করোনার প্রভাবে তৈরি পোশাক খাতের ২৩২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা মোট কারখানার ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারিয়েছেন তিন লাখ ৫৭ হাজার শ্রমিক, যা পোশাক খাতের মোট শ্রমিক সংখ্যার ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক জরিপে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। জরিপের ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল এক সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, সেন্টার ফর এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিএডি) ও ম্যাপড ইন বাংলাদেশ এর সহায়তায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অক্টোবর থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে নমুনার ভিত্তিতে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের ৬১০টি কারখানায় জরিপ চালানো হয়। জরিপে অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ৫৪ শতাংশ ক্ষুদ্র, ৪০ শতাংশ মধ্যম ও ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বড় আকারের কারখানা।

গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জম। তিনি বলেন, কভিডকালে এক-তৃতীয়াংশ ক্ষুদ্র কারখানা আংশিক বন্ধ ছিল। নারী শ্রমিকের উপস্থিতি কমে ৩৩ শতাংশ। ৫০ শতাংশ কারখানায় হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতা কাজ করেছেন। অসংগঠিত কারখানায় আর্থিক সংকট প্রকট ছিল। দুঃখজনকভাবে এসব কারখানাকে সরকারের প্রণোদনার ঋণের আওতায় রাখা হয়নি।

জরিপে বলা হয়, কভিডকালে ছোট কারখানা বেশি সংকটে ছিল। এই মানের ৫৩ শতাংশ কারখানা অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ এবং সঞ্চয় ভেঙে ব্যয় মিটিয়েছে। মাত্র ৪০ শতাংশ ছোট কারখানা প্রণোদনা ঋণের জন্য আবেদন করেছে। যেখানে বড় কারখানার ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৯০ শতাংশ।

সিপিডির সুপারিশে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক খাতের পুনরুদ্ধারে বিদেশি ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে ন্যায্য বাণিজ্য চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। বড় কারখানার তুলনায় ছোট কারখানার পুনরুদ্ধারের গতি অনেক ধীর। ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ না দিলে এসব কারখানার কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে। মূল্য সরবরাহ চেইনে সহজে প্রযুক্তির ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রেও ব্র্যান্ড এবং ক্রেতাদের আরও ইতিবাচক হতে হবে।

সংলাপে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে ঝুঁকির বোঝা একতরফাভাবে কেবল উৎপাদক দেশকেই নিতে হয়, যা অর্থনীতির কোনো নীতিতেই পড়ে না। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বোঝাপড়া এবং দরকষাকষিতে ঘাটতি আছে। তিনি বলেন, ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করার পর কত টাকা বেগমপাড়ায় গেছে এবং কত টাকা শিল্পের সংকটকালে ব্যয় হয়েছে, তার একটা গবেষণা থাকা দরকার।

শিরীন আখতার এমপি বলেন, কভিডের সময়ে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেও পোশাক খাত আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে আপৎকালীন সময়ের জন্য শিল্পের সক্ষমতা আরও বাড়ানো খুব জরুরি। বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেশিরভাগ শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় দলিল না থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা হয়। এই প্রক্রিয়া আরও সহজ করার কথা বলেন তিনি। বিজিএমইএর পরিচালক আবদুল মোমেন বলেন, ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ বাতিল করলে প্রতিকার নেওয়ার আপাতত কোনো ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় বীমা করা প্রয়োজন।

জরিপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সংলাপ সঞ্চালনা করেন ম্যাপেড ইন বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সৈয়দ হাসিবুদ্দিন হাসিব। গবেষক, শিক্ষাবিদ ও শ্রমিক নেতারা সংলাপে অংশ নেন।

মন্তব্য করুন