ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

চিলির নির্বাচন এবং বামপন্থিদের জন্য শিক্ষা

চিলির নির্বাচন এবং বামপন্থিদের জন্য শিক্ষা
×

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৩:৪৭

গত ১৯ ডিসেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে অনুষ্ঠিত হলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ৩৫ বছর বয়সী বামপন্থি গাব্রিয়েল বোরিক ৫৫ বছর বয়সী কট্টর ডানপন্থি হোসে আন্তোনিও কাস্তকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। বামঘেঁষা জোট ব্রড ফ্রন্ট এবং চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচনী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন বোরিক। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বোরিক পেয়েছেন ৫৬ শতাংশ ভোট আর কাস্ত পেয়েছেন ৪৪ শতাংশ। বোরিকের এই বিজয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বামপন্থিরাও উদ্বেলিত। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অভিনন্দনে তাদের এই আনন্দ তাই উপচে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই বাম পন্থার বিজয়; তা সে যত ক্ষুদ্রই হোক; সব দেশেই বামপন্থিদের অন্তরকে আলোড়িত করে, আন্দোলিত করে। সে হিসেবে চিলিতে বামপন্থিদের বিজয়ে বাংলাদেশের বামপন্থিরাও যে আলোড়িত হবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কতদিন? বাংলাদেশের বামপন্থিরা কি অনন্তকাল শুধু অন্যকেই বিজয়-অভিনন্দন জানিয়ে চলবেন? নিজেরা কি কখনও অভিনন্দিত হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন না? আর যদি দেখেন, তা কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? বোরিকের বিজয়ের নিরিখে তা ভেবে দেখা দরকার। শিক্ষিত বাঙালি মাত্রই চিলির ইতিহাসের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত; বিশেষ করে দু'জন ব্যক্তির জন্য- সালভাদর আলেন্দে ও পাবলো নেরুদা। আলেন্দের নির্মম হত্যার পর দেশটি যে কী কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে হেঁটেছে, তা কমবেশি সবাই জানেন। বামপন্থিদের উত্থান পর্বের আলোচনায় গত দুই বছরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বাংলাদেশের বামপন্থিদের অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করি।


বিশ্বের বৃহত্তম তামা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ চিলি একটি শিল্পোন্নত দেশ। জনগণের মাথাপিছু আয় বছরে প্রায় ২৫ হাজার ডলার। কিন্তু দেশটিতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য খুবই প্রকট। ১ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে দেশটির প্রায় ২৭ শতাংশ সম্পদ। এ বৈষম্যের বিষয়কেই পুঁজি করে ওখানকার বাম দলগুলো ২০১৯ সালে গড়ে তোলে তীব্র আন্দোলন। সঙ্গে যোগ করে নেয় দুর্নীতি দমন, পেনশন আর স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের দাবি। আন্দোলন চলে ২০২০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই গাব্রিয়েল বোরিক ও বাম রাজনীতিকরা জনগণের মনে ঠাঁই করে নেন, যার চূড়ান্ত ফল ১৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন। এই প্রেক্ষাপটে এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক বাংলাদেশের দিকে। '৯০-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, দুই দশকেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ২০১৮-এর ডিসেম্বরে তার কফিনে ঠুকে দেওয়া হয়েছে শেষ পেরেক। অসহায় ক্ষোভে বুক ফাটিয়েছে জনগণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল বামদের ওপর। তারা জনগণের এ ক্ষোভকে বিক্ষোভে রূপ দিয়ে একটা ঝাঁকুনি অন্তত দেবেন। কিন্তু এ কাজে বামপন্থিরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। তার পরের ইতিহাস- ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, ব্যাংকের টাকা গায়েব, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য খাত, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ইত্যাদি। এরই মাঝে করোনার ছোবল, যা এক শ্রেণির মানুষের কাছে ধরা দিল আশীর্বাদ হয়ে। ফলে বেড়ে চলল আয় বৈষম্য।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী দেশে গত এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার। অন্যদিকে আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। চিলির বামপন্থিরা যদি তাদের দেশের জনগণের আয় বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে বছরব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন, একই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বামপন্থিরা তা পারেন না কেন? চিলির বামপন্থিরা যখন সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে মাঠে নেমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, বাংলাদেশের বামপন্থিরা তখন ইস্যু খুঁজলেন লাল বইয়ের মলাটে। এই সুযোগে শাসক দল লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা ঢাকার মতো একের পর এক ইস্যু তৈরি করে ইস্যু দিয়ে ইস্যু ঢাকার খেলা খেলেছে। বামপন্থিরা সরকারের এ খেলা ধরতে না পেরে নিজেদের মাঝে শুধু অবস্থার ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণই করে চলেছেন। তারা ভুলে গেলেন মার্ক্সের সেই বিখ্যাত উক্তি- এযাবৎ দার্শনিকরা শুধু সমাজকে বিশ্নেষণই করেছেন। এখন দরকার সমাজকে বদলানো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বামপন্থিরা সব সময় ইস্যুর বিশ্নেষণই করেন; ইস্যুর সুরাহা করেন না। বর্তমানেও তাই চলছে।

চিলিতে যারা বোরিককে ক্ষমতায় এনেছেন, তারা কিন্তু সবাই কমিউনিস্ট নন; কেউ কেউ শুধু বামঘেঁষা। তার পরও ওখানকার কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমমনা এবং সমলক্ষ্যে ক্রিয়াশীল সব দল নিয়ে নির্বাচনী ফ্রন্ট তৈরি করে এগিয়ে গেছেন। অন্যদিকে আমাদের দেশের বামপন্থিরা এখন পর্যন্ত নিজেদের জন্য যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারেননি। প্রায় দেড় দশক ধরে শুনে আসছি তৃতীয় শক্তির কথা। কিন্তু বামরা নিজেরাই কখনও অন্তর্কলহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তা ছাড়া তৃতীয় শক্তির বিকাশে যে নূ্যনতম ইস্যুর ভিত্তিতে সমঝোতার দরকার, তা-ই তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। আরও একটা বিষয় এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তারা কি রাজনীতির জন্য রাজনীতি করছেন, নাকি দেশের তথা জনগণের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি করছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বামপন্থিরা বাংলাদেশে ক্ষমতায় যেতে চান কিনা- সে কথাটিই জনগণের কাছে তারা স্পষ্ট করতে পারেননি। শুধু তত্ত্বজ্ঞান দিয়ে রাজনীতি হয় না। রাজনীতি করতে হলে জনগণের ভাষা, জনগণের নাড়ি বুঝতে হয়। নিজের হাতের শিরায় চাপ দিয়ে অন্যের নাড়ি বোঝা যাবে না। জনগণের নাড়ি বুঝতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের ইস্যুকে জনগণের মতো তুলে ধরতে হবে। সে কাজটিই করেছেন চিলির বামেরা। বৈষম্য, দুর্নীতি, পেনশন আর স্বাস্থ্যসেবার ইস্যু নিয়ে মাঠে নেমেছেন। নেতৃত্ব তুলে দিয়েছেন তরুণদের হাতে। আমাদের দেশের বামেরা যদি রাজনীতির মাঠে থাকতে চান, তাহলে চিলির ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে সমমনাদের নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, আর দায়িত্ব দিতে হবে তরুণদের হাতে।

মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা

আরও পড়ুন

×