ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বাড়ছে বৈষম্য

উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বাড়ছে বৈষম্য

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৭:৪২ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৮:১১

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাড়ছে উন্নয়ন বৈষম্য। ১ শতাংশ ধনীর বিরুদ্ধে চলছে বাদ বাকি ৯৯ শতাংশের লড়াই। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এক টাকার কাজে তিন টাকা খরচ হয়। বাকি দুই টাকা যাচ্ছে সুযোগ সন্ধানীদের পকেটে। বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় আয়ের এই অর্থ পাচার হচ্ছে। গতকাল সোমবার এক ওয়েবিনারে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন অর্থনীতিবিদরা। 'বাংলাদেশের ৫০ বছর :অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও শিক্ষা' শিরোনামে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, করোনায় নতুন করে দারিদ্র্যসীমায় নেমে আসা মানুষদের কী কৌশলে দরিদ্রদশা থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে, সে উদ্দেশ্যে কার্যকর কোনো কৌশল নেই। পুঁজির সরবরাহ, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও নগদ সহায়তা দেওয়া- এ তিন জায়গা হতে পারে শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে এসব জায়গার মধ্যেই রয়েছে দুর্বলতা। নতুন দারিদ্র্য ঠেকাতে এসব মানুষকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সবার জন্য সার্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আদলে ধনীদের কাছ থেকে শুল্ক্ক-কর আদায় করেই এ ব্যয় মেটাতে হবে। এম এম আকাশ বলেন, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এক টাকার কাজে তিন টাকা খরচ হয়। বাকি দুই টাকা যাচ্ছে সুযোগ সন্ধানীদের পকেটে। কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় আহরিত এ সম্পদ পাচার হচ্ছে। বেগমপাড়ায় চলে যাচ্ছে এসব সম্পদ। ফলে সারাবিশ্বের মতো এ দেশেও ১ শতাংশ ধনীর বিরুদ্ধে চলছে বাদ বাকি ৯৯ শতাংশের লড়াই।\হপল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বছরের শেষদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের তোড়জোড় চলে। এতে চুরির সুযোগ বেড়ে যায়। আবার কর আদায়ও ঠিকমতো হচ্ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত নেপালের চেয়েও কম। তিনি বলেন, এখন ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে দুর্নীতি এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে। অথচ স্বাধীন দেশে বৈষম্য কমানোর নীতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন- কে বাস্তবায়ন করবে? মুখে অনেক কথাই বলা হচ্ছে। কিন্তু মূল্যবোধের চরম অভাব রয়েছে। উন্নয়ন হচ্ছে, অন্যদিকে বৈষম্যও বাড়ছে। প্রসঙ্গক্রমে ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনায় তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে কোনো কাজ হয় না। অনেক সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছে মানুষ। তাই পিকেএসএফ গতানুগতিক ক্ষুদ্রঋণের ধারণা পাল্টে দিয়েছে মানব উন্নয়নের মাধ্যমে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ভালো পরিকল্পনা আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন সন্তোষজনক নয়। দক্ষ লোকবলের অভাবই এসডিজি বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।\হগবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান কর-জিডিপি বাড়াতে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, পরোক্ষ করের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। বৈষম্য কমাতে সুবিচারপূর্ণ বণ্টন কৌশলে যেতে হবে। সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। তা না হলে এক দেশে দুই অর্থনীতি চালু হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, করোনার পর যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনীতির দেশও সামাজিক নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ধকল সামলাতে অবশ্যই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যাদের সঙ্গে কোনো দেশের এফটিএ নেই। এ বিষয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আলোচনায় এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, শিক্ষিত বেকারত্ব এখন দেশের বিশাল একটা সমস্যা। অর্থনীতি পড়লে সবাই থিংকট্যাংক কিংবা ব্যাংকার হতে চায়। শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কারখানায় নেওয়া যায় না। এদের কীভাবে কারখানায় আনা যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো ড. সোহেলা নাজনীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×