অন্যদৃষ্টি
তামাকপণ্য সেবনে মৃত্যুর দায়
আশরাফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৩ | ০৬:২১
সম্প্রতি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন সমন্বয়’ রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজন করেছিল ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন’ শক্তিশালীকরণ সংক্রান্ত এক নাগরিক সংলাপের। এ সংলাপে দেশের অনেক বিশিষ্ট নাগরিক তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন, তাতে মনে হয়েছে, জনহিতকর প্রচেষ্টাটি শুরু করতেই অনেক বিলম্ব করে ফেলেছি।
এই সংলাপে পৌরোহিত্য করা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও উন্নয়ন সমন্বয়ের সভাপতি অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান রাজনীতিবিদদের প্রতি জনকল্যাণের কথা বিবেচনায় নিয়ে জনস্বাস্থ্যবান্ধব নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এটি টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতির চমৎকার অনুষঙ্গ হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন প্রান্তিক-শ্রমজীবী মানুষ নির্বাচনী প্রচারণায় এসব স্বাস্থ্যহানিকর অপদ্রব্য ভোটদানের উৎকোচ হিসেবে লুফে নিচ্ছে। তামাকপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের এই নির্বাচনী মৌসুমগুলোতে রীতিমতো টার্গেট নিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিপণনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান তামাকপণ্য সেবনের যে ভয়াবহ তথ্য আমাদের সামনে হাজির করেছে; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক যারা হবেন, তাদের এই সচেতন অভিপ্রায় আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি।
রাজনীতির মাঠে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ভিন্নমতকে সহ্য না করার প্রবণতাকে দূরে ঠেলে আমাদের রাজনীতিবিদরা যদি তামাকের আগ্রাসন প্রতিরোধে একাট্টা হতে পারতেন, তবে সত্যিকার অর্থেই জনকল্যাণের প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রমাণিত হতো। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, তামাকজাত পণ্য সেবনের কারণে বিভিন্ন রোগে প্রতিদিন দেশে ৪৫০ জন মানুষ মারা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষভাবে তামাক সেবন করা মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৭৮ লাখ। তামাক সেবন না করেও এর পরোক্ষ শিকার হয় ততোধিক মানুষ। তবে আশার কথা, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত করার অভিপ্রায় জানিয়েছেন। জাতীয় সংসদে ১৫৫ জন সংসদ সদস্য ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন’ সংশোধনে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তামাকপণ্য ঘিরে দুষ্টচক্রের অচলায়তন ভাঙা যাচ্ছে না। বহু মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর খোঁড়া যুক্তি দিয়ে তামাক চাষ সম্প্রসারণ থামছে না। সমতলের পর পার্বত্য জনপদে তামাকের করাল গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে কৃষিজমি।
অর্থনীতিবিদদের অভিমত, যখন সরকার জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বড় দায়িত্ব গ্রহণ করবে, ঠিক তখনই সম্যকভাবে তামাকের ক্ষতির বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় আসবে। কেননা, শুধু তামাক সেবনের ফলে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসায় যখন রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে, তখনই এর আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাব। তামাক সংশোধন আইনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বাতিল, তামাকপণ্যের সিএসআর নিষিদ্ধ করা, সিঙ্গেল স্টিক সিগারেট বা বিড়ি বিক্রি বন্ধ, ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করার মতো বিধান যুক্ত করা হলেও তামাকের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষায় আরও অনেক পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। সর্বোপরি নতুন প্রজন্মকে যদি এ অপদ্রব্যের প্রভাব থেকে মুক্ত করা যায়, তাদের সচেতন করা যায়, তবেই হয়তো তামাকমুক্ত আগামীর বাংলাদেশকে আমরা কল্পনা করতে পারি।
আশরাফুল ইসলাম: সাংবাদিক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- আশরাফুল ইসলাম
- তামাকপণ্য