ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার :মফিদুল হক

মানুষের যুক্ততাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মূল শক্তি

মানুষের যুক্ততাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মূল শক্তি
×

সাক্ষাৎকার গ্রহণ :তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

সমকাল :মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সূচনা আপনাদের হাত ধরেই। এটি প্রতিষ্ঠার চিন্তা কীভাবে এলো?
মফিদুল হক :তখন মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পেরিয়ে যাচ্ছিল। আমরা সমমনা কয়েকজন প্রায়ই আলোচনা করতাম- স্বাধীনতার অনেক বছর পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হচ্ছে না। যদি শুধু সরকারিভাবে এটা করার কথা বলতে থাকি, তাহলে আরও হয়তো ৫০ বছর লেগে যাবে। এর মধ্যে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে, অনেকেই চলে যাচ্ছে। অনেক স্মারক, স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা বহমান রাখার বিষয়ে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি। তখন নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কথা ভাবি। সে চিন্তা থেকেই ১৯৯৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। ট্রাস্টের মাধ্যমে অনেক রকম পরিকল্পনা গৃহীত হয়। তখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টাও স্থির হয়।
সমকাল :মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সময়কার চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
মফিদুল হক :আমরা আটজন ট্রাস্টি ছিলাম। আমাদের মনে হলো, এই আটজন মিলে জাদুঘর করতে পারব না যদি দেশের মানুষের, সমাজের একটা বড় রকম সহায়তা না পাই। আমাদের একটা চিন্তা ছিল জাদুঘরে যা থাকবে তা দৃশ্যমান করে মানুষের কাছে উপস্থাপন করার। যে যেভাবে পারেন আমাদের স্মারক দান করবেন, আমরা সংগ্রহ করব। জাদুঘরে সেটা দেখানো হবে। দৃশ্যমান করার জন্য আমরা বাড়ি ভাড়া নিলাম সেগুনবাগিচায়। তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বিকৃতি, বিভ্রান্তি হচ্ছিল। আমরা ঠিক করলাম তথ্যমূলকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপন করার।
সমকাল :স্মারক সংগ্রহের কাজ কীভাবে শুরু করলেন?
মফিদুল হক :তখন সংবাদমাধ্যম আমাদের কাজে এগিয়ে আসে। জাদুঘরের কথা নানাভাবে উঠে আসে। আমরা স্মারকের আবেদন নিয়ে বিভাগীয় শহরগুলোতে গেলাম। সেখানেও একটা সাড়া পড়ল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হবে- এ কথা জানাজানি হলো। যখন কেউ স্মারকগুলো নিয়ে এলেন, তখন হয়তো সুফিয়া কামাল না হয় কোনো শহীদজায়া কিংবা সেক্টর কমান্ডার সেসব গ্রহণ করলেন। জাদুঘরটায় সবাই যেন মালিকানা অনুভব করে এবং বাস্তবে যেন তা প্রতিফলিত হয়, সেই চিন্তা থেকেই সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা হলো। এটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ হলেও তা যেন সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়, সে চেষ্টাই ছিল আমাদের।
সমকাল :কী ধরনের জিনিস সংগ্রহ শুরু করলেন?
মফিদুল হক :স্বাধীনতা যুদ্ধ তো শুধু ৯ মাসের না। তার আগেরও ইতিহাস আছে। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস আছে। বাঙালির সভ্যতা ও সংস্কৃতিও অনেক পুরোনো। রাষ্ট্রটা নতুন, সভ্যতাটা প্রাচীন। ফলে আমরা সবটাই অল্পের মধ্যে দেখাতে চেয়েছিলাম স্মারক হিসেবে। আমরা কিছু মডেল পেয়েছিলাম। এর মধ্যে প্রাচীন বাঙালি সমাজের ঐতিহ্যের কিছু রূপায়ণ যেমন- বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুরের সভ্যতা, কান্দজী মন্দির, এ রকম কিছু প্রাচীন স্মারক আমরা পেয়েছি। ব্রিটিশ যুগ থেকেও আমরা কিছু স্মারক পেলাম। এ ছাড়া সুপরিচিত না কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দিয়েছেন, এ রকম অনেক স্মারক আসতে লাগল। জাদুঘরের দ্বার উন্মোচন হয়েছে ২২ মার্চ ১৯৯৬ সালে। আমরা কিন্তু ততদিনে জাদুঘরটা সাজিয়ে ফেলতে পেরেছি। আমাদের কোনো কিছুতে ঘাটতি হয়নি।
সমকাল :তখনই আপনারা সাড়া ফেলতে সক্ষম হন?
মফিদুল হক :হ্যাঁ। এমনকি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন। জাদুঘর উদ্বোধনের আগে তিনি বঙ্গবন্ধুর ব্যবহূত সামগ্রী যেমন- তামাকের কৌটা, তার লেখা কারাগারের চিঠি আমাদের হাতে তুলে দিলেন। এভাবে অনেক রকম স্মারক আসা শুরু হলো। পেপার ডকুমেন্টস, পুরোনো দলিল, চিঠিপত্রসহ অনেক কিছু জমা হতে থাকল। এমনকি তখন এসব রাখাটাই আমাদের বড় সমস্যা হয়ে গেল। আমরা বুঝলাম, স্থায়ী জাদুঘর না হলে চলছে না।
সমকাল :স্থায়ী জাদুঘরের সে স্বপ্নও পূরণ হয়েছে ...।
মফিদুল হক :অবশ্যই। বলা যেতে পারে, স্বপ্নযাত্রাটা একটা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। জাদুঘরের নিজস্ব একটা ভবন তৈরি হয়েছে; এটা একটা বড় বিষয়। সব রকম সুবিধাই এখানে আছে। ফলে আমরা স্মারক সংরক্ষণ, স্মারক উপস্থাপন করতে পারছি। এই জাদুঘরের এখন অনেক শক্তি। এই শক্তিটা সমাজ ব্যবহার করবে- এটাই মূল ব্যাপার।
সমকাল :মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দুর্লভ অনেক কিছুই রয়েছে নিশ্চয়। বিশেষভাবে কোনটার কথা বলবেন?
মফিদুল হক :১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু স্নেহভাজন এক কিশোরীকে এক স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল- 'এ গ্রেট থিংকস আর চিপ থ্রো ডিভাইস'। একটা ছোট্ট কাগজে তিনি স্বাক্ষরটা দিয়েছিলেন। সেটা জাদুঘরকে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি নাসরিন আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী জীবনের কথাগুলো যেন ওই চিরকুটে তিনি নিজের হাতে লিখে গেছেন। পরিবারকে লেখা অনেক সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার চিঠি আছে এখানে। শহীদ আজাদকে যখন ধরতে আসে তখন পাকিস্তানি সৈন্যরা ওদের বাড়িতে গুলি করে। আজাদ তখন টমাস মানের 'ম্যাজিক মাউন্টেন' বইটা পড়ছিল। ওই বইয়ের মধ্যে বুলেটের চিহ্নটা থেকে যায়। সেটাও আছে এখানে।
সমকাল :জাদুঘরের কাজগুলো কীভাবে পরিচালিত হয়?
মফিদুল হক :আমাদের ট্রাস্টি বোর্ডের কিছু নীতিমালা আছে। কিছু কাজ আমরা দায়িত্ব নিয়ে ভাগ করে করি। আমাদের নিবেদিত একটা কর্মী বাহিনী আছে। এত বড় জাদুঘরের তুলনায় সংখ্যায় তারা খুব কম। এখানে অনেক ধরনের ইভেন্ট হয়। আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণহত্যার বিচারের দাবি অনেক রকমভাবে তুলে ধরা হয়। একটা বিশাল স্বেচ্ছাসেবী কর্মী দল থাকায় এ রকম অনেক আয়োজনই আমরা করতে পারি। তারা জাদুঘরের নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাদুঘরের কর্মী হয়ে যায়। এটা একটা বড় শক্তির জায়গা। এখানে সংগীত উৎসব হয়। ওই অঙ্গনে যুক্তরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে। সবাই স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে কাজ করে। আমরা হয়তো তাদের আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করি। চলচ্চিত্র উৎসব হয়। তখন ওই জগতের ছেলেমেয়েরাও যুক্ত হয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। জাদুঘর বলতে মানুষ একটা জড় বস্তু মনে করে। কিন্তু এই জাদুঘর একটা সজীব সংস্থা। মানুষের সঙ্গে যুক্ততাই এ সংস্থাকে শক্তিশালী করেছে।
সমকাল :মুক্তিযুদ্ধের গবেষণার কাজেও কি আপনারা জোর দিচ্ছেন?
মফিদুল হক :সব কাজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর একা করতে পারবে না। এখানে ইতিহাসের অনেক নথিপত্র আছে। গবেষকরা যদি এখানে কাজ করতে চান, আমরা সব রকম সহযোগিতা দিতে পারব। আমরা গবেষণাকে উৎসাহিত করতে চাই।
সমকাল :মুক্তিযুদ্ধের ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরও শুরু করেছেন আপনারা ...
মফিদুল হক :আমাদের মনে হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বার্তা কীভাবে দূর-দূরান্তে পৌঁছানো যায়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু হয়। সে জন্য প্রথমে একটা বাসের ভেভরে আমরা খুদে জাদুঘর করি। দুটি বাস আছে এখন আমাদের। এটা এখন জেলা-উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায়। সেখানকার শিক্ষার্থীরা জাদুঘরের প্রদর্শনী দেখে। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দেখে প্রজেক্টরের সাহায্যে।

সমকাল :আজকের বাংলাদেশকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মফিদুল হক :বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিটা বিস্ময়কর। এক সময় কবে আমাদের এখানে মার্কিন গমের জাহাজ ভিড়বে, তা নিয়ে পত্রিকার প্রথম পাতায় সংবাদ ছাপা হতো। এখন আমাদের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও অধিক। তার পরও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক দেশ। সর্বক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সবকিছুর সঙ্গে সমস্যাও অনেক। সমাজে বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য অনেক প্রকট। যারা অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কিনতে পারছে, তারা একটা গুণগত শিক্ষা পাচ্ছে। শিক্ষার প্রসার হয়েছে, কিন্তু গুণগত ঘাটতি রয়েছে। যুদ্ধ হয়েছিল সম্প্রীতির সমাজ, বাঙালিত্ব নিয়ে। বাঙালিত্ব মানে অন্য জাতিসত্তার ওপর পীড়ন নয়। অন্যান্য জাতিসত্তাকেও তাদের অধিকার পেতে হবে। এখন ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করে সহিংস করে তোলা হচ্ছে। এখান থেকে উঠে আসার জন্য যে উদ্যোগ, সেখানে যখন কিছু ঘাটতি দেখি তখন খুব পীড়াদায়ক মনে হয়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের যে সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে তা যেন আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি।
সমকাল :সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
মফিদুল হক :আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

আরও পড়ুন

×