ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরোপকারে ইসলামের শিক্ষা

ধর্ম

পরোপকারে ইসলামের শিক্ষা

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২২ | ১৯:৫৪ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০২

ইসলাম পরস্পরকে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। অন্য ভাইয়ের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা প্রদান করা প্রত্যেক মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। কাউকে কর্জে হাসানা দেওয়া কিংবা দান-খয়রাত করা অথবা কোনো কাজে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ। দুনিয়ার কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিংবা কারও উপকার করে বা দান করে খোঁটা দিলে ব্যক্তির দান-সদকা বা উপকার করার সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়। তা ব্যক্তির কোনো উপকারেই আসে না। এ বিষয়ে সাবধান করে মহান আল্লাহ সুরা আল-বাকারার ২৬৪ আয়াতে এরশাদ করেন :হে ইমানদারগণ! দানের কথা মনে করিয়ে খোঁটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করে দিয়ো না সে লোকের মতো, যে কিনা দান করে মানুষকে দেখানোর জন্য এবং আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে না। তার উদাহরণ হলো একটা বড় পাথরের মতো, যার ওপরে কিছুটা মাটির আস্তর জমে, কিন্তু তারপর ভারি বৃষ্টি এসে সব মাটি ধুয়ে আবার খালি পাথর রেখে যায়। সে যা অর্জন করল, তার কিছুই তার আর কাজে লাগল না। আল্লাহ তায়ালা অবিশ্বাসী লোকদের সঠিক পথ দেখান না।
আমরা অনেক সময় বলে থাকি- ভাই সাহেব, আপনাকে আমি অনেক দিন থেকে সাহায্য করে আসছি। এবার আপনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। আবার আমরা যাদের দান করি, তাদের নানাভাবে কষ্ট দিই। তাদের অভাবের কথা বারবার মনে করিয়ে দিই। তাদের আমরা যে উপকার করি, তা সুযোগ পেলেই জানান দিই। এসব কথা বলে আমরা আমাদের দানকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিই, যা করা আমাদের আদৌ উচিত নয়। উল্লিখিত আয়াতের শেষ অংশটি অত্যন্ত ভয়াবহ- 'আল্লাহ তায়ালা অবিশ্বাসী লোকদের পথ দেখান না।' অবিশ্বাসী বা কাফির শব্দটা খুবই কঠিন শব্দ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতে আমাদের শেখাচ্ছেন যে, যাদের কাছে দান করাটা লোক দেখানো কাজ, যারা মানুষকে দান করে তারপর কষ্ট দেয়, এরা আসলে আল্লাহকে এবং আখিরাতে বিশ্বাস করে না। কারণ যদি এরা আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাস করত তাহলে তারা কখনও এ কাজ করত না। আর যারা আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তারা হচ্ছে অবিশ্বাসী। এদের আল্লাহ তায়ালা পথ দেখাবেন না। যাদের আল্লাহ তায়ালা পথ দেখাবেন না, তাদের পরিণতি জাহান্নাম।
মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-বাকারার ২৬৫ আয়াতে আরও এরশাদ করেন, আর যে আল্লাহকে খুশি করার আশায় এবং নিজের বিশ্বাসকে মজবুত রাখার জন্য তার সম্পদ খরচ করে, তার উপমা হলো উঁচু ভূমিতে গাছে ঘেরা এক ঘন সবুজ বাগানের মতো, যেখানে ভারি বৃষ্টি হলে দ্বিগুণ ফলন হয়। আর ভারি বৃষ্টি যদি না-ও হয়, হালকা ঝিরঝির বৃষ্টিই তার জন্য যথেষ্ট। তোমরা যা কিছুই কর, আল্লাহ তার সব দেখেন। এ আয়াতে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইমানদাররা দান করেন তাদের অন্তরকে শক্তিশালী করার জন্য। নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ কাউকে দান করা কঠিন ব্যাপার। যখনই আমরা কোনো দান করার পরিস্থিতিতে পড়ি, তখনই মুহূর্তের মধ্যে আমাদের যাবতীয় সম্পদ, বিনিয়োগ এবং ঝুঁকির হিসাব মাথায় কাজ করে।


এ কারণেই যারা নিজের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়ে শেষ পর্যন্ত দান করতে পারেন, তাদের বিশ্বাস মজবুত হয়ে যায়; তাদের ইমান আরও সুদৃঢ় হয়। তাদের ভেতরে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। যেমন- আল্লাহ তায়ালার প্রতি আস্থা বেড়ে যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা আসে না, অমূলক ভয়-ভীতিকে তারা জয় করেন, নেতিবাচক চিন্তা কমে যায়, অন্যের প্রতি সহানুভূশীল হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়, সহমর্মিতাবোধ বেড়ে যায়। এ কারণেই যারা নিয়মিত দান করেন, তাদের ইমান আরও সুদৃঢ় হয়; অল্পতেই মন ভেঙে পড়ে না। কঠিন বিপদের মুহূর্তেও তারা আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভরসা রাখেন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২৬২ আয়াতে আরও এরশাদ করেন- যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে এবং ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। এ আয়াতের দ্বারা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, দানের কথা বা কাউকে উপকার করে তা কারও কাছে প্রকাশ না করা এবং এ বিষয়ে খোঁটা না দেওয়াই মহান আল্লাহ পাকের নির্দেশ। আর এ নির্দেশ পালন করার মধ্যেই রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ।
হাদিসে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, 'সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে উপকার করে খোঁটা দেয়।' (সুনান নাসাঈ)। আমরা যাদের উপকার করি বা করছি তারা যদি আমাদের সঙ্গে অসদাচরণ করে বা আমাদের ক্ষতি করে তাহলে সে জন্য তারা গুনাহগার হবে। আমরা ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেব। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অন্যের উপকার করার তৌফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×