নতুন প্রস্তাবিত অর্থবছরের বাজেট (২০১৫-১৬) অনেক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই আলোচনার খুব কম অংশই বাজেটে নারীর অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারীর উন্নয়ন অপরিহার্য। প্রস্তাবিত বাজেটে নারীদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কারণ নারীরা এমনিতেই পিছিয়ে আছে, সুতরাং তাদেরকে এক ধরনের অনুকূল বৈষম্যের সুবিধা দেওয়া উচিত। নারীকে আরও বেশি সফলতা অর্জনে সহায়তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন; যেমন_ বর্তমানে দেশের নারী সমাজের একটি বিরাট অংশ সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু চিকিৎসা পান না, যা মা এবং শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ। প্রায় ৬২ শতাংশ নারী নিজ গৃহে প্রশিক্ষণবিহীন ধাত্রী কর্তৃক সন্তান প্রসবে সহায়তা পেয়ে থাকেন। প্রস্তাবিত বাজেটের মাধ্যমে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে যাতায়াত খরচ এবং ওষুধপত্রের খরচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে প্রতিটি মাকে সর্বনিম্ন ৩০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। নারীবান্ধব কর্মে যেমন, চিকিৎসা অথবা শিক্ষকতায় নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে চাকরিদাতাদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে, যেমন কর হ্রাস করা যেতে পারে। তৈরি পোশাক খাতে বাড়তি কর আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু যেসব কারখানায় ডে-কেয়ারসহ নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ক ব্যয় আছে, সেগুলোকে কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাট বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বাড়তি কর সংযোজন তাদের ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। ট্রেড লাইসেন্সের খরচ নারীদের জন্য অর্ধেক করে দেওয়া এবং ব্যাংকের সুদের ক্ষেত্রে নারীদের কমপক্ষে ৩ শতাংশ সুদ কম করা যেতে পারে।
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বাজেটে স্থানীয় সরকারকে ওয়ার্ডভিত্তিক প্রতিরোধ কমিটি পরিচালনা করার জন্য বরাদ্দ করতে হবে। প্রতি ইউনিয়নের জন্য ৪ লাখ টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা ৯০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব। কর্মজীবী নারীদের ৫ বছরের নিচের শিশুসন্তান দেখাশোনা করার জন্য 'বেবি-সিটার' নিয়োগের লক্ষ্যে সরকারের মাধ্যমে ভাতা প্রদান করা হলে চাকরিজীবী মায়েদের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেকার দুস্থ নারীদের কর্মসংস্থান হবে। এসিডদগ্ধ এবং যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের সমাজে পুনর্বাসনের জন্য কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে। গৃহভিত্তিক কর্মসংস্থান, যেমন আউটসোর্সিং, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কুটির শিল্পে নারীদের কর্মক্ষম করার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে অঞ্চলভিত্তিক এবং ট্রেডভিত্তিক আরও বেশি বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।
প্রকল্প পরিচালকদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ নারীরা তুলনামূলকভাবে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্পাদিত কাজে বাধ্যতামূলকভাবে নারী নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্যথায় তাদেরকে অতিরিক্ত করারোপ করা যেতে পারে।
ক্রীড়া খাতে নারীদের জন্য বরাদ্দ পুরুষের সমান করা যেতে পারে। সম্পত্তির ওপর কর বাড়ানো হলে পুরুষরা নারীদের নামে বেশি পরিমাণ সম্পত্তি রাখবেন, যা সামাজিক বৈষম্য হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। পুরুষদের দ্বিতীয় বিয়ের ওপর মোহরানার সমান বা সর্বনিম্ন কর আরোপ করা যেতে পারে। নিঃসন্তান বিধবাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ এ ধরনের নারীরা স্বামীর বা বাবার বাড়ির কোথাও কোনো আশ্রয় পান না।
স চেয়ারম্যান, বিআইএসআর

মন্তব্য করুন