ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন খুলছে...

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন খুলছে...
×

আলমগীর শাহরিয়ার

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০২:৩৪ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০২:৩৪

অবশেষে দেড়বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে, এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক খবর। ইতিমধ্যে টানা বন্ধে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, তা পুষিয়ে নিতেও দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এটা সত্য যে, করোনা মহামারি সহসা যাচ্ছে না। এ সংকটকে বাস্তবতা মেনেই আমাদের চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের সব দাপ্তরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম প্রায় স্বাভাবিকভাবেই চলছে। গণপরিবহন, অফিস-আদালত-ব্যাংক, হাটবাজার-বিপণি-রেস্তোরাঁ, পর্যটনস্পট সবই খোলা। বলার অপেক্ষা রাখেনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকেই সরব হয়েছেন। কারণ এ দুর্যোগে অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার শিক্ষক বেকার হয়ে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে জীবনযাপন করছেন।

করোনা সংক্রমণ না কমলেও নতুন স্বাভাবিকে আমাদের অভ্যস্ত হতে হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ বিদ্যালয়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গবেষণা বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সংক্রমণ হয় সামান্যই। উপরন্তু, ইউনেস্কো করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের এক তথ্যচিত্রে বলছে, করোনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিল্ফেম্ন আছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ আমেরিকা, ইতালি, ইংল্যান্ডও একনাগাড়ে এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখেনি। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও না।

শিক্ষার্থীরা অনেকদিন প্রতিষ্ঠানবিমুখ হওয়ায় ইতিমধ্যে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম-গঞ্জে ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনক। শিশুদের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ব্যাহত হয়েছে, বলে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। অনেকে হতাশায় আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছে। বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার এখন স্বশরীরে শ্রেনী কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে করোনার সময়ও অনলাইন পাঠদান হয়। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী- দু'পক্ষের আর্থ-সামাজিক সক্ষমতা ও বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকেও অনলাইন কার্যক্রমের আওতায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। অনলাইনে পাঠদান ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা শহরের কিছু অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য সম্ভবপর হচ্ছে; কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এটি অবাস্তবপ্রায়।

শিক্ষকদেরও একটি বড় অংশ এখনও তথ্যপ্রযুক্তির সাবলীল ব্যবহারে অনভ্যস্ত। শিক্ষকদের পাশাপাশি প্রয়োজন অভিভাবকদের সহযোগিতা ও সচেতনতা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক-অভিভাবক দু'পক্ষই পিছিয়ে। ফলে ইতোমধ্যে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বহুগুণে। দীর্ঘদিন পর স্কুল খুলছে, এতদিন বন্ধ থাকায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২৫ ভাগ শিক্ষার্থী আর বিদ্যালয়েই ফিরবে না। করোনা দুর্যোগে একটি শিশুও যদি আর স্কুলে না ফিরে- এ দুঃখ আমরা রাখব কোথায়? একটি শিশুর স্কুলবিমুখ হওয়া মানে একটি পরিবার ও সমাজ অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়ার সমান।

উপকূল, চরাঞ্চল, হাওরাঞ্চল ও পাহাড়ে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায়। উপকূল ও চরাঞ্চলের কয়েকটি উপজেলায় সরকারের একটি শিক্ষা প্রকল্পে কাজ করার সময় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এসব এলাকায় শিক্ষার্থীরা শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারেই বন্ধ থাকায় আশঙ্কা করছি, এদের একটা বিরাট অংশ আর শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত নেই। অভাব-অনটনের পরিবারে অনেকে স্থানীয়ভাবে শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এদের স্কুলে ফেরানো কঠিন হবে।

শহরের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক তাদের শিক্ষিত-সচেতন অভিভাবকদের কল্যাণে পারিপার্শ্বিক সুবিধা ভোগ করে করোনাকালে স্কুল বন্ধের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারলেও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা চরম শিক্ষা প্রতিকূল। তারপরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন খোলা হচ্ছে আমরা মনেকরি শিক্ষা প্রশাসন বিষয়টি দেখবে। বলাবাহুল্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। তারই আলোকে খুলছে শিক্ষার দ্বার প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়ে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শ্রেনি আয়োজন সম্পন্ন করার কোনো বিকল্প নেই।


আরও পড়ুন

×