অন্য চোখে

ওয়ালপেপারের সামনে

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০১৯     আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নটিংহাম থেকে

পাঁচশ' প্রজন্ম পর কেউ আমি দাঁড়িয়ে আছি এখানে। এই পাথরগুলোর সামনে। আশ্চর্য এক অনুভূতি। কল্পনায় ফিরে যাওয়া পাঁচ হাজার বছর আগে সেই তাম্র যুগে। আমাদের পূর্বপুরুষের করে যাওয়া এক কীর্তি স্টোনহেইঞ্জের সামনে। পঁচিশ টনের একেকটি পাথর কীভাবে তুলেছিলেন তারা, নির্মাণ করেছিলেন এই ভাস্কর্য। কী কথা এঁকে রেখেছিলেন তারা এই দেয়ালে? কাউকে কি কিছু জানাতে চেয়েছিলেন? কোনো দেবতার আরাধনার বেদি? নাকি অভিশপ্ত কোনো কালের সাক্ষী? সর্বজনস্বীকৃত কোনো উত্তর নেই এই কৌতূহলগুলোর। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাইড বাণিজ্যিক হাসিতে মুখস্থ যে তথ্য জানালেন, তা ওই উইকিপিডিয়া থেকেই পড়ে আসা।

মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্যের এক আশ্চর্য ইংল্যান্ডের এই স্টোনহেইঞ্জ। খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার থেকে দুই হাজার বছর- এই সময়ের মধ্যে নির্মিত এই পাথর ভাস্কর্য। যার চারপাশ দিয়ে রয়েছে পরিখা ও গুপ্ত গুহা। লোকে বলে, এখান থেকেই নাকি ইংল্যান্ড শুরু হয়েছিল। এটাই ইংল্যান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর ২১ জুন যে দিনটি সবচেয়ে 'বড়', সেদিন ঠিক দুপুর ১২টায় স্টোনহেইঞ্জের ঠিক মাথার ওপর সূর্য খাড়া হয়ে থাকে এবং ধুধু চরাচরে ছড়িয়ে-ছটিয়ে থাকা পাথরগুলোকে বার্ডস আই ভিউয়ে দেখলে নাকি সৌরজগতের আদলে গোলাকার মনে হয়। পাশে দাঁড়ানো কোনো কোরিয়ান পরিবার খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন ওই গাইডের কথাগুলো; কিন্তু আমার মনের মধ্যে তখন শুধুই একটি ছবি, সেই কলেজে পড়ার সময়ে ছোটভাইয়ের সঙ্গে যখন প্রথম কম্পিউটারের শরিকি মালিক হলাম, তখন দেখাচেনা সেই ছবিটিই এটি- স্টোনহেইঞ্জ। পাথরের মাথায় পাথর সাজিয়ে গোলাকার এক বেদি। তখন চিনতাম না, উইন্ডোজ নাইনটি সেভেনের গ্যালারি বক্সে যে ছয়টি ছবি ছিল, তার মধ্যে কেন জানি আমার এই পাথরের প্রাচীন ভাস্কর্যটিই আমার পছন্দ ছিল। আমার ভাইয়ের পছন্দ ছিল অবশ্য কানাডার ম্যাপেল বাগানের অন্য ছবিটি।

এবার ইংল্যান্ডে আসার আগেই পর্যটক মনে দুটি ইচ্ছা লালন করে এসেছিলাম। এক, লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ। দুই, স্টোনহেইঞ্জ। লন্ডনে থাকার সময় টাওয়ার ব্রিজের সামনে সেলফি তুলে ফেসবুকে লাইক পেয়েছি ঠিকই; কিন্তু দুই ঘণ্টার অপেক্ষার পরও দেখতে পারিনি জাহাজ আসার সময় দু'ভাগ হয়ে যাওয়া ব্রিজের সেই অপূর্ব দৃশ্যটি। স্টোনহেইঞ্জ দেখার প্ল্যানটা অবশ্য টনটন থেকে ছিল না। ছিল সাউদাম্পটন থেকে। কেননা ওই শহর থেকেই স্টোনহেইঞ্জ যেতে কম সময় লাগে। কিন্তু গোছানো কাজ এলোমেলো করে বিশ্বকাপ কভার করতে আসা সাংবাদিকদের একটি দল। তার আগেই সেখানে গিয়ে সেলফি তুলে, গল্প লিখে হিট! প্রেসবক্সে এসেই সেই আশ্চর্য পাথরের গল্পকথা। কাঁহাতক ভালো লাগে, এমনিতেই টনটন হচ্ছে বাংলাদেশের সেই গ্রামের মতো, যেখানে সন্ধ্যা নামতেই রাতের খাবারের আয়োজন এবং ১০টাতেই মধ্যরাত (অবশ্য মোবাইলে ডাটা আর টেলিভিশনে স্যাটেলাইট চ্যানেল আসার পর এমন গ্রাম দেশেও নেই)। টনটন কিন্তু তেমনই, শান্ত আর নিরিবিলি। সূর্য এখানে ৯টায় ডুব দিলেও ১০টা নাগাদ শহরের সেন্টার রোডে বেরোলেও ঠিকানা জিজ্ঞাসার জন্য লোক পাওয়া যাবে না। কিন্তু ঢাকায় রিপোর্ট পাঠানোর পর পাক্কা পাঁচ ঘণ্টা হাতে পড়ে থাকে। রুমে বসে না থেকে সময়টা কাজে লাগানো দরকার। প্রস্তাবটি মনে ধরেছিল আমাদের গ্রুপটির, মানে ঢাকা থেকে আসা সাংবাদিকরা। আমরা যারা একসঙ্গে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম, এবারও সবাই রাজি, ঠিক হলো, চলো স্টোনহেইঞ্জ যাই।

গুগল ম্যাপ বলে দিল, মোটরগাড়িতে টনটন থেকে সারবেরির স্টোনহেইঞ্জের কাছে পৌঁছতে এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিট লাগবে। এরপর টনটনের একটি অ্যাপস জানিয়ে দিল, যেতে-আসতে পাক্কা ২০০ পাউন্ড (বাংলাদেশি টাকায় ২৫ হাজার)! শুনেই ঢোক গেলার মতো ব্যাপার। অগত্যা 'বিপদে ফোন দেবেন' বলে কার্ড দিয়ে যাওয়া সিলেটের সেই বাবুল ভাই। তেল খরচটা আমরা দেব- বলে প্রস্তাব দেওয়া। এরপর সময় বের করে নেওয়া নেক্সট মানডেতে।

একদিন অপেক্ষা করে সেই মানডেতেই রওনা হলাম আমরা ক'জন সপ্তাশ্চর্যের এক আশ্চর্য দেখতে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ার কান্ট্রির অন্তর্ভুক্ত এ এলাকাটি। এখানকার লোকেরা বলে, ব্রিটিশ মিলিটারির সবচেয়ে বড় ট্রেনিং ঘাঁটি এখানে। তবে তার ধারেকাছে লোক ঘেঁষতে পারে না। এই অঞ্চলে বাড়িঘরও বেশ কম। টনটন থেকে গাড়িতে যেতে যেতে অপূর্ব সেই দৃশ্য। টিলার গা জুড়ে গম খেতের সারি, সবুজের মাঝে হঠাৎই কোথাও লালের ছড়াছড়ি। পপি ফুলের বাগান। গাড়িতে পুরনো দিনের হিন্দি গান বাজিয়ে বাবুল ভাইয়ের ধারাভাষ্য- এখানে বলিউডের একটা ছবির শুটিং হয়েছিল। সেবার শাহরুখ এসেছিল এখানে। স্টোনহেইঞ্জে কিছু হলিউড মুভিরও নাকি শুটিং হয়েছে। যেতে যেতেই রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে স্ট্রবেরি আর চেরি কিনে নেওয়া। চার বক্স পাঁচ পাউন্ড। ক্যারাভ্যানের মতো গাড়ি পার্ক করে বয়স্ক দোকানির দাবি- এটা তার বাগানের সদ্য ছিঁড়ে আনা তাজা ফল। ভীষণ মিষ্টি। মিথ্যা বলেননি তিনি। ঢাকার স্ট্রবেরি খাওয়া জিভ নিমিষেই লুফে নিল ইংলিশ চেরি আর স্ট্রবেরি।

দেড় ঘণ্টা লাগল সেখানে পৌঁছতে। ২৩ পাউন্ড দিয়ে টিকিট কেনার পর কাউন্টার থেকে বিনয়ী সুর- ৬টায় আমাদের শেষ শাটল বাস ছাড়বে, আপনাদের হাতে আছে মাত্র ৪০ মিনিট। ওটুকুই যথেষ্ট, শুরুর আধঘণ্টাই বেরিয়ে গেল সবার সেলফি আর ভিডিও কল করতে। বাকি দশ মিনিট ইতিহাসের গা স্পর্শ করা। স্টোনহেইঞ্জের মূল বেদিতে যেতে যেতেই ওক গাছের সারি, ধুধু মাঠের মাঝে একমনে ঘাস চিবিয়ে যাওয়া গরুর পাল, গম খেতে শালিকের মতো এক ধরনের পাখির কোলাহল- সব মিলিয়ে মেকআপ ছাড়া ইংলিশ গ্রামের আদি মুখ। চারদিকে ধুধু প্রান্তর, চরাচর জুড়ে মুখ লুকানো সূর্যের লাজুকতা। ঘোর ভাঙাল গাইডের হাঁক শুনে- আমাদের এখনই শাটল বাসে ফিরতে হবে, ৬টা বাজতে আর মাত্র তিন মিনিট। এবার পা চালাতেই হয়...।