বাধায় কাউন্সিল করতে পারছে না বিএনপি
কামরুল হাসান
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২২ | ১৪:৫০
তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বিএনপি। এ জন্য কাউন্সিলকেই প্রাধান্য দিচ্ছে দলটি। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়া, ক্ষমতাসীন দলের বাধা ও হামলার আশঙ্কায় বেশিরভাগ জেলা ও উপজেলায় কাউন্সিল করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা। এর পরও বেশকিছু জায়গায় কাউন্সিল শেষ হয়েছে এবং কিছু জায়গায় এ মাসেই করা হবে বলে জানা গেছে। আর এর জন্য রমজান মাসকে সাংগঠনিক মাস হিসেবে ধরে দল পুনর্গঠনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করতে চায় বিএনপি।
একইসঙ্গে এ মাসে সরকার বিরোধী বৃহৎ জোট গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চায় দলটি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে নতুন জোট গঠনই এখন দলটির প্রধান এজেন্ডা। এ জন্য ডান-বামসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক দলের সঙ্গে এক দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। এর বাইরে বেশ কয়েকটি বাম দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গেও কথা বলেছেন বিএনপি নেতারা। রমজানে ইফতার মাহফিল ঘিরে জাতীয় ঐক্য গঠনের সব ধরনের চেষ্টা করবে বিএনপি।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের ওয়ার্ড পর্যায়ে সম্মেলনে প্রায় প্রতিটিতে পুলিশ বাধা দিয়েছে, যার কারণে দলের সিনিয়র নেতারা পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়ে লিখিত আবেদনও করেন। এরপরও বাধা দেওয়া হয়েছে, নেতাকর্মীদের আটক করা হয়েছে। বাগেরহাট, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালীসহ প্রায় প্রতিটি জেলার উপজেলা সম্মেলনে পুলিশি বাধা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি কাউন্সিলেই বাধা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে কাউন্সিলের জন্য অনুমতি চাওয়া হয়, সেখানে দেওয়া হয় না; যেদিন চাওয়া হয়, সেদিন দেওয়া হয় না; যতক্ষণ সময়ের জন্য চাওয়া হয়, ততক্ষণ সময় দেওয়া হয় না। অনেক দেনদরবার করে প্রতিটি কাউন্সিলের জন্য অনুমিত নিতে হচ্ছে বলে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। আবার যেসব জায়গায় অনুমতি এখন দেওয়া হচ্ছে না, সেসব জায়গায় কাউন্সিল প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলের কমিটি গঠন বা হালনাগাদ চলমান প্রক্রিয়া। তবে সরকার ও প্রশাসনের বাধা-বিপত্তি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পর মামলার কারণে দেশের কোথাও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা একত্র হতে পারছেন না। এর পরও তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। সারাদেশে দল পুনর্গঠন কার্যক্রম চলছে। একইসঙ্গে বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করছে। দেশের জনগণকে মুক্ত করতে হলে বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়োজন। এটি শুধু বিএনপির বিষয় নয়, সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তির জন্য। দেশকে বাঁচাতে অচিরেই সেই ঐক্য গড়ে উঠবে বলে বিশ্বাস করি।
পুনর্গঠন কার্যক্রম: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কেন্দ্র থেকে সারাদেশে দলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সারাদেশের ৮১টি সাংগঠনিক ইউনিট কমিটির মধ্যে বেশিরভাগ জেলা কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বেশিরভাগ ভেঙে নতুন কমিটিও করা হয়। এখন নতুন কমিটি গঠনের পাশাপাশি ওইসব কমিটিকে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ করার কার্যক্রম শুরু করেছে দলের হাইকমান্ড।
জানা যায়, ২০১৮ সালের পর দলটির ৪৩ জেলা কমিটিকে ভেঙে নতুন আহ্বায়ক কমিটি এবং ১৬টি জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। এসব আহ্বায়ক কমিটিকে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌর ও উপজেলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করে জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক জেলা কমিটি মেয়াদ শেষ করলেও নতুন কমিটি গঠন করতে পারেনি। আবার অনেক জেলা কাউন্সিলের প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি না মেলায় তা করতে পারেনি।
কাউন্সিলে কমিটি গঠন: দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পরপরই পেশাজীবী সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলে কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। সবশেষ গত শনিবার চাঁদপুর জেলায় বিএনপির দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক যুগ পর সম্মেলনের মাধ্যমে ভোটাভুটি করে জেলা বিএনপির নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
গত বছরের অক্টোবরে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে তৃণমূলে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বৈঠকে সর্বস্তরে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় তৃণমূলে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনে ব্যস্ত বিএনপি। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার কাউন্সিলে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও সিনিয়র নেতারা অংশ নিচ্ছেন। তারা কাউন্সিলের তদারকি করছেন।
এসব জেলার বাইরে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে ঢাকাসহ প্রায় ১৫টি জেলায় কাউন্সিলের প্রস্ততি সম্পন্ন করেছেন দায়িত্বশীল নেতারা। এ ছাড়া পঞ্চগড়, শেরপুর, সৈয়দপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, রাজবাড়ী ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কাউন্সিলের বিষয়ে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিকভাবে নেতৃত্ব নির্বাচন করার প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধায়ন করছেন। সারাদেশের মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা শাখা এবং থানা-উপজেলা-পৌর-ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্সিল করে সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের কাজ চলছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়েই কাউন্সিল শেষ করা সম্ভব হবে।
গুরুত্ব ঢাকা মহানগর বিএনপি: গত বছরের ২ আগস্ট ঢাকা মহানগর উত্তরে ৪৭ সদস্য ও দক্ষিণে বিএনপির ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা মহানগর বিএনপিকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে দলটি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। উভয় অংশেই সাংগঠনিক টিমের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে যোগ্যদের দিয়ে ওয়ার্ড কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেন নেতারা। কিছুদিন আগে ঢাকা উত্তরের ওয়ার্ড কমিটি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণের কমিটিও যে কোনো সময় দেওয়া হবে। পরে ওয়ার্ড কমিটির নেতাদের মতামতে থানা কমিটি এবং পরে মহানগর কমিটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
সাংগঠনিক তৎপরতা: পুরো রমজান মাসে সাংগঠনিক কার্যক্রমে আরও গতি আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের এক দফা আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রতিটি অঙ্গ সংগঠনকে কর্মসূচি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য জেলা, উপজেলা পর্যায়ে ইফতার মাহফিল; দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়াতে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।