সাইবার নিরাপত্তা
অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা জরুরি
আহমেদ স্বপন মাহমুদ
প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৪:৩৩
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের সংবিধানে ৪৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে তথ্য সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে অনলাইনে তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে বেড়েছে। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১১২.৭১৩ মিলিয়ন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ইন্টারনেট নিরাপত্তা অনেকটাই হুমকির মুখে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে চলেছে অহরহ। উলেল্গখ্য, আমাদের বেশিরভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন নন এবং অনেকেই ইন্টারনেটের নিরাপত্তার বিষয়গুলো সঠিকভাবে বোঝেন না, যার ফলে প্রতিনিয়ত তাদের নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সরকারিভাবে ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে কোনো জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই এবং বেসরকারি পর্যায়েও তা অপ্রতুল।
সম্প্রতি করোনা মহামারির কারণে মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। ফলে দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে শুরু করে সব কিছুতেই মানুষ অনলাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে অনলাইনে পাঠদান নয়, বিভিন্ন অফিস-আদালতের কার্যক্রম, সভা-সমিতিসহ অন্যান্য কার্যক্রম সব কিছুই অনলাইনভিত্তিক চলছে। এ ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নের ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা ইন্টারনেট ব্যবহারে আকৃষ্ট হচ্ছেন দিন দিন। ফলে সব সময় নতুন নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যুক্ত হচ্ছেন, যারা তথ্য সংরক্ষণ ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সম্পূর্ণ সচেতন নন। নিত্যদিনের যোগাযোগে তারা যেসব সিস্টেম এবং অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করছেন, এর বেশিরভাগই অস্বচ্ছ এবং সেগুলোর নিরাপত্তাও অপর্যাপ্ত। সাধারণ মানুষও এখন অনলাইনে অনেক বেশি সময় কাটাচ্ছে। আগে যেসব কাজ সামনাসামনি করা হতো, এখন সেগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেরে ফেলা হচ্ছে এবং ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমের অনেক অ্যাপিল্গকেশন এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড ও নিরাপদ নয়।
উলেল্গখ্য, ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক ব্যবহারকারী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে নারীরা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যও নিরাপদ নয়। কখনও হ্যাকিংয়ের শিকার হচ্ছে ব্যবহারকারীদের আইডি বা অ্যাকাউন্টস এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ইত্যাদি। বিভিন্নভাবে হ্যাকাররা তাদের অ্যাক্সেস নিয়ে নেয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের অজ্ঞানতা ও অসচেতনতা থেকে। এ ছাড়া সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন তথ্য, ডকুমেন্টসও চুরি হয়ে যাচ্ছে, তারাও হ্যাকিংয়ের মুখে পড়ছেন। ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা ব্যাপক হুমকির মুখে।
সাধারণত কোনো জিনিস চুরি যাওয়া থেকে রক্ষা করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলো থেকে তথ্য চুরির যে বিষয়টি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে অনেকেই সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তথ্য চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৫০ মিলিয়নের বেশি মানুষ শুধু ফেসবুক ব্যবহার করে। আমাদের দেশে ইন্টারনেটে নিরাপত্তা লঙ্ঘনজনিত ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটে এই ফেসবুকের মাধ্যমেই। বিভিন্ন দুস্কৃতকারী ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া নিউজ, ষড়যন্ত্রমূলক তথ্য প্রচার করে। সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য যাচাই না করেই সেসব লিংকে প্রবেশ করে। ফলে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি তথ্য চুরির ঘটনা ঘটে। এজন্য নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যগুলো আলাদা করে সংরক্ষণ করা জরুরি।
উদাহরণস্বরূপ, আমাদের যোগাযোগের কারণে অনেকেই ইয়াহু বা জিমেইল অ্যাকাউন্টের ইউজার নেইম জানেন। এক্ষেত্রে একজন হ্যাকারের শুধু পাসওয়ার্ড দরকার। ফলে নিজের অ্যাকাউন্টকে নিরাপদ করার প্রথম ধাপ হচ্ছে জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। এ ছাড়া টু-ফ্যাক্টর লগইনের মাধ্যমে নিজেদের আইডি নিরাপদ রাখা যায়। কারণ এক্ষেত্রে অন্য কেউ আপনার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে চাইলে পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর আপনার ফোনে যাচাই কোডসহ একটি খুদেবার্তা আসবে। সেটি ব্যবহার না করা পর্যন্ত আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যাবে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার একটি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন-এর খসড়া তৈরি করছে। জানা যায়, সরকার নতুন আইনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য ডাটা স্থানীয়করণের বিষয়টি চিন্তা করছে। অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নাগরিকদের তথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার এমনটি করতে যাচ্ছে। কিন্তু মানবাধিকারকে সমুন্নত করার জন্য ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা বা গোপনীয়তার আইন জরুরি। আমরা মনে করি, সংবিধানের প্রতি সম্মান রেখে নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষার জন্য একটি যুগোপযোগী আইন তৈরি করবে সরকার।
প্রত্যেকের ব্যক্তিগত তথ্য তার নিজস্ব সম্পদ। যে কারও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে আগে সম্মতি বা অনুমতি নিতে হবে। এক্ষেত্রেও সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যেমন- টেলিকম অপারেটররা এজেন্টের মাধ্যমে মোবাইল সিম নিবন্ধনের জন্য বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহ করে। সরকারের নির্দেশনায় আমরা তৃতীয় পক্ষকে অর্থাৎ মোবাইল ফোন অপারেটর দ্বারা নিযুক্ত এজেন্টদের আমাদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দিই। পরে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন আগ্রহী গোষ্ঠীর কাছে তারা প্রকাশ করেছে, যা আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। এক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকসহ সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী প্রত্যেকেই গোপনীয়তার ঝুঁকির মধ্যে আছেন। যে কোনো সময় কোনো পক্ষ চাইলে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে আমাদের সমস্যার মধ্যে ফেলতে পারে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক সচেতন ও সতর্ক হওয়া আবশ্যক। বিভিন্ন প্ররোচনামূলক পোস্টের মাধ্যমে হ্যাকাররা ব্যবহারকারীদের তাদের লিংকে প্রবেশ করাতে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া নানা ধরনের অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য চুরি করে তারা। ফলে কোনো অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বা কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার ক্ষেত্রে আমাদের জেনে নিতে হবে আদৌ সেটি নিরাপদ কিনা।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা তথ্য সুরক্ষায় অনলাইনে আরও সচেতন হতে হবে। আমাদের প্রতিটি ক্লিক করার আগে জানতে হবে- আমরা যেটি ব্যবহার করতে যাচ্ছি তা নিরাপদ কিনা। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও দক্ষতার পাশাপাশি পরস্পরের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টিকে সম্মান জানাতে হবে এবং আরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এ ছাড়া আমরা মনে করি, একটি উপযুক্ত ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন নাগরিকের তথ্য সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখবে।
আহমেদ স্বপন মাহমুদ:কবি ও গবেষক
- বিষয় :
- সাইবার নিরাপত্তা
- আহমেদ স্বপন মাহমুদ