দিবস
ডায়াবেটিসে বহুমাত্রিক শারীরিক ক্ষতি
ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০
আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর এ দিবস পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সালে ১৪ নভেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন এবং তিনি বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে একত্রে ইনসুলিন আবিস্কার করেছিলেন।
ডায়াবেটিস এখন আর অপরিচিত কোনো রোগ নয়। একেবারে অতি পরিচিত। দিন দিন এর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি। অথচ একটু সচেতন হলেই এ রোগ হওয়া থেকে এবং ডায়াবেটিস হলেও এ রোগের জটিলতাকে সহজেই রুখে দেওয়া সম্ভব।
ডায়াবেটিস হলে শরীরের বিভিন্ন অংশে গ্লুকোজ ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। যার ফলে প্রস্রাবের সঙ্গে গ্লুকোজ বের হয়। ঘন ঘন পানির পিপাসা, বেশি বেশি প্রস্রাব হয় ও শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। অসংক্রামক রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। ডায়াবেটিস জটিলতার কারণে মানুষের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, স্নায়ুরোগ, গর্ভকালীন জটিলতা ও কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় শরীরের নিম্নাঙ্গ কেটেও ফেলতে হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিসের জটিলতায় অনেক মানুষ প্রতি বছর অকালমৃত্যুতে নিপতিত হচ্ছেন। এসব ছাড়াও ডায়াবেটিসের কারণে চোখের ওপর অনেক প্রভাব পড়তে পারে।
চোখের ওপর ডায়াবেটিসের প্রভাব ও চোখের বিভিন্ন পরিবর্তন কতদিন যাবৎ ডায়াবেটিস আছে, তার ওপর নির্ভর করে। অপর্যাপ্ত ডায়াবেটিস কন্ট্রোলের কারণেও কখনও কখনও চোখের পরিবর্তন হয়। ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি চোখের অন্যতম প্রধান সমস্যা। দৃষ্টিশক্তির ওপরেও ডায়াবেটিসের প্রভাব আছে। চোখের লেন্সে পুষ্টিহীনতা ও রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে লেন্সের আকার বৃদ্ধি পায়। প্রতিসরণাঙ্ক বা রিফ্র্যাকটিভ ইনডেক্স পরিবর্তনের ফলে হ্রস্ব দৃষ্টি বা মাইয়োপিয়া হয় এবং কাছে দেখতে অসুবিধা হয়। ডায়াবেটিসের কারণে চোখে যেসব সমস্যা হয় তা হলো :
ডায়াবেটিসজনিত ছানি- এটা দুই ধরনের হয়। (১) বয়স্ক এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ছানি তাড়াতাড়ি হয়। (২) জুভেনাইল ডায়াবেটিস রোগীদের ছানি অল্প বয়সেই হয়। কনজাংটিভার পরিবর্তন- শিরাগুলো প্রসারিত এবং শিরার শেষভাগের ক্যাপিলারিগুলো লম্বা হয়। ধমনি শিরার আনুপাতিক হার ১ :৭ হয়।
আইরিশের পরিবর্তন- এখানে পানি জমে ও আইরিশ ফুলে যায় এবং পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম নষ্ট হয়। আইরিশের প্রদাহ হয়, নতুন রক্তনালি তৈরি হয় এবং চোখের ভেতর রক্ত জমে ও নিওভাসকুুুলার গ্লুকোমা হয়। ভিট্রিয়াস ও রেটিনাতে রক্তক্ষরণ হয় ও নতুন রক্তনালি তৈরি হয়।
স্নায়ুবৈকল্য, ট্যারা চোখ ও দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি হয়। ডায়াবেটিক রোগীদের গ্লুকোমা থাকতে পারে। এক বস্তুকে দুটি দেখে।
ডায়াবেটিস রোগী অনেকেরই ধারণা, তাদের চোখের চিকিৎসা শুধু ডায়াবেটিস হাসপাতালেই সম্ভব। এই ভেবে তারা সবাই ডায়াবেটিস হাসপাতালে ভিড় জমান এবং নানা বিড়ম্বনার শিকার হন। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়াবেটিস রোগীদের ছানিসহ সব রোগের চিকিৎসা সফলভাবে নির্বিঘ্নে করা হয়। উল্লিখিত হাসপাতালগুলোতে ডায়াবেটিসসহ চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। তারা ডায়াবেটিস রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা করে থাকেন।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জরুরি হলো- শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়মিত মাপা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা, চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ পরিবর্তন বা সেবন বন্ধ না করা। এটি শর্করা জাতীয় খাদ্যের বিপাক প্রক্রিয়াজাত জটিলতাজনিত রোগ। ইনসুলিন একটি অগ্ন্যাশয় নিঃসৃত হরমোনের অভাবজনিত কারণে ডায়াবেটিস রোগ হয় এবং অনেক সময় ইনসুলিনের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রোথ হরমোন বেশি থাকলে ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এদেশের ৯০ শতাংশ রোগী ২ টাইপের- কিডনিতে নেফ্রপ্যাথি ও চোখে রেটিনোপ্যাথি হয়। ডায়াবেটিস হলে চোখে আর যেসব সমস্যা হতে পারে তা হলো চোখের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ, চোখের পাতায় গোটা ওঠা, আইরিশে নতুন রক্তনালি হওয়া, চোখের ঘন ঘন চশমা পরিবর্তন, ছানি পড়া, ঘোলা বা কম দেখা, চোখের ম্যাকুলায় পানি জমা, ব্লাড সুগার কমলে হাইপারমেট্রোপিয়া ও ব্লাড সুগার বাড়লে মায়োপিয়া বা দূরে দেখতে অসুবিধা হয়। চোখের মাংসপেশিগুলো অবশ হতে পারে, যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা না হয়।
এগুলো ছাড়াও রাতকানা, চোখ ওঠা, কর্নিয়ায় অবশ ভাব হওয়া ও ঘা হওয়া স্কেলরার প্রদাহ ও রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়াও ডায়াবেটিসের সঙ্গে চোখের সম্পৃক্ততা ও মারাত্মক ক্ষতিকর দিক, যাতে যে কেউ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা করালে অন্ধত্ব থেকে বাঁচা সম্ভব।
উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- দিবস
- ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ