ডুলির ‘রক্ষণ বিলাসে’ বিভ্রান্ত দল
থমাস ডুলি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৮
আসিয়ান কাপের মঞ্চে মালয়েশিয়ার কাছে হার স্রেফ একটা পরাজয় নয়, বরং যেন আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া– আধুনিক ফুটবলে কেবল ‘ঘর বাঁচানোর’ আদিম মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। থমাস ডুলি দল নামিয়েছিলেন একটা অভেদ্য দুর্গ গড়তে। কিন্তু অতিমাত্রায় রক্ষণাত্মক সেই দুর্গের দেয়াল যখনই নড়বড়ে হলো, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল মাঝমাঠ আর আক্রমণভাগ।
যখন মাঝমাঠে সোহেল রানা বারবার মিস পাসের মহড়া দিচ্ছেন কিংবা ভয়ার্তের মতো ব্যাক পাসে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন, তখন ডুলি মাঠ থেকে তুলে নিলেন কিনা ছন্দে থাকা শমিত সোমকে! নবাগত শুকির তারুণ্যের বারুদে ভরসা না রেখে ফাহমিদুলকে খেলানো হলো অচেনা পজিশনে, আর উইংয়ে বোতলবন্দি হয়ে রইলেন গতিহীন রাকিব। ভুল পজিশনিং, ভুল খেলোয়াড় বদল আর অতি-রক্ষণাত্মক ফরমেশনের এই আত্মঘাতী ককটেল বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকেই ছিটকে দিল।
আসিয়ান দলগুলোর সঙ্গে র্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্যের কথা বলে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই ‘সম্মানজনক হার’-এর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ডুলি। অথচ সেদিনই ১৩৮ র্যাঙ্কিংয়ের দল ভারত কিনা বিশ্বকাপ খেলা ৪১ র্যাঙ্কিংয়ের পানামার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে। যদি হামজারা ভারতকে হারাতে পারে, তাহলে তাদের চেয়ে র্যাঙ্কিংয়ে দুই ধাপ এগিয়ে থাকা মালয়েশিয়ার সঙ্গে কেন পরাজয়ের মানসিকতা ডুলির! তাঁর এই ‘কৌশল-বিভ্রাট’ নিয়ে এখন ফুটবলপাড়ায় যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, আজ বাদে কাল সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অন্তত তা নেভানো সহজ হবে না।
থমাস ডুলির কৌশল বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, তিনি মালয়েশিয়ার বিপক্ষে আধুনিক ফুটবলের ‘লো ব্লক’ বা অতি-রক্ষণাত্মক কৌশলের ওপরই অন্ধ ভরসা রেখেছিলেন। লো ব্লকের মূল শর্তই হলো– বল কেড়ে নেওয়ার পর গতিশীল কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়া। কিন্তু ডুলির ছকে মাঝমাঠ আর আক্রমণভাগের কোনো সমন্বয়ই ছিল না। দল নিচে নেমে আসায় রক্ষণভাগের ওপর যেমন অতিমাত্রায় চাপ বেড়েছে, ঠিক তেমনি মাঝমাঠে সৃষ্টি হয়েছিল বিশাল শূন্যতা।
শমিত-হামজার মতো মিডফিল্ডাররা বলের জোগান পাননি। আর যখনই পেয়েছেন, ‘মিড ব্লক’ বা ‘হাই প্রেসিং’ ফুটবলের গতি সামলাতে না পেরে সোহেল রানাদের পা থেকে বেরিয়েছে একের পর এক মিস পাস ও ভয়ার্ত ব্যাক পাস। নিউইয়র্ক কসমসে ছন্দে থাকা শমিতের মতো একজন খেলোয়াড়কে শেষ পর্যন্ত বদল করা হলো। অথচ তাঁর কাছে বল সাপ্লাইই ছিল না। যেখান থেকে বল সাপ্লাই আসার কথা, সেই জায়গায় সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সেখানে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সবচেয়ে বেশি ভুল পাস দিলেও ৯০ মিনিট সোহেলকে খেলালেন ডুলি। অথচ সেখানে সোহেল রানা জুনিয়র, হৃদয় কিংবা জামাল ভূঁইয়াদের যে কাউকে নামাতে পারতেন কোচ।
এই ম্যাচটির আগে শাকিল আহাদ তপুসহ জাতীয় দলের স্থানীয়রা অন্তত তিন মাসের মতো ফুটবল থেকে বাইরে ছিলেন। এরপর এক মাসের মতো ক্যাম্প। অথচ মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ডিফেন্ডার তপুর ফিটনেস জড়তা চোখ এড়ায়নি কারও। তাঁর জায়গায় মানিক কিংবা জিদানকে খেলানো যেত। তপু পরপর দুইটা ভুল করে নিজেই ঘাবড়ে গেছেন, তারপরও তাঁকে মাঠে রেখে দেওয়া হলো। ম্যাচের একটা বড় সময় তপু যখন বারবার ভুল পাসে বল হারাচ্ছিলেন, তখন অনেক বেশি চাপ গিয়ে পড়েছিল জায়ানের ওপর। অথচ ডানপ্রান্তে সাদ আর তারিক যেভাবে অ্যারিয়াল ও গ্রাউন্ড ডিফেন্ডিং দিয়ে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন, সাদের পা থেকে যখন সোহেল কিংবা রাকিবের উদ্দেশে চমৎকার কিছু পাস বেরোচ্ছিল– তখনই মাঝমাঠে যেন মড়ক লেগেছিল!
সোহেল বারবার ক্যাজুয়াল ফুটবল খেলে বল উপহার দিলেন প্রতিপক্ষকে। মালয়েশিয়ার ধুরন্ধর বার্গসন আর আইমানরা তো বোকা নন; তারা তপুর এই দুর্বল বাঁ দিককে পাখির চোখ করে একের পর এক কামড় বসাতে শুরু করল। ফলে ফারহানের সঙ্গে সমন্বয় করে জায়ানের অফেন্সিভ উইংব্যাক হিসেবে ওপরে ওঠার স্বপ্নটা শুরুতেই মারা গেল। বাঁ-প্রান্ত থেকে যদি বলই না ওঠে, তবে মাঝমাঠ তো অকেজো হতে বাধ্য। শমিত সোমের মতো মিডফিল্ডার ম্যাচজুড়ে স্রেফ বলের জন্য হাহাকার করে গেলেন।