার্থেই যুক্তরাষ্ট্র তখন সফরটি স্থগিত করে। আমরা কিন্তু এ মাসের গোড়াতেই আরেকটা ঘটনা দেখেছি, যেখানে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রস্তাব চীন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। সোমবার চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্লিংকেনের বৈঠকও কিন্তু পূর্বনির্ধারিত ছিল না। কারণ চীনা কর্তৃপক্ষ এ জন্য সময় দিতে রাজি হচ্ছিল না। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্লিংকেনকে শির সঙ্গে বৈঠকের কথা জানানো হয়, যা মাত্র ৩৫ মিনিট স্থায়ী হয়।
বাইডেন প্রশাসনের এত সাধ্য-সাধনার ফল ব্লিংকেনের চীন সফর যাতে নিষ্ফল প্রমাণিত না হয়, তার জন্যও ব্লিংকেনকে খোদ চীনা প্রেসিডেন্ট দরবারে জানাতে হয়েছে– যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে নয়। মনে রাখা দরকার, শির সঙ্গে বৈঠকের আগে ব্লিংকেন চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমানে সেই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানকার আলোচনা ব্লিংকেনের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। দি ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, ওয়াং স্পষ্ট করে ব্লিংকেনকে বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বাজে’ অবস্থায় আসার জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। তাকেই ঠিক করতে হবে– সে চীনের সঙ্গে ‘সংলাপ, না সংঘাত চায়; সহযোগিতা, না দ্বন্দ্ব চায়’।
তবে তাইওয়ানের স্বাধীনতা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পশ্চাদপসরণে এটা আবারও প্রমাণিত হলো– যুক্তরাষ্ট্র কারও জন্যই শতভাগ দিতে রাজি নয়; পরিস্থিতি অনুসারে তাইওয়ানের মতো অতিবিশ্বস্ত বন্ধুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে তার এক মুহূর্ত লাগে না। দেশটির কাছে একটা জিনিসই ধ্রুব– নিজের স্বার্থ।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল