সমাজ
উন্নয়নে সঠিক জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই
মো. আমিনুল হক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৩ | ০৫:৩২
স্বাধীনতার ৫২ বছরে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। শহরায়ন ও শিক্ষার হার বেড়েছে। কৃষি খাতের চেয়ে শিল্প ও সেবা খাতে মানুষের কর্মসংস্থান বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে তরুণের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৪১-এর মধ্যে উন্নত দেশ হতে গেলে এই বিশাল তরুণ প্রজন্মকে কর্মে নিয়োজিত করতে হবে। শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ যুক্ত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিদেশে শ্রমবাজার মিলিয়ে ১০-১১ লাখ তরুণ কর্মে নিয়োজিত হতে পারে প্রতি বছর। বাকি ৯-১০ লাখ তরুণ শিক্ষিত এবং অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত কিন্তু কর্মহীন। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মে যুক্ত করার বাস্তবসম্মত মহাপরিকল্পনা দরকার।
কোন খাতে কী সংখ্যক জনবল দরকার এবং তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা কী হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। চলমান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাম, শহর ও বিদেশে কী ধরনের সেবা খাতের সুযোগ তৈরি হবে তা নির্ধারণপূর্বক সে অনুযায়ী ডিগ্রি বা ট্রেনিং দেওয়া আবশ্যক। দেশে কী সংখ্যক ছাত্রছাত্রী স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হবে, তা নির্ধারণ করা খুবই জরুরি। মনে রাখতে হবে, দেশের একজন দিনমজুরের প্রতিদিনের মজুরি কমপক্ষে ৫০০ টাকা। সে অনুযায়ী ৩ দশমিক ৬ কোটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের ন্যূনতম মূল্যমান (৩.৬×৫০০=১৮০০) ১৮শ কোটি টাকা। ব্যবহার করতে না পারলে মূল্যবান সম্পদ (তরুণ প্রজন্ম) নষ্ট হবে। দেশের অতিরিক্ত কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে না পারলে জনমিতিক লভ্যাংশ তথা দেশের অর্থনৈতিক ও সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে।
লিঙ্গসমতা আনতে আমাদের নারী ও কন্যাশিশুদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। কেননা, দেশে এ মুহূর্তে প্রায় ২ দশমিক ৬৬ কোটি সক্ষম দম্পতি। প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ নারী অন্তঃসত্ত্বা হন। এর মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ করেন; প্রতি বছর ১০-১২ লাখ গর্ভপাত হয়ে থাকে। গড়ে প্রতি বছর ৩০-৩১ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। দেশে জনগোষ্ঠীর প্রায় ২২ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। প্রায় ৩৮ লাখ নারী প্রজনন সেবায় নিয়মিত নন বা সেবা গ্রহণ করেন না। যদি তাদের সেবা গ্রহণের আওতায় না আনা যায় তাহলে নারী ও কন্যাশিশুদের স্বাস্থ্য ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে।
দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে (পুরুষ ৭৬.৫৬ এবং নারী ৭২.৮২)। লিঙ্গানুপাত হ্রাস পেয়েছে (অর্থাৎ ১০০ নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ৯৮)। ২০১১ সালের তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে (১.২২)। নারী-পুরুষ উভয়েরই গড় আয়ু বেড়েছে। ১৯৮১ সালে পুরুষ ও নারীর আয়ুষ্কাল ছিল যথাক্রমে ৫৫ দশমিক ৩ ও ৫৪ দশমিক ৫ বছর। ৪০ বছরের ব্যবধানে ২০২১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ৭০ দশমিক ৬১ ও ৭৪ দশমিক ১৩ বছর হয়েছে। পুরুষের ক্ষেত্রে বার্ষিক গড় বৃদ্ধি ঘটেছে শূন্য দশমিক ৩৯ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক গড় বৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ বছর। এগুলো জেন্ডার সমতার সুস্পষ্ট অগ্রগতি হলেও আরও অনেক দূর যেতে হবে।
২০১১ থেকে ২০২১ সালে (মাত্র ১০ বছরে) পাবলিক সেক্টর থেকে সক্ষম দম্পতিদের (২.৬৬ কোটি) পরিবার পরিকল্পনা সেবা নেওয়ার প্রবণতা কমেছে প্রায় ২৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে ওই সময়ে প্রাইভেট সেক্টর থেকে পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। ২০১১ সালে ৪০ শতাংশ মানুষ প্রাইভেট সেক্টর থেকে সেবা গ্রহণ করত। ২০২১-এ এসে ৬০ শতাংশ দম্পতি (অর্থাৎ প্রায় ১.৬ কোটি দম্পতি) পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণ করে। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান দম্পতিদের উচ্চমূল্যের বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। সরকারকে মানসম্মত পণ্য কম মূল্যে দম্পতিদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে এবং প্রাইভেট সেক্টরের একচেটিয়া বাজার থেকে দম্পতিদের রক্ষা করতে হবে।
লিঙ্গসমতা আনতে দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রীদের জন্য বৃত্তি এবং চাকরিক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা চালু আছে। মেয়েরা এ সুবিধার জন্য চাকরিক্ষেত্রে অধিক প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে কঠিন প্রতিযোগিতার যুগে মেধার প্রাধান্য বিষয়েও চিন্তা করতে হবে। কেননা, বেসরকারি স্কুল-কলেজে এনটিআরসির মাধ্যমে ২০২০ সালে নিয়োগের সময় দেখা গেছে, যে কোনো বিষয়ে একজন ছেলে মেধাক্রমে ১৫০০তম অবস্থান নিয়ে চাকরি পাচ্ছে না। কিন্তু মেয়েরা ৭৫০০তম অবস্থান নিয়ে ওই চাকরি পেয়েছে। একইভাবে ২০২২ সালে প্রাথমিক বিদালয়ের শিক্ষক নিয়োগে দেখা গেছে, মেয়েরা ৮০ নম্বরের মধ্যে ৩৫ পেলেও কোটায় নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে মেধাবী পুরুষ প্রার্থীরা ৮০ নম্বরের মধ্যে ৬০-৬২ পেয়েও নিয়োগ পায়নি। ফলে ছেলেদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। লিঙ্গসমতা অর্জন করতে গিয়ে মেধা যেন উপেক্ষিত এবং যুবসমাজে হতাশার জন্ম না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
আজ ১১ জুলাই; ৩৪তম বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এ দিবসে দেশে একটা কার্যকর ও যুগোপযোগী জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক কর্মক্ষম মানুষকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তার পাশাপাশি মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী কর্মের সুযোগ দিতে হবে।
ড. মো. আমিনুল হক: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমাজ
- মো. আমিনুল হক