বাঁচিয়ে রাখো তাফিদাকে
মানবতার ডাক
সৈয়দ আনাস পাশা, লন্ডন
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১৯:১৭
লন্ডনের ঐতিহাসিক ট্রাফালগার স্কয়ারে সমবেত হন শতাধিক মানুষ। তাদের প্রায়
সবার হাতেই তাফিদা রাকিবের মায়াবী মুখের ছবিসহ পল্গ্যাকার্ড। তাতে লেখা-
'উই ওয়ান্ট# তাফিদাইনইতালি; লেট মি গো টু ইতালি', 'সেভ তাফিদা- সি মি সেভ
মি', 'জাস্টিস ফর তাফিদা অ্যান্ড হার ফ্যামিলি'। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের
মুখেও ছিল মানবতার ডাক। তাদের একটাই দাবি- তাফিদাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
চিকিৎসার জন্য তাকে ইতালি যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে।
সমাবেশে তারা বলেন, প্রতিটি মানুষেরই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার
রক্ষার পক্ষে যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা রাখা উচিত, সেখানে শিশু
তাফিদার মৃত্যুর পক্ষে তার বাবা-মায়ের সম্মতি আদায় করতে চাওয়া গুরুতর
অপরাধ। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। জীবন হরণ নয়, জীবন রক্ষার মানবিক মনোভাব চাই।
সাত মাস ধরে রয়েল লন্ডন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা পাঁচ বছর বয়সী
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তাফিদা রাকিবের চিকিৎসা সুযোগের দাবিতে বৃহস্পতিবার
বিকেলে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন সংগঠন 'সিটিজেন গো' 'সেভ তাফিদা' শীর্ষক
সমাবেশটির আয়োজন করে। স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৬টায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে
প্ল্যাকার্ড হাতে শতাধিক মানুষ এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় স্লোগানের
ফাঁকে ফাঁকে সমাবেশে বক্তব্য দেন ক্যাম্পেইনার ক্যারোলিন ফেরো, মেডিসিন
কনসালট্যান্ট ড. জ্যাকুলিন লেইং, ড. ফিলিপ হাওয়ার্ড, ড. এ কে মাজিদ খাতমি ও
নোমান আহমেদ।
লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার অনুমতি দিতে তাফিদার পরিবারের প্রতি এনএইচএসের
চাপ প্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে ড. ফিলিপ হাওয়ার্ড বলেন, একজন রোগীর জীবন
বাঁচানোর চেষ্টা করা চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু জীবন হরণের অনুমতির
জন্য আদালতে যান সংশ্নিষ্টরা, আমার দীর্ঘ জীবনের চিকিৎসা পেশায় এমন ঘটনার
মুখোমুখি কখনও হইনি। জীবন বাঁচানোর চেষ্টা না করে হরণের জন্য চাপ প্রয়োগ
অমানবিক, সভ্যতার কলঙ্ক।
অন্য বক্তারা বলেন, তাফিদার বেঁচে থাকা তার নাগরিক অধিকার। এই অধিকার যারা
লঙ্ঘন করতে চায় তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছি। তারা অবিলম্বে উন্নত
চিকিৎসার জন্য তাফিদাকে ইতালিতে যাওয়ার অনুমতি দিতে সংশ্নিষ্টদের প্রতি
আহ্বান জানান।
লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার পক্ষে-বিপক্ষে এনএইচএস ও তাফিদা পরিবারের চলমান
আইনি লড়াইয়ে লন্ডনের উচ্চ আদালতে সোমবার শুরু হওয়া পাঁচ দিনের চলমান
শুনানির চতুর্থ দিনে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা আদালতের কাছে
তাফিদার ন্যায়বিচার প্রাপ্তিও আশা করেন। তাফিদাকে বাঁচাতে তার মা সেলিনা
রাকিবের আইনি লড়াইয়ের প্রশংসা করে তারা বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক লড়াই। এর
মাধ্যমে এনএইচএসের ব্যর্থতাই জনসমক্ষে তুলে এনেছে তাফিদার পরিবার। এতে শুধু
নিজের সন্তানই নয়, লাভবান হবে পুরো ব্রিটিশ সোসাইটি।
এদিকে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের এক অধিবেশনেও তাফিদাকে
অবিলম্বে ইতালি যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে,
পাঁচ মাস বয়সী শিশু তাফিদা রাকিবের মস্তিস্ক সচল থাকার পরও লন্ডন হাসপাতাল
তার জীবন কেড়ে নিতে চায়। ইতালিতে নিরাপদ চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও
তাফিদাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না এমনটি জানিয়ে জাতিসংঘের
মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে বলা হয়- কৌশল বা সামর্থ্যের অভাব কোনো
সমস্যা নয়, ইচ্ছার অভাবটিই হলো সমস্যা। তাফিদাকে বেঁচে থাকতে দেওয়ার
ক্ষেত্রে লন্ডন হাসপাতালের সেই ইচ্ছার অভাবটাই দেখা যাচ্ছে।
রয়েল লন্ডন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা তাফিদা রাকিবকে
চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নিতে চান চিকিৎসকরা। ইতালিতে
নিয়ে যেতে হাসপাতাল ছাড়পত্র দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় আদালতের দ্বারস্থ হন
তাফিদার আইনজীবী মা। পাশাপাশি লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়ার অনুমতির আশায়
আদালতের দ্বারস্থ হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। বিষয়টি নিয়ে ব্রিটেনের মূলধারার
সংবাদমাধ্যমগুলো সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। এর আগে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের
হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম তাফিদাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার জন্য
তার ইতালি যাওয়ার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
- বিষয় :
- মানবতার ডাক