বিএনপির মহাসমাবেশ
পদত্যাগ করুন, নইলে ফয়সালা রাজপথে
রাজধানীর নয়াপল্টনে শুক্রবার বিএনপির মহাসমাবেশ- সাজ্জাদ নয়ন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ২৩:০৮ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ২৩:০৮
সরকার পতনের এক দফা দাবিতে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনের মহাসমাবেশ থেকে ঢাকার চার প্রবেশ পথে আজ শনিবার শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে দলটি। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে। পথের বাধা, পুলিশি তল্লাশি আর রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মহাসমাবেশে আসা নেতাকর্মীর বিশাল জমায়েতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আরও লড়াই করতে হবে। সরকার পদত্যাগ না করলে ফয়সালা রাজপথে।’
গত বৃহস্পতিবার মহাসমাবেশ করতে চেয়েছিল বিএনপি। অনুমতি না মেলায় কর্মসূচি এক দিন পিছিয়ে দেয়। একই সময়ে আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে শান্তি সমাবেশ করায় সংঘাতের শঙ্কা ছিল। এ কারণে মহাসমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারা ছিল। বিএনপির আগের কর্মসূচির মতো গতকালও নয়াপল্টনে ইন্টারনেট ছিল না। প্রথমবারের মতো দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অডিও বক্তব্য প্রচার করা হয় মহাসমাবেশের মঞ্চ থেকে। রাজধানীতে পৃথক স্থানে সমাবেশ করে সমমনা দল ও জোটগুলো।
গত ১২ জুলাই নয়াপল্টনে সমাবেশ করে এক দফা ঘোষণা করে বিএনপি। দাবি আদায়ে ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটারের বেশি পদযাত্রা করে দলটি। ওই দু’দিন বিভাগীয় শহর ও জেলায় শহরেও পদযাত্রা করে তারা। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সামনের দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই বিএনপির কর্মসূচি থাকবে। অবস্থানের পর ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দিতে পারে দলটি।
মহাসমাবেশে যোগ দিতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা নেতাকর্মীরা রাজধানী অবস্থান করে এসব কর্মসূচিতে যোগ দেবেন। আগের ব্যর্থতার শিক্ষা থেকে এবার ঢাকায় আন্দোলন জমাতে দলীয় তত্ত্বাবধানে তাদের রাখা হয়েছে।
এই সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না
মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পরিষ্কার বলেছি– বেআইনি, অসাংবিধানিক ও অবৈধ এই সরকারের অধীনে আগামীতে আর কোনো নির্বাচন হবে না। সমৃদ্ধির বাংলাদেশ, আনন্দের বাংলাদেশ আর প্রেমের বাংলাদেশ গড়তে এই সরকারকে অবশ্যই সরে যেতে হবে। নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে তরুণ প্রজন্মকে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তিনি নেতাকর্মীকে বলেন, ক্লান্ত হয়ে গেছ! আরও অনেক লড়াই করতে হবে। দাবি আদায় করে ঘরে ফিরতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের বাইরে রয়েছে যেসব দল, তারাও এখন বলছে এই সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। যারা আন্দোলনে অংশ নেবে, তাদের নিয়ে জাতীয় সরকার হবে।
সরকারকে হুঁশিয়ার করে মির্জা ফখরুল বলেন, যদি দেশের মঙ্গল চান তাহলে এখনও সময় আছে, এক দফা দাবি মেনে পদত্যাগ করুন। নাহলে ফয়সালা কোথায় হবে– স্লোগান তোলেন বিএনপি মহাসচিব। এই সময় নেতাকর্মীরা সমস্বরে বলেন, ‘রাজপথে রাজপথে’।
আগেই সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি বিবৃতি দিয়েছে। মির্জা ফখরুল বলেন, প্রশাসনকে বলতে চাই– এই ভয়াবহ সরকারের বেআইনি আদেশ-নির্দেশে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না। আপনারা সবাই এ দেশের মঙ্গল চান, এই দেশের কল্যাণ চান। আপনারা শপথ নিয়েছেন, দেশের স্বার্থে সংবিধান অনুযায়ী কাজ করবেন। আমরাও তাই চাই আপনাদের কাছে। বেআইনি গ্রেপ্তার বন্ধ করুন, হয়রানি বন্ধ করুন এবং যারা কারাগারে আছে তাদের ছেড়ে দিন। অবৈধ সরকারের কোনো বেআইনি নির্দেশ মানবেন না।
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ফিরে পেতে চান ঘোষণা দিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, অবিলম্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগ ও সংসদ বিলুপ্ত করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। অন্যথায় দেশের মানুষ মেনে নেবে না। শুধু জনগণ নয়, গোটা বিশ্ব বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ কংগ্রেসম্যান বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিয়েছেন। মির্জা ফখরুল বলেন, চিঠিতে বলা হয়েছে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত র্যাবকে যেন শান্তিরক্ষায় নেওয়া না হয়। এসব চিঠি আমাদের জন্য আনন্দের নয়, লজ্জার। সরকারের অপকর্মে এ লজ্জা পেতে হচ্ছে আমাদের। মার্কিন রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১৪ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
অন্য নেতারা যা বললেন
সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ ঢাকায় এসেছে। সমাবেশ আটকাতে তাদের গ্রেপ্তার করে অবৈধ সরকারের অনুগত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক হাজার লোককে গ্রেপ্তার করে কী করলেন? একটা সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা পানি নিয়েছেন। জনগণের সমাবেশ আটকাতে পারেননি। এখন থেকে সমাবেশের অনুমতি চাইব না।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বক্তৃতা দিয়ে সরকার পতন হবে না। আদালত, পুলিশ, প্রশাসন সব প্রধানমন্ত্রীর হাতের মুঠোয়। সমাবেশ করে তার পতন ঘটানো যাবে না। তাই রাজপথ ছাড়া যাবে না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেছেন, সমাবেশ পণ্ড করতে অনেক ষড়যন্ত্র করেছে; কিন্তু জনগণের শক্তির কাছে তারা মাথানত করেছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান ও দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালামের যৌথ পরিচালনায় মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লা বুলু, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, মিজানুর রহমান মিনু, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া, জয়নুল আবদিন ফারুক, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, মজিবর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবীর খোকন, হারুনুর রশিদ, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে আসাদুল হাবিব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আব্দুস সালাম আজাদ, এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, মাহবুবের রহমান শামীম, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, যুবদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, স্বেচ্ছাসেবক দলের এস এম জিলানী, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, ছাত্রদলের কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ প্রমুখ।
বড় জমায়েত
গত বুধবার থেকেই বিএনপি কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশে আসা নেতাকর্মীর ভিড় ছিল। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে গত বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় তাদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। কর্মসূচিতে আসা নেতাকর্মীকে ধরপাকড়ও করে পুলিশ। সন্ধ্যায় ফের কার্যালয়ের সামনে জমায়েত বাড়তে থাকে। হাজারো নেতাকর্মী দলীয় কার্যালয়ের সামনে বৃহস্পতিবার রাত কাটান।
গতকাল ঢাকার প্রবেশ পথে ছিল পুলিশের কড়া তল্লাশি। যানবাহন থামিয়ে যাত্রীদের মোবাইল ঘেঁটে দেখা হয় বিভিন্ন পয়েন্টে। বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে সন্দেহ হলে আটক করা হয়। তবু ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি নেতাকর্মীর বিশাল জমায়েত করতে পেরেছে।
দুপুর ২টার দিকে সমাবেশ শুরুর আগে পূর্ণ হয়ে যায় বিজয়নগর থেকে ফকিরাপুলমুখী সামনের সড়ক। বেলা যত বেড়েছে, ভিড়ও তত বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আসেন নেতাকর্মীরা। বিকেল ৫টার দিকে কাকরাইল মোড়, পল্টন মোড়, নাইটিংগেল মোড়েও ছিল নেতাকর্মীর জটলা। তারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবিসংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে আসেন। সরকারের পদত্যাগের দাবিতে নানা স্লোগান দেন।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আখতারুজ্জামান বাচ্চু জানান, সরকারি দলের অত্যাচারে গফরগাঁওয়ে বিএনপির রাজনীতি করা প্রায় অসম্ভব। তার পরও অর্ধসহস্রাধিক নেতাকর্মী এসেছেন।
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থেকে আসা কৃষক দলকর্মী আজিজুল ইসলাম বৃষ্টিতে ভিজছিলেন। তিনি জানান, বাধার ভয়ে বুধবার এসেছেন। দুই দিন ঢাকায় রয়েছেন। মহাসমাবেশ শেষে থাকবেন।
বৃষ্টি, ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা
বেলা ৩টার দিকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। তবে বিএনপি নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থল ছেড়ে যাননি। নেতারাও খোলা মঞ্চে বৃষ্টিতে ভেজেন। সমাবেশের কার্যক্রম স্বাভাবিক চলতে থাকে। নেতাদের বক্তৃতা এবং সড়কে থাকা শ্রোতাদের স্লোগান চলতে থাকে।
বৃষ্টির পর রোদের তেজ বাড়লে শরীরে শরীর লাগিয়ে দাঁড়ানোর ভিড়ে হাঁসফাঁস অবস্থা হয়। অনেকে এতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য মাহমুদুর রহমান সড়কে ঢলে পড়েন। তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
সমাবেশ শেষ হতেই নেটওয়ার্ক সচল
বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে নয়াপল্টনে মোবাইল ফোন ইন্টারনেট ছিল না। বিজয়নগর, কাকরাইল, সেগুনবাগিচায় ফোর-জি ইন্টারনেট পাওয়া যায়নি। এসব এলাকায় থ্রি-জি এবং টু-জি নেটওয়ার্ক ছিল। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নয়াপল্টনে মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে যায়। তবে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই ইন্টারনেট সচল হয়।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যারা ইন্টারনেট বন্ধ করেছে তারা অবৈধ সরকারের দালাল। যারা বিএনপির নেতাকর্মীকে সমাবেশে আসতে বাধা দিয়েছে, তারা স্বৈরাচারের দোসর। যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তারা জাতীয় বেইমান হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে।
এদিকে মহাসমাবেশে নেতাকর্মীর দুই পক্ষের মধ্যে বসায় জায়গা নিয়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিবেশ শান্ত হয়।
বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মী মহাসমাবেশে সংহতি জানিয়ে যোগ দেন। বিনামূল্যে প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসাসেবা সহায়তা দিয়েছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের শিল্পীরা গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে নেতাকর্মীকে উজ্জীবিত রাখেন।
আগত নেতাকর্মীর জন্য বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ১১টি ভ্রাম্যমাণ টয়লেট নির্মাণ করে দেন।