গ্রন্থ আলোচনা
রাজনৈতিক অর্থনীতির সরস পাঠ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রকাশনী: বাতিঘর প্রথম প্রকাশ: ২০২৫ মূল্য ৫০০ টাকা
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:১১
বাংলাদেশে রাজনীতিবিষয়ক আলোচনা তুমুল জনপ্রিয় হলেও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা কম জনপ্রিয় নয়। বিশেষত নব্বই দশকে নতুন করে গণতন্ত্রের সূচনায় এর অন্যতম হাতিয়ার সংবাদপত্রের রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটে। সেই সঙ্গে সংবাদপত্রে বিষয়-বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতি বা বাণিজ্যের খবরের পাশাপাশি এ বিষয়ে কলাম ও আলোচনা বলা যায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে থাকে। কখনও তা রাজনীতিকে ছাপিয়ে অর্থনীতিই বড় হয়ে দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই সমাজে এর প্রভাব হয় বহুবিধ। একদিকে অর্থনীতির বইয়ের খটোমটো ভাষা বাদ দিয়ে সংবাদপত্রে তা বেশ সাবলীল ভাষায় পরিবেশিত হতে থাকে; অন্যদিকে নানা জটিল অর্থনৈতিক তত্ত্বও রসের ভিয়েনে ডুবে সাধারণ পাঠক বা দর্শকের ঘরে পৌঁছে যায়। মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ ইত্যাদি হয়ে ওঠে সাধারণ আড্ডার বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতিকে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা যারা এ দেশে করে চলেছেন, তাদের অন্যতম বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব। বিভিন্ন সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁর কাছ থেকে বাড়তি যা পাওয়া যায় তা হলো অর্থনীতিসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে সরকারের নেওয়া নীতি ও কৌশল নিয়ে আলোচনা।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের এমনই কিছু নিবন্ধ নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থটি। ভূমিকায় লেখক বলেছেন, এর নিবন্ধগুলো ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালে ১৬ বছরের বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত। ফলে একদিকে যেমন যাপিত জীবনের সঙ্গে সশ্লিষ্ট অর্থনীতির প্রায় সব বিষয় এখানে আলোচিত; তেমনি মুদ্রাস্ফীতি, বয়কট, ব্যাংকিং জটিলতা, বিশ্বমন্দা, ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট ও সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয় প্রাঞ্জল ভাষায় পরিবেশিত হয়েছে। বিগত সরকার অনুসৃত নিছক প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনা যেমন গ্রন্থটিতে রয়েছে, তেমনি পেঁয়াজের দামের মতো আটপৌরে বিষয়ও বাদ যায়নি আলোচনা থেকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন তিনি।
লেখকের রসবোধ কেমন তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়।
বইটি শুরু হয়েছে যে নিবন্ধ দিয়ে তার শিরোনাম ‘বাংলাদেশে অনর্থনীতি চর্চা’; অর্থনীতি চর্চা নয়। একই সঙ্গে আমাদের আইনি কাঠামো, সামাজিক কাঠামো, প্রতিযোগিতা, জনসাধারণের পণ্য, ন্যায়বিচার, বাহ্যিকতা এবং স্থিতিশীলতার রূপরেখা সন্ধান করে এসবের দুর্বলতা চিহ্নিত করেন। অনর্থনীতি দেশে কীভাবে জেঁকে বসেছে, তাও তিনি তুলে ধরেছেন নিবন্ধে। তাঁর মতে, বিদেশি সংস্থার সঙ্গে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের প্রসঙ্গ এলেই গভর্নিং বা নিয়ন্ত্রণকারী আইন বেছে নেওয়া হয় বিদেশি আইনভান্ডার থেকে। এ জন্য দেশীয় আইন তৈরির কোনো তাগিদও দেখা যায় না। আবার সালিশের স্থান হিসেবেও বেছে নেওয়া হয় ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা অন্য কোনো দেশকে। আরেক জায়গায় (পৃ. ১৫) আয় ও সম্পদের পুনর্বণ্টন প্রশ্নে তিনি লিখেছেন, ধনীদের থেকে উচ্চহারে কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি, স্বল্পমূল্যে মৌলিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে আয় ও সম্পদের পুনর্বণ্টন করা সরকারের অন্যতম কাজ। কিন্তু অপ্রতুল কর আদায়ের কারণে কার্যকর নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসার ঘটছে না। ‘আবার যৎসামান্য কর্মসূচির সুফল দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না পথিমধ্যে বেহাত হওয়ার কারণে। ফলে আয়বৈষম্য বেড়েছে, জাতীয় আয়ের ১৬.৩ শতাংশ কুক্ষিগত হয়েছে ১ শতাংশ মানুষের হাতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বিনিয়োগ আরেকটি বড় অনর্থনীতি।’ (পৃ-১৫)
একাধিক নিবন্ধে এসেছে এ সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গ। বাজার সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে; ঢাকা ও কলকাতার বাজারদর পাশাপাশি রেখে আলোচনা করে দেখিয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন নীতিগত দুর্বলতাও আলোচনা করেছেন। বিগত সরকারের নীতনির্ধারকরা ‘মূল্যস্ফীতি আমদানি করা’ বলে যা বোঝাতে চেয়েছেন, তার বিরোধিতা করেছেন তিনি যৌক্তিকভাবে।
‘ডান হাত, বাঁ হাত এবং অজুহাত’ নামক নিবন্ধে বেশ মজার ছলে লেখক বিগত সময়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, এমনকি ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের আচরণ তুলে ধরেছেন। বাঁ হাতের কারবার সম্পর্কে আমরা ভালোই জানি– ঘুষ, দুর্নীতি, ফাঁকিবাজি ইত্যাদি অপকর্মের দৌরাত্ম্য এখানে প্রবল। বিপরীতে ডান হাত বরাবরই ভালো কাজে ব্যবহৃত হয় আমাদের যাপিত জীবনে। আর জবাবদিহিতা এড়াতে অজুহাত প্রদর্শনের শেষ নেই এখানে। লেখকের অনুসরণে বলা যেতে পারে ডান, বাম ও অজুহাত– এ তিন হাতের বদলে মূলত দুহাতেরই কারবার চলছে এ দেশে।
বাঁ হাত ও ডান হাত নিয়ে একটা বিভ্রান্তি কাজ করতে পারে এখানে। বিশেষত রাজনীতিতে যেহেতু বামপন্থা ও ডানপন্থার ব্যবহার আছে। তবে লেখক নিবন্ধে এ দুই হাতের ব্যবহার একেবারেই সমাজে প্রচলিত অর্থে ব্যবহার করেছেন, যা অশুভ ও শুভ নির্দেশ করে।
‘বিশ্বব্যাংক কি পথ হারিয়েছে’ নিবন্ধে এ লেখক চাকরিকালীন বিস্তৃত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নানা মন্তব্য করেছেন। লেখক মনে করেন না, বিশ্বব্যাংক কোনো কাজের প্রতিষ্ঠান নয়। তিনি বরং নানা উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, ঠিকঠাক যুক্তি-তর্ক ও দরকষাকষির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এ ঋণদাতা সংস্থাকে কাজে লাগাতে পারলে আখেরে বাংলাদেশের মতো দেশের লাভই হয়। বিশেষ করে ভ্যাট চালুর মাধ্যমে কর ব্যবস্থায় সংস্কার সাধনের কথা বলেছেন তিনি, যা হয় ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর। তখন ব্যাংক খাতসহ অর্থনীতির আরও অনেক খাতে ‘কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস’ নামে সংস্কার চলে। এর ফলে অর্থনীতি দারুণ গতি পায়; বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে; কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পায়। তবে তাঁর আক্ষেপ, চলমান শতকের দ্বিতীয় দশকে বিশ্বব্যাংক তার পথ হারিয়ে ফেলে। কারণ তখন থেকে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিতে উল্লিখিত সংস্কারের বদলে লেখকের ভাষায়, বিশ্বব্যাংক ‘ব্যস্ত থাকে তাদের ঋণের পরিমাণ বাড়াতে এবং এ খাতে সাফল্য আসে।’ অর্থাৎ উন্নয়ন সহযোগী না থেকে বিশ্বব্যাংক নিছক ঋণদান সংস্থায় পরিণত হয়। তাঁর মতে, এ কারণেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলো উন্নয়ন প্রশ্নেও বেপথু হয়ে পড়ে; ঋণের পর ঋণ নিয়ে জনগণের আর্থিক বোঝা ভারী করতে থাকে।
বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কিছুদিন আগেও দুই দেশে বেশ আলোচনা লক্ষ্য করা গেছে। ফাওজুল কবির খানও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, করোনার পরপর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ভারতের প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি সামাজিক নানা সূচকেও বাংলাদেশ তার বৃহৎ প্রতিবেশীকে পেছনে ফেলেছে। তবে শেষ হাসি হাসবে ভারত। এর কারণ হিসেবে তিনি সঠিকভাবেই ‘প্রাকৃতিক সম্পদ, কারিগরি জ্ঞান, সঞ্চয়ের হার, কর-জিডিপি অনুপাত এবং বিদেশি বিনিয়োগ’ ইত্যাদি খাতে ভারতের এগিয়ে থাকাকে চিহ্নিত করেছেন। আজকে তাঁর ওই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে প্রমাণিত।
লেখক একই সঙ্গে ভারতের উন্নয়নের পথে বাধা কী, সেটাও সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জাত-পাত, ধর্মীয় বৈষম্য ইত্যাদিকে ওই বাধার মধ্যে রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে একটা গল্পও তিনি বলেছেন, যদিও তা আসলে গল্প নয়, তাঁর জীবনের একটা ঘটনা। ১৯৯৩ সালে তিনি সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তখন ভারতে জোরেশোরে উদারীকরণ চলছিল। অর্থনীতিও বিপুল বেগে এগোচ্ছিল। লেখক জানিয়েছেন, সে সময় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের অর্থনীতি নিয়ে এক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, সেখানে বহু ধনী ব্যক্তি ও সমৃদ্ধ জনপদের উদ্ভব ঘটবে, তবে দেশব্যাপী সুষম উন্নয়ন ঘটবে না। বাস্তবে তা-ই ঘটেছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ভারতকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে; এখনও উন্নয়নশীল দেশের তকমা নিয়েই দেশটি আছে। ওই সেমিনারে ভারত সম্পর্কে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ভারতীয় এক বিশেষজ্ঞকে রুষ্ট করলেও ২০১৫ সালে তিনি লেখকের সঙ্গে সিঙ্গাপুরেই দেখা হওয়ার পর তা স্বীকার করেছিলেন। এ রকম বহু অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বিষয় বইটিতে আছে। যথাযথ উপলব্ধি ও অনুশীলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেগুলো থেকে লাভবান হতে পারে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- আলোচনা