প্রযুক্তি
সাইবার নিরাপত্তা মানে নাগরিক অধিকার ঝুঁকিতে ফেলা নয়
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন নিয়ে বিতর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে যখন কোনো কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা, ডিভাইস জব্দ ও তল্লাশির ক্ষমতা এবং অনলাইনের বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন তা নিছক সাইবার নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটা ভালো আইনে রাষ্ট্রকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ হবে, তার সীমা কী, নাগরিকের প্রতিকার কোথায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হলে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে–এসব প্রশ্নের উত্তরও আইনের মধ্যে থাকতে হয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বাড়বে, তার জবাবদিহির ব্যবস্থাও তত শক্ত হতে হবে।
যেমন বিদ্যমান সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর ধারা ৮ অনুসারে সরকার কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা পাবে। বিশেষ করে একটা কনটেন্টের কারণে যখন সহিংসতায় উস্কানি, সাইবার হামলায় সহায়তা কিংবা গুরুতর অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু এই ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি ও বিচারিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ব্যবস্থাটি বৈধ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানে ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ ধরনের ভাষা নিয়েও বিশেষভাবে ভাবা দরকার। রাষ্ট্রের সমালোচনা, সরকারের সমালোচনা, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি দাবি করা কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধ হতে পারে না। রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান; নাগরিক তার সমালোচনা করতে পারেন। তাই কোনো বক্তব্য রাষ্ট্রের জন্য ‘অবমাননাকর’ কিনা–তা নির্ধারণে অস্পষ্ট মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আইনগত বৈধতা, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা–এই নীতিগুলো কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে থাকা উচিত। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যেন বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে না থাকে। আদালতের অনুমোদন বা পর্যালোচনা শুধু আনুষ্ঠানিকতা হলে চলবে না; আদালতকে সিদ্ধান্তের কারণ ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করার বাস্তব সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে যে ব্যক্তির কনটেন্ট ব্লক করা হয়েছে, তাঁকে কারণ জানানো এবং কার্যকর প্রতিকারের সুযোগ দেওয়াও জরুরি।
প্রস্তাবিত ধারা ২৫-এ বর্ণিত অনলাইন যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, সেক্সটর্শন, রিভেঞ্জ পর্ন কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট এখন বাস্তব ও গুরুতর সমস্যা। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এ ধরনের অপরাধে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হতে পারেন। তবে একই ধারায় ‘মানহানি’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ কিংবা বিস্তৃত অর্থে ‘বুলিং’-এর মতো বিষয় যুক্ত করার ক্ষেত্রে ভাষা ও সংজ্ঞা খুব সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে। সমালোচনা আর কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে হয়রানি এক বিষয় নয়। সাংবাদিকের প্রশ্ন, গবেষকের সমালোচনা, সামাজিক বিতর্ক কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যকে যেন সহজেই ‘হেয়প্রতিপন্ন’ করার অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় পরিণত করা না যায়।
ইচ্ছাকৃততা, পুনরাবৃত্তি, ক্ষমতার অসমতা এবং গুরুতর ক্ষতির মতো বিষয় বিবেচনায় না থাকলে একটি তীব্র মতবিরোধ বা একবারের অপ্রীতিকর মন্তব্যও ‘বুলিং’ অপরাধ মনে হতে পারে। তাই মানুষের দৈনন্দিন ডিজিটাল আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নে এসব সংজ্ঞাও নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি সতর্কতার দাবি রাখে প্রস্তাবিত নতুন ধারা ২৬এ-‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’। প্রস্তাবিত বিধানে এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার কথা বলা হয়েছে। একজন মানুষ কোনো তথ্য যাচাই করতে না পেরে ভুলভাবে তা প্রকাশ করতে পারেন। একজন সাংবাদিক অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে পরে তা সংশোধন করতে পারেন। আবার কেউ জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য তৈরি করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি বা সহিংসতা ছড়াতে পারেন। এই তিনটি আচরণকে একই অপরাধের চোখে দেখা ন্যায়সংগত হবে না।
ভুল তথ্য মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ সবসময় ফৌজদারি শাস্তি নয়। তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সরকারি তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, দ্রুত সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা এবং নাগরিকের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় তথ্যের ঘাটতি অনেক সময় গুজবের জন্য উর্বর পরিবেশ তৈরি করে। তাই গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু শাস্তির মাধ্যমে নয়, সঠিক তথ্যের সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমেও করতে হবে।
এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য, তল্লাশি, ডিভাইস জব্দ ও তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজনের মোবাইল ফোন জব্দ করা মানে অনেক সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক যোগাযোগ, পেশাগত নথি, ছবি এবং অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও তদন্তের আওতায় চলে আসা। তাই ডিভাইস জব্দের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, নির্দিষ্ট কারণ, সময়সীমা এবং অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
তদন্তের প্রয়োজনে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে, কিন্তু ‘যা পাওয়া যায় সব সংগ্রহ’–এমন নীতি কোনো আধুনিক ডেটা সুরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কতটুকু তথ্য প্রয়োজন, কী উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে, কতদিন সংরক্ষণ করা হবে, কে তা ব্যবহার করতে পারবেন এবং প্রয়োজন শেষ হলে কখন তা মুছে ফেলতে হবে–এসব বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট সীমা থাকা উচিত।
নিরাপত্তা এবং অধিকারকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। প্রকৃত নিরাপত্তা তখনই টেকসই হয়, যখন নাগরিক জানেন–শুধু অপরাধ থেকে নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপপ্রয়োগ থেকেও তাঁর সুরক্ষা থাকবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি মুখ্য নয়, মানুষই মুখ্য। একটি সাইবার হামলা যেমন একজন মানুষের জীবন, সম্পদ বা মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অস্পষ্ট প্রয়োগও তাঁর স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
aafk76@yahoo.com
- বিষয় :
- আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
- সাইবার নিরাপত্তা