ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মহাসমাবেশ পাল্টা সমাবেশ

রাজপথ দখলে রাখার তৎপরতা

রাজপথ দখলে  রাখার তৎপরতা
×

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

আগামী বৃহস্পতিবারের শান্তি সমাবেশ সফল করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছে আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন। এই সমাবেশের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকায় আরেকটি বিশাল শোডাউনের মধ্য দিয়ে রাজপথ নিজেদের দখলে রাখতে চায় সরকার সমর্থকরা।  
ক্ষমতাসীন দলের তিন সহযোগী সংগঠন– যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে এই শান্তি সমাবেশ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম গেটে অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে শান্তি সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও সকাল থেকেই রাজপথ নিজেদের দখলে রাখার প্রস্তুতিও চলছে সরকার সমর্থকদের মধ্যে। ওইদিন সকাল ১১টা থেকেই নেতাকর্মী জড়ো হবেন শান্তি সমাবেশস্থলে। এরপর দুপুর ১টা থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন এবং বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই শান্তি সমাবেশের বিস্তারিত কর্মসূচি তুলে ধরতে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করেছে তিন সহযোগী সংগঠন। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, বিএনপির মহাসমাবেশের দিনটিতে শান্তি সমাবেশের ডাক দেওয়া হলেও শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি পালন করা হবে।
গত শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির তিন সহযোগী সংগঠনের তারুণ্যের সমাবেশ থেকে ২৭ জুলাই নয়াপল্টনে মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের নতুন এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একই দিন বিএনপির মিত্র অন্য কয়েকটি জোট ও দলও যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাজধানীতে পৃথক মহাসমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেয়।

বিএনপি ও তার মিত্রদের মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণার এক দিন পর রোববার রাতে আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের যৌথ শান্তি সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অবশ্য এর আগে কর্মসূচিতে দুই দফা পরিবর্তনও আনা হয়। প্রথমে যুবলীগের ঢাকা বিভাগীয় তারুণ্যের জয়যাত্রা সমাবেশ পিছিয়ে ২৪ জুলাইয়ের বদলে ২৭ জুলাই দুপুর ২টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম গেটে অনুষ্ঠানের কথা জানানো হয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতাদের নির্দেশনায় সেটিকে শান্তি সমাবেশ নাম দিয়ে আয়োজক হিসেবে যুবলীগের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগকেও যুক্ত করা হয়।

যুবলীগ সূত্রে জানা গেছে, আগে থেকেই ঢাকা বিভাগীয় তারুণ্যের জয়যাত্রা সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়ে আসছিলেন তারা। যেখানে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং ঢাকা জেলা ছাড়াও বিভাগের অন্যসব জেলা ও মহানগর থেকে নেতাকর্মী সমবেত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এর প্রস্তুতি হিসেবে এরই মধ্যে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় বর্ধিত ও কর্মিসভা হয়েছে। ফলে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা নেতাকর্মী বিশেষ করে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড, ইউনিট ছাড়াও ঢাকার আশপাশের মহানগর ও জেলাগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বৃহস্পতিবারের শান্তি সমাবেশে যোগ দেবেন। সব মিলিয়ে লক্ষাধিক নেতাকর্মী সমাবেশে জড়ো করার পরিকল্পনা রয়েছে।

যুবলীগের সঙ্গে নতুন করে অন্য দুই সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগকে শান্তি সমাবেশ আয়োজনে যুক্ত করায় সমাবেশে জনসমাগম কয়েক লাখ ছাড়াবে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। তারা বলছেন, বৃহস্পতিবার দিনভর শান্তি সমাবেশে যোগ দেওয়া ছাড়াও বিএনপির মহাসমাবেশকে ঘিরে সম্ভাব্য সন্ত্রাস-নৈরাজ্য ঠেকাতে রাজপথে সতর্ক অবস্থানে থাকবেন নেতাকর্মী। কোথাও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা মাত্রই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রতিহত করবেন সরকারসমর্থক এসব নেতাকর্মী।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল সমকালকে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, তাণ্ডব ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে যুবলীগ গত ৯ জুলাই থেকে বিভাগীয় শহরগুলোতে তারুণ্যের জয়যাত্রা সমাবেশ করে আসছে। চলমান এই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ঢাকা বিভাগীয় তারুণ্যের জয়যাত্রা সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তারা এখন ওই কর্মসূচির বদলে অন্য দুই সংগঠনের সঙ্গে যৌথ শান্তি সমাবেশ করছেন। পরে সুবিধাজনক সময়ে ঢাকা বিভাগীয় তারুণ্যের জয়যাত্রা সমাবেশ করা হবে। তার আগে বৃহস্পতিবারের যৌথ শান্তি সমাবেশে সর্বোচ্চসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত চক্রের অপরাজনীতি ও ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
একই কথা বলেছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম আফজালুর রহমান বাবু ও ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। তারা বলেন, শান্তি সমাবেশ সফল করতে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মাঠে নামবেন তারা। আন্দোলন ও মহাসমাবেশের নামে বিএনপিকে কোনো অবস্থায়ই রাজপথে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।

এদিকে, একই দিন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন এবং সরকারবিরোধী প্রধান দল বিএনপি ও তার মিত্রদের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ-মহাসমাবেশের কর্মসূচিকে ঘিরে জনমনে আরেক দফা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীতে মাত্র দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন ও সরকারবিরোধীদের রাজপথ দখলের ঘোষণায় ব্যাপক সন্ত্রাস-সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদিও এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি গতকাল রোববার দলীয় এক সভায় বলেছেন, আগামী ২৭ তারিখের সমাবেশ ঘিরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংঘাতের কোনো আশঙ্কা নেই। আওয়ামী লীগ সংঘাত চায় না। আওয়ামী লীগ কোনো উস্কানিও দেবে না। তবে জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকার নিরাপত্তা দেবে।

সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন নেতারা

যৌথ শান্তি সমাবেশ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা উপলক্ষে রোববার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলনে নেতারা দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীদের হাতে বিভিন্ন স্থানে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে হত্যা ও আহত করার প্রতিবাদে এই শান্তি সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসের বলি হয়ে কয়েকজন যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মী নিহত ও আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন হবে। নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনে বিএনপি-জামায়াতসহ দেশবিরোধী চক্র ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আবারও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। অগ্নিহত্যার ড্রেস রিহার্সেল হিসেবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আহত করেছে আরও অনেক নেতাকর্মীকে।  
বিএনপির মহাসমাবেশের পাল্টা সমাবেশ করছেন কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। রাজনৈতিক দল হিসেবে সহাবস্থানে থেকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হবে। সাপ্তাহিক কর্মব্যস্ততার দিনে দুই দলের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করবে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা একটি স্থান জানালাম। পরবর্তী সময়ে স্পট পরিবর্তন করতে পারি।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক একেএম আফজালুর রহমান বাবু, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

  

আরও পড়ুন

×