উত্তরের জেলা নওগাঁ। এই জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিপ্রধান। জেলার অন্যান্য খাতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলেও কৃষি খাত রয়েছে এখনও পিছিয়ে। বাপ-দাদার আদি পেশা ছেড়ে চাকরির পেছনেই ছুটছেন সবাই। আবার চাকরির বাজার মন্দা থাকায় প্রতি বছরেই বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এমন অবস্থায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নের রূপগ্রাম গ্রামের কৃষক আজিজার রহমানের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সোহেল রানা (৩৭)। নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলে সোহেল রানা কিছুদিন ঢাকায় চাকরি করার পর নিজ গ্রামের খাড়িপাড়া এলাকায় পৈতৃক ১২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন সমন্বিত কৃষি খামার। নাম দেন 'রূপগ্রাম এগ্রো ফার্ম'। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মেধা, পরিশ্রম আর অটুট নৈতিক মনোবলের কারণে তিনি এখন ১৪০ বিঘা জমিতে পৃথক দুটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন। এই খামার থেকে বছরে এখন তার আয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। সেইসঙ্গে এখানে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। খামারে নিয়মিত কাজ করছেন ২৫ থেকে ৩০ জন। ফসল ও ফলের মৌসুমে তা আরও বেড়ে যায়। ৮০ থেকে ১০০ শ্রমিক তখন ওই খামারে কাজ করে। ইতোমধ্যে তার এই খামার দেখে ৩০ থেকে ৪০ জন বেকার যুবক খামার ও ফলের বাগান করে আত্মনির্ভরশীল। স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, সোহেল রানার সমন্বিত কৃষি খামার এখন এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের অনুপ্রেরণার উৎস এবং মডেল উদ্যোগ।
১৯৯৯ সালে সাপাহার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন সোহেল রানা। ২০০১ সালে সাপাহার সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সময় ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকার একটি কাগজে সাংবাদিকতাও করেন। স্নাতকোত্তর শেষে ঢাকার ওই মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ফিচার বিভাগের তথ্যপ্রযুক্তি পাতায় ৩০ হাজার টাকা বেতনে কাজও শুরু করেন। সেখানে কাজ করেন প্রায় চার বছর। কিন্তু সোহেল রানা কাজে মন বসাতে পারছিলেন না। নিজের কিছু করার কথা সব সময়ই ভাবতেন। সব সময় তার গ্রামের কথা, কৃষি ও কৃষকের কথা মনে হতো। ভেতরে ভেতরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল সেই খামার করার স্বপ্ন। সোহেল পত্রপত্রিকায় দেশের বিভিন্ন স্থানের সফল খামারিদের গল্প আগ্রহ নিয়ে পড়তেন এবং সুযোগ পেলেই সেসব খামার পরিদর্শনে যেতেন। এই ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে ঢাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে জেলার পত্নীতলার দিবর ইউনিয়নের নিজ গ্রাম রূপগ্রামে ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে স্বজনদের জানান নিজের স্বপ্নের কথা। স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি বার বার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রথমদিকে সবাই নিষেধ করলেও পরে পারিবারিক সহায়তায় ছোট ভাই আব্দুল বারীকে সঙ্গে নিয়ে ১২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন স্বপ্নের সমন্বিত কৃষি খামার। খামারের নাম দেন 'রূপগ্রাম এগ্রো ফার্ম'। প্রথমেই এই খামারে মধ্যে তিন বিঘা জমিতে করেন পুকুর, পুকুরের কাটা মাটিতে সাতশ আমগাছ, ১২০টি লিচু, ১০০টি মাল্টা, ১০০টি ড্রাগন ও ১০০টি ভিয়েতনামি নারিকেল গাছের চারা রোপণ করেন। সেইসঙ্গে হাঁস ও ছাগল পালন এবং গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম হাতে নেন। তিনি বলেন এক ফসলি এই ১২ বিঘা জমির ধান থেকে বছরে আয় হতো ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অথচ মাত্র এক বছরে কৃষি খামার থেকে আয় হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এই আয়ের টাকা দিয়েই একের পর এক জমি লিজ নেওয়া নেওয়া শুরু করেন। পরের বছর আরও ছয় বিঘা জমিতে বাগান করেন।
তাঁর খামারে রয়েছে আম, লিচু, ড্রাগন ফল, মাল্টা, খাটো জাতের নারিকেল, লেবুসহ ৫০ প্রজাতির ফলের গাছ। খামারে আরও আছে বাসক, তুলসী, নিম, নীল অপরাজিতা, সাদা লজ্জাবতীসহ নানা প্রজাতির ঔষধি গাছ। আছে বিভিন্ন জাতের ফুলগাছও। এ ছাড়া তিনটি পুকুরে মাছ চাষ করছেন সোহেল রানা। করছেন হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনও।
সমন্বিত খামারের পাশে আরও ১২ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন আমের বাগান। পাশের সাপাহার উপজেলার মানিকুড়া গ্রামে পাঁচ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে চাষ করছেন থাই পেয়ারা। এসব খামার থেকে বছরে আয় করছেন কয়েক লাখ টাকা।
নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে সোহেল রানা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষির ওপর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ ছাড়া যেকোনো পরামর্শের জন্য ছুটে যান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের কাছে। তাঁরাও বেশ যত্ন সহকারে তাঁকে সাহায্য করেন।
এই অবস্থায় গত বছর সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকায় ৬৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক। এই পার্কে এখন চাষ হচ্ছে আম, লিচু, পেঁপে, মাল্টা, বলসুন্দরী বরই, কাশ্মীরি বরই, ড্রাগন ফল, বিদেশি প্যাশন ফল, জাপানের জাতীয় ফল পার্সিমন, পুষ্টিকর ফল অ্যাভোকাডো। শুধু তাই নয় এসব গাছ থেকে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি চারাও উৎপাদন করে নার্সারি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার খামারের চারা ইতোমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এর পাশাপাশি বনজ ও ঔষধি গাছের সমাহার তার খামারে দেখতে পাওয়া গেছে। বনজ গাছের মধ্যে মেহগনি, কড়ই ও শাল রয়েছে। ঔষধি গাছের মধ্যে রয়েছে নিম, অর্জুন, বহেড়া, নিশিন্দা, হরীতকী, তুলসী, ওরিগানো, বাসক ও অ্যালোভেরা। তিনি বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষও সংরক্ষণ করছেন। এর মধ্যে বৈচি, অরবরই, বিলিম্বি, যজ্ঞডুমুর গাছ তিনি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করছেন। বরেন্দ্র এগ্রো পার্কে মাছ চাষসহ গবাদি পশু পালন ও বৃক্ষরাজির পাশাপাশি বিদেশি বিভিন্ন জাতের পাখিও পালন করছেন। এখানে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু, বাজরিগার ও কবুতর।
গত পাঁচ বছরে ১৪০ বিঘা জমির ওপর দুটি বড় খামারসহ অসংখ্য কৃষি বাগান গড়ে তুলেছেন।
সোহেল রানার সমন্বিত কৃষি খামার এখন এলাকার শিক্ষিত বেকারদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ইতোমধ্যে শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাঝে সোহেল রানার কৃষি খামার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর মিশ্র খামার দেখে এখন অনেকেই মিশ্র ফলের বাগান করছেন। পত্নীতলার রূপগ্রাম ও সাপাহারের গোডাউনপাড়ার আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ফলের বাগান। এসব বাগানে আম, পেয়ারা, লেবু, স্ট্রবেরি ও কুলগাছই বেশি। সাপাহারের নিশ্চিন্তপুরের আসিফ ইকবাল জামিল বলেন, সোহেলের খামার দেখে উৎসাহিত হয়ে ৩২ বিঘা জমিতে বরই ও মাল্টার বাগান করে গত বছর খরচ বাদে ১৫ লাখ টাকা আয় করেছি। একই কথা বলেন পাতাড়ী গ্রামের যুবক আল এমরান ও ইসলামপুর গ্রামের আনিছুর রহমান।
এদিকে সাপাহার করমজাই গ্রামের আবদুল জব্বার বলেন, 'সোহেলের সাফল্য দেখে উৎসাহিত হয়ে চার একর জমিতে গত বছর আম ও পেয়ারার বাগান গড়ে তুলেছি। আশা করছি, সফল হব।' সোহেল রানা তার খামারে সাফল্যের পর এখন কৃষি পর্যটন গড়ে তুলতে কাজ করছেন। তার খামারগুলোকেও সে অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। যাতে পর্যটকরা সবুজের সমারোহ উপভোগ করতে পারেন। তার খামারে ইদানীং নিয়মিত দূরদূরান্ত থেকে পরিদর্শনে আসছেন মানুষ। আর এই উদ্যোগের কারণেই সোহেল রানাকে ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ট্রিয়ার) এর পক্ষ থেকে সহযোগী সদস্য পদ প্রদান করা হয়েছে। দেখা যায় বিষমুক্ত ফল ও সবজি চাষে এই বিশাল খামারে তিনি নিজেই তরল জৈবসার তৈরি করছেন। আশপাশের গ্রাম থেকে গোমূত্র ও গোবর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে চিটাগুড়, ডালের গুঁড়া, মাটি ও পানি মিশ্রিত করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তরল জৈবসার তৈরি করছেন। এই সারের নাম দিয়েছেন জীবআমরুদ)। এই জীবআমরুদ রাসায়নিক সারের চেয়ে বেশি কার্যকর বলে তিনি জানিয়েছেন। এতে বিষ মিশ্রিত রাসায়নিক সার ফল, ফসল ও বৃক্ষরাজিতে ব্যবহার করতে হচ্ছে না। তার এই খামারেও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে সোহেল রানা বলেন, 'ভবিষ্যতে এই এলাকাকে খামারকেন্দ্রিক কৃষি ও গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্র, উচ্চমূল্যের পুষ্টিকর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফলের উৎস, জৈবসার ও কীটনাশক উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র, বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন দেশিগাছের (জার্ম প্লাজম) সংরক্ষণাগার ইত্যাদিসহ আধুনিক কৃষিনির্ভর করে গড়ে তুলতে চাই। সে জন্য কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং উৎপাদিত ফসল ও ফলের বহুমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে সংরক্ষণাগার বা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়ায় ৬৫ বিঘা জমির ওপর বরেন্দ্র এগ্রো পার্কটিকে আধুনিক সমন্বিত খামারে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে খামার থেকে আমার বার্ষিক আয় প্রায় ২০ লাখ টাকা।' সোহেল রানা আরও জানান, 'কৃষি বিভাগ তাঁর খামারকে সফল করার জন্য চারা ও পরামর্শ দিয়ে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে আসছে। বর্তমানে সোহেল রানা একজন মডেল খামারি।

লেখক: নওগাঁ প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন