ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার: অরুন্ধতী রায়

ককরোচ পার্টি ক্রোধ ও কৌতুকের দেয়াল ভেঙে দিয়েছে

ককরোচ পার্টি ক্রোধ ও কৌতুকের দেয়াল ভেঙে দিয়েছে
×

অরুন্ধতী রায়

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৫ | আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:২৪

গত ২৫ জুলাই শনিবার নরেন্দ্র মোদির সরকার থেকে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার এক দিন পর সোমবার লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকার নেয় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ক্রল’। দিল্লির যন্তর মন্তর, যেখানে ৩৬ দিন ধরে হাজার হাজার তরুণ অবস্থান করছিলেন, সেখানেই হাঁটতে হাঁটতে সাক্ষাৎকারটি নেন সাংবাদিক সুপ্রিয়া শর্মা। স্ক্রল ডটইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

স্ক্রল: আপনি গত সপ্তাহে একটি লেখায় বলেছিলেন, প্রথমে আপনি ককরোচ জনতা পার্টি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু পরে ধারণা বদলে যায়।

অরুন্ধতী রায়: হ্যাঁ, আমি সন্দিহান ছিলাম। কারণ আন্না হাজারের আন্দোলন কীভাবে ডানপন্থিরা দখল করেছিল, তা আমি দেখেছি। কিছু তরুণ সেভাবে প্রশিক্ষিতও হয়েছিল। এর পরও আমি দেখতে চেয়েছিলাম, আন্দোলনে কী হচ্ছে, কী স্লোগান দিচ্ছে, তাদের প্রতীক কী। তবে আমি আশ্বস্ত হয়েছিলাম যখন অভিজিৎ দীপকে বললেন, ‘আগার মেরা নাম খালিদ হোতা, ত ইয়ে সাব কারনে নাহি দেতে।’ অর্থাৎ যদি আমার নাম খালিদ হতো, তবে আমাকে এসব করতে দিত না। আমি মনে করলাম, সহজে বললেও এটি গভীর কথা। এখানে সরাসরি সেই ভয়ংকর হিন্দু জাতীয়তাবাদী কথাবার্তাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছিল, যা আমাদের চারপাশে ঘুরছে। তখনই আমি এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

স্ক্রল: আপনি বলেছেন, এই প্রজন্ম ব্যাপক হাস্যরসাত্মক। তারা মিডিয়া, সিনেমা, এমনকি পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে প্রচুর প্রোপাগান্ডা দেখেছে। তারপরও তারা কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে?

অরুন্ধতী রায়: আমার মনে হয়, এসব প্রোপাগান্ডা প্রথমত হালকা ধরনের। গড় বুদ্ধিমত্তার মানুষও তা বুঝতে পারে। অনেকে ভেবেছিল, তরুণরা পারবে না। কিন্তু তারা স্পষ্টতই পেরেছে। আরেকটি বিষয়, প্রোপাগান্ডার মেয়াদ থাকে। যখন দিল্লিতে মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তারা বলছে– ‘ফিরও, মোদিজিকে ভোট দেঙ্গে’ (তবুও মোদিকে ভোট দেব), কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। এমনকি মোদি-ভক্ত অভিভাবকরাও দেখছেন, তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এখানে আপনি এনইইটি প্রশ্ন ফাঁস বা অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু পাঁচ বছর চিকিৎসা বা প্রকৌশলে পড়াশোনা করেও চাকরি নেই।

স্ক্রল: যন্তর মন্তরে যারা গিয়েছেন, এটা অবিশ্বাস্য, তাদের কাছে আন্দোলনের প্রধান মোটিভেশন ক্রোধ ছিল না। ছিল হাস্যরস।

অরুন্ধতী রায়: আমি মনে করি না, ক্রোধ আর হাস্যরসের মধ্যে কোনো দেয়াল আছে। হাস্যরস আসলে রাজনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম নির্যাস। তাই অবশ্যই এটি ক্রোধ ছিল, কিন্তু তা হাসি আর গালাগালের মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছিল।

স্ক্রল: অনেক অপ্রকাশযোগ্য কথা ছিল।

অরুন্ধতী রায়: আমরা সবাই এতটাই হাসছিলাম, এর কারণে আমার গাল ব্যথা করছিল। আমি মনে করি, তারা সেই নীরব সত্যগুলো প্রকাশ্যে বলছিল। আমরা সবাই তা ভাবতাম, কিন্তু বলতে পারতাম না। একা বলা যায় না, কিন্তু  কেউ থামাতে পারে না। তবে আমি খুবই চিন্তিত। কারণ, শুনছি, পুলিশ এখন মুসলমানদের টার্গেট করছে। যেমন মুহাম্মদ জুনায়েদ, যিনি আন্দোলনে খাবার বিতরণ করছিলেন, তাঁর পরিবারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি তাঁকে বলতে দেখেছি, তাঁকে চোখ বেঁধে মারধর করা হয়েছে। তারা প্রান্তিক মানুষদের টার্গেট করছে। শুনছি, বিহারে ব্যাপক হারে ধরপাকড় চলছে।

স্ক্রল: তারা ভয়ংকর কাজ করেছে?

অরুন্ধতী রায়: তারা ভয়ংকর কাজ করেছে। যদি আন্দোলনটা প্রধানত মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান, দরিদ্র, আদিবাসী বা দলিতদের হতো, আরও ভয়ংকর হতো। সব সময় এক ধরনের দুঃখ ছিল যে, এই তরুণদের অভ্যুত্থানে সবচেয়ে তেজোদ্দীপ্তদের একজন পাঁচ বছর ধরে বিচার ছাড়াই জেলে আছে। উমর খালিদ, শরজিল ইমাম– আর বিরোধী দল পর্যন্ত মুসলমান শব্দটি বলতে পারে না, তারা সংখ্যালঘু বলে। বড় রাজনীতিবিদদের কিছুটা সততা পেলে ভালো হতো। তারা ভয় পায় নাম উচ্চারণ করতে। উমর খালিদকে মিডিয়া দানব বানিয়েছিল। জেলে যাওয়ার আগে তাঁর ওপর হত্যাচেষ্টা হয়েছিল। তিনি তখন ছেলে ছিলেন; এখন পুরুষ। আমরা উমর খালিদ ও শরজিল ইমামকে ভুলতে পারি না এবং সেই সত্য যে, সিএএ আন্দোলনে মুসলমানরা নিহত হয়েছিল এবং পরে তাদেরই হত্যার অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল।

আমি কখনও সেই চারজন মুসলিম ছেলের নাম ভুলতে পারি না, যাদের পুলিশ রাস্তায় লাথি মেরে জাতীয় সংগীত গাইতে বাধ্য করেছিল। তাদের একজন ফাইজান। পরে প্রাণ হারায়। তেমনি ভুলতে পারি না এহসান জাফরির হত্যাকাণ্ড এবং গুলবার্গ সোসাইটিতে যা ঘটেছিল, সেই ভয়ানক ঘটনা। মানুষ আমাকে বলে, আমি রাগান্বিত। হ্যাঁ, আমি প্রচণ্ড রাগান্বিত; আমি বহুদিন ধরে রাগান্বিত। কিন্তু আমি রাগের সঙ্গে হাসি, যেমন সেই ছাত্ররা আন্দোলনের সময় হাসছিল।

স্ক্রল: গত দশকে ডজনখানেক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কেবল নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কৌতুক করার জন্য।

অরুন্ধতী রায়: ঠিক তাই, সামান্য কৌতুক আর হঠাৎ শুধু কৌতুকই চলছে। আর সেটাই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।

আরও পড়ুন

×