পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা। এটি যেহেতু পার্বত্য এলাকা তাই এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু তারা কি একইভাবে পাহাড়ে বাস করে? এর মধ্যে এক গোষ্ঠী থেকে আরেক গোষ্ঠীর কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে? বস্তুত একটি নৃগোষ্ঠী কীভাবে বসবাস করে, তার সঙ্গে তার উৎপাদন সংগঠন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে এসব নৃগোষ্ঠীকে তিনভাবে বসবাস করতে দেখা যায়। কেউ পাহাড়ের সর্বোচ্চ পর্যায়, কেউ পাহাড়ের মাঝামাঝি আবার কেউ পাহাড়ের পাদদেশে। যেমন, ত্রিপুরা পাহাড়ের চূড়ায়, চাকমা পাহাড়ের মাঝামাঝি ও মারমারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে। ত্রিপুরারা এক পাহাড়ে একটি পরিবার, চাকমারাও প্রায়শ এক পাহাড়ে একটি পরিবার এবং মারমারাও প্রায় এক পাহাড়ে একটি পরিবার বসবাস করে।
উৎপাদন সংগঠনের দিক থেকে দেখা যায়, যদি সে উৎপাদন সংগঠনের জন্য পাহাড়ের চূড়াকে বেছে নেয় যেমন, জুম চাষসহ নানাবিধ ফসল ফলায়, আবার চাকমারা পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় জুমসহ বিভিন্ন ফসল_ যেমন আনারস, হলুদ ইত্যাদি ফলায়। আবার মারমারা পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্ন ফসল ফলায়, যেমন কলাগাছ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফসল। তবে যারা পাহাড়ের পাদদেশে থাকে তারা গবাদিপশুও লালন-পালন করে। এ জন্য তারা পাহাড়ের পাদদেশে থাকে। তাদের মধ্যে 'একটি পরিবার একটি খামার রীতি' লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ উৎপাদন সংগঠনের জন্য যে খামার তৈরি করা হয় তা পরিবারের শ্রমশক্তির ক্ষমতা অনুযায়ী। তাদের মধ্যে তাই ভাড়াটে শ্রমিক ব্যবহারের তেমন কোনো রীতি গড়ে ওঠেনি কিংবা সমবায়ী শ্রম ব্যবহারও দেখা যায় না।
বসতি স্থাপনের এই চিত্র বেশকিছু প্রশ্নের উদ্রেক করে। যেমন, এই বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করার ফলে প্রতিটি পরিবার একেকটি উৎপাদন ও ভোগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকে। অর্থাৎ তারা যা উৎপাদন করে সেটি কেবল তাদের ভোগের জন্য; কদাচিৎ তা বিক্রয়ের সুযোগ পায়। বাসস্থানটি এলাকার বাজার থেকে অনেক দূরে বিধায় সেখানে উৎপাদিত ফসল অনেক কষ্ট করে নিয়ে যেতে হয় এবং তার প্রতিযোগিতামূলক মূল্য পেলেও ন্যায্যমূল্য পায় না। ফলে তাদের উদ্বৃত্ত সৃষ্টির সুযোগ থাকে না। আর যদি না থাকে তাহলে তাদের মানবসম্পদ সৃষ্টি তথা শিক্ষার মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। তাই এ ধরনের একটি পরিবারকে যুগের পর যুগ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয় এবং পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটানোর কোনো সহজ সুযোগ নেই। এদের জীবনধারা হয় খোরাকিভিত্তিক অর্থনীতির (সাবসিসট্যান্স)। এদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ একেবারেই সীমিত।
উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ যেমন কম তেমনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগও কম। প্রতিটি পরিবার বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করার ফলে যে সুবিধা পায় তা হচ্ছে তাদের মধ্যে সম্পত্তিগত দ্বন্দ্ব তেমন নেই, পরস্পরের সঙ্গে বাদ-প্রতিবাদে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ তেমন নেই, একে অন্যের ব্যাপারে নাক গলানোর সুযোগ নেই। পরচর্চা বা পরনিন্দার সুযোগ তেমন নেই। একের সম্পত্তি অন্যে চুরি করার ঘটনা তেমন নেই। ফলে ব্যক্তি বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করার সুযোগ তেমন নেই, প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক।
আবার একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক বিশেষ করে ধর্ষণ তাদের মধ্যে নেই। কারণ যেহেতু প্রতিটি পরিবার আলাদা একটি টিলায় বসবাস করে, তারা নিজেদের একটি সার্বভৌম জায়গায় থাকে। তারা পরস্পর শ্রদ্ধাশীল হয়ে বসবাস করে। নারীদের এখানে সম্মান দেখানো হয়। মুরংদের মধ্যে টপলেসও থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি পাহাড়ি মেয়েকে বাঙালিরা ধর্ষণ করার কথা শোনা গেলেও কোনো বাঙালি মেয়েকে পাহাড়িদের ধর্ষণ করার খবর পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে ইভ টিজিং নেই। কারণ তারা পরস্পরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
গোষ্ঠীগত সম্পর্কের দিক থেকে দেখা যায়, তারা হেডম্যান ও কারবারীদের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে বসবাস করে। এই হেডম্যান বা কারবারীদের সঙ্গে সম্পর্কটি নিবর্তনমূলক নয়। হেডম্যান ও কারবারীরা কেবল খাজনা সংগ্রহসহ কয়েকটি বিষয়ে তত্ত্বাবধায়কের সম্পর্ক গড়ে তোলে; ভেদাভেদের সম্পর্ক নয়। তারা রাজার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। ফলে তারা নিজেরা রাজার কর্তৃত্ব প্রদর্শন করে না।
তাদের মধ্যে মর্যাদাগত বৈষম্য রয়েছে, তবে তা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নয়; পরিবারকেন্দ্রিক। সমতল ভূমির লোকেরা যেমন প্রধানত গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বসবাস করে; তারা সেভাবে করে না। কেবল শহর এলাকায় একই গোষ্ঠীর লোকেরা একই জায়গায় বসবাস করতে দেখা যায়। তারা কৃষক তবে কৃষি উৎপাদনের জন্য লাঙ্গল, গরু বা ঘোড়া ব্যবহার বা কলের লাঙ্গলের কোনো চাষ নেই। বলতে গেলে তার কোনো সুযোগ নেই। তাদের খামারের আয়তন মাত্র কয়েক শতক। ইদানীং তারা কিছু জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বনজ গাছ লাগাচ্ছে এবং তা থেকে ভালো আয় সম্ভব হচ্ছে। যেমন, যেখানে তারা সেগুন গাছ লাগাচ্ছে সেখানে মাত্র তিন বছর বয়সের একটি সেগুন গাছের কাঠ ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারছে। সেখানে যদি ২-৩ হাজার চারা লাগাতে পারে; মাত্র তিন বছরে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে। এটি এখানে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে না। তাই তারা খামারের মতো চাষ করলেও খামারির মতো চাষ করার সুযোগ তেমন নেই। তাদের মধ্যে কোনো রকমের বর্গাদারি, জমি বন্ধক বা জমিভিত্তিক শ্রমিক ব্যবহারের নিয়মও গড়ে ওঠেনি। ফলে একজন আরেকজনকে শোষণ করার নিয়মটি তৈরি হয়নি। শহর এলাকার চিত্র এ থেকে কিছুটা ভিন্ন। এখানে আবার অনেকে বিভিন্ন ব্যবসার মাধ্যমে বেশ কিছু অর্থের মালিক হয়েছে। অনেকে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত হচ্ছে। নারীদের মধ্যে ক্ষুদ্র্র ব্যবসায়ী হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সেই সেবা কবে নাগাদ তারা পেতে পারে, তাও অনুমান করা কঠিন। তারা তেমন কোনো সমবায়ভিত্তিক দলেরও সদস্য নয়।
বিভিন্ন স্থানে কিছু স্কুল গড়ে উঠেছে, যেখানে শিশুরা যায়, তবে তা এখনও ব্যাপকভাবে দেখা যায় না। সেবা প্রদানকারী যেমন নেই, তেমন সেবা গ্রহণকারীর চাহিদাও তেমন নেই। তাই এলাকাজুড়ে সেবার জন্য কিছুটা অবকাঠামো গড়ে উঠলেও সেবা-কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সেটি তৈরি হতে অনেক সময় লাগবে।
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব
সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

মন্তব্য করুন