অপহৃত মাইকেল চাকমার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন চাই

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯      

আকমল হোসেন, সুলতানা কামাল, স্বপন আদনান, শাহ্‌দীন মালিক শহিদুল আলম, আনু মুহাম্মদ, রেহনুমা আহমেদ, সারা হোসেন হাসনাত কাইয়ুম, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও ওমর তারেক চৌধুরী

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে সক্রিয় মাইকেল চাকমা দীর্ঘ এক মাস সাত দিন ধরে 'নিখোঁজ' থাকায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে তার মুক্তির বিষয়ে সমবেতভাবে কিছু বলতে চাই। মাইকেল চাকমা আমাদের অনেকের কাছেই একটি সুপরিচিত ও প্রিয় মুখ। বিভিন্ন ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে মৃদুভাষী ও বিনীত রাজনৈতিক সংগঠক মাইকেল আমাদের কারও কারও কাছে সহযাত্রী ও আপনজন হয়ে উঠেছেন। তিনি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আন্দোলনের একজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী নন; দেশের নানা স্থানের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে মাইকেল প্রতিবাদে সোচ্চার একজন সচেতন ব্যক্তি। তার পরিচিতি হিসাবে বলা প্রয়োজন যে, মাইকেল পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈধ রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সংগঠক, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাবেক সভাপতি এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কার্যকরী পরিষদের সদস্য। উপরন্তু তিনি শ্রমজীবী ফ্রন্ট (ইউনাইটেড ওয়ার্কার্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) নামের একটি শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। তার কর্মতৎপরতার এসব দিক বিবেচনা করে আমরা মনে করি, গত ৯ এপ্রিল থেকে মাইকেল চাকমার 'নিখোঁজ' হওয়ার ঘটনাটি কোনো অরাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিষয় নয়। রাজনৈতিক কারণে এই 'নিখোঁজ' হওয়ার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে বলে অনেকেই আশঙ্কা বা ধারণা করছেন এবং এ কারণেই তাকে খুঁজে বের করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনো তৎপরতা ও সহযোগিতার লক্ষণ এখনও দৃশ্যমান নয়। মাইকেল চাকমার অনুসন্ধানের জন্য আমরা সংশ্নিষ্ট থানার কাছ থেকে আশু ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করি।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাহাড়ি জনগণের বৈসাবি উৎসব ও রানা প্লাজা ধ্বংসযজ্ঞ দিবস পালন সংক্রান্ত সাংগঠনিক কাজ শেষে গত ৯ এপ্রিল ২০১৯ দুপুরে ঢাকায় ফেরার জন্য নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে মাইকেল চাকমা রওনা হয়েছিলেন। আনুমানিক বিকেল ৫টার পর থেকে পরিচিতজনের সঙ্গে মাইকেল চাকমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ওই সময়ের মধ্যবর্তীকালে মাইকেল চাকমার অপহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য থেকে আমরা জেনেছি, তার 'নিখোঁজ' হওয়ার বিষয়ে ১৬ এপ্রিল আত্মীয়ের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলে পুলিশ তাকে খোঁজার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ বিষয়ে ১৯ এপ্রিল পুলিশ জিডি (নম্বর ৭৭২) গ্রহণ করলেও অনুরোধ সত্ত্বেও বাদীকে কোনো প্রাপ্তি স্বীকারমূলক কাগজ দেয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রাপ্তি স্বীকারের রসিদ সংগ্রহ করতে গেলে পুলিশ জিডি গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে। জিডির বিষয়টি অস্বীকার করার পর বাদী পুনরায় জিডি করতে চাইলে তা করতে না দিয়ে বরং পুলিশ কর্মকর্তা বাদী ও সংশ্নিষ্টদের নানাভাবে এড়িয়ে চলছে বলে সংশ্নিষ্টদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে। মাইকেল চাকমা 'নিখোঁজ' হওয়ার বিষয়ে সোনারগাঁ থানা পুলিশ তার স্বজনদের কার্যত কোনো অভিযোগ দায়ের করতে দেয়নি বলেও তারা বলছেন। ঘটনা সম্পর্কে প্রাথমিক অভিযোগ দায়ের করতে পুলিশের কথিত অসহযোগিতা আইনি অধিকারের লঙ্ঘন এবং একজন নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের পথে নিস্পৃহতা বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। অবশেষে, মাইকেল চাকমার সন্ধানে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় আগত তার বড় বোন সুভদ্রা চাকমাসহ চারজন থানায় গেলে থানার কর্মকর্তা কোনো সহযোগিতা করা বা তথ্য দেওয়ার বদলে উল্টো তাদের বলেন, 'আপনারা খুঁজছেন কিনা? মাইকেল চাকমার মামলা আছে, তাই হয়তো কোনো সংস্থার হাতে গ্রেফতার হতে পারে।' অভিযোগ গ্রহণ করতে পুলিশের নির্লিপ্ত আচরণ সত্য হলে তাকে আমরা আইনের নিন্দনীয় ব্যত্যয় বলে মনে করি। এই অবস্থায় ধারণা করা যায় যে, মাইকেল চাকমা নিখোঁজ হননি, বরং পুলিশের মৌখিক ভাষ্যমতেই কোনো অজ্ঞাত মহল তাকে নিয়ে গেছে বলে স্থানীয় থানা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে অসহযোগিতা করছে ও নিষ্ফ্ক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। অথবা এসব কথা বলে থানার কর্মকর্তারা হয়তো নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। এসব বিষয় থেকে আমাদের আশঙ্কা, মাইকেল চাকমা অপহরণ ও গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। এমতাবস্থায় আমরা মাইকেল চাকমার সুস্থতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত। আমরা আশা করি, সংশ্নিষ্ট থানা অনতিবিলম্বে বাদীদের আইনসম্মতভাবে অভিযোগ জানাবার সুযোগ দিয়ে দ্রুত তদন্ত শুরু করতে উদ্যোগ নেবে। নয়তো তাদের নিষ্ফ্ক্রিয়তা জনমনে ভুল ধারণার সৃষ্টি করবে, যা কারও কাছে কাম্য নয়।

আমরা মনে করি, মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে কোনো গোপন বা বেআইনি পদক্ষেপের বদলে সে ব্যাপারে অনতিবিলম্বে যথাযথ ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার। কোনো গোপন আটকের বদলে তাকে থানা বা আদালতে সোপর্দ করার মতো আইনি ব্যবস্থার সামনে হাজির করা হোক। একই সঙ্গে মাইকেল চাকমার জন্য আইনজীবীর সহায়তা নেওয়ার মতো আইনি অধিকারগুলো নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা বিবেচনা করি। সংশ্নিষ্ট থানার পুলিশ যেহেতু অসহযোগিতা ও নিষ্ফ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করে চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে; তাই আমরা এই লেখার মাধ্যমে মাইকেল চাকমাকে খুঁজে বের করা, তার নিরাপত্তা ও আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোর প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

দেশে ক্রমবর্ধমান হারে আইনি প্রক্রিয়াকে ভঙ্গ করে জোরপূর্বক অপহরণ, গুম, গুপ্ত ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ আকার নিচ্ছে, মাইকেল চাকমাকে আমরা সেই সর্বনাশা মিছিলের আরেকটি সংখ্যা বা মুখ হিসেবে দেখতে চাই না। নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বার্থে আমরা অনতিবিলম্বে মাইকেল চাকমাসহ অপহৃত ও গুম করে রাখা সব ব্যক্তির নিরাপদ ও সুস্থ প্রত্যাবর্তন দাবি করছি এবং দেশে ক্রসফায়ারের নামে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, গুম ও আটক বাণিজ্য বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।

লেখকবৃন্দ যথাক্রমে প্রাক্তন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী ও সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার; প্রাক্তন শিক্ষক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুর; আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; আলোকচিত্রী; শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; নৃতাত্ত্বিক, গবেষক ও লেখক; আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট ও লেখক-অনুবাদক