এ কেমন নিয়োগ নীতিমালা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯      

সৌভাগ্য বড়ূয়া, চবি

এ কেমন নিয়োগ নীতিমালা

সাজিদ আলী হাওলাদার

ড. সাজিদ আলী হাওলাদার। ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী থাকাকালে ফেজারভারিয়া আসমতি নামের সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির একটি ব্যাঙ আবিস্কার করেন এ তরুণ। বিশ্বের সরীসৃপ প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে তাই মিলেছে সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানীর খেতাব। ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক ইয়োহা মারিলা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাজিদের কৃতিত্বে আকৃষ্ট হয়ে মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) বাদ দিয়ে বিশেষ বিবেচনায় সরাসরি পিএইচডি প্রোগ্রামে তাকে নিয়ে নেন। ফলে বয়স ৩০ পেরোনোর আগেই সাজিদ পিএইচডি সম্পন্ন করেন। দেশকে সমৃদ্ধ করতে নিজেকে নিয়োজিত করতে চেয়েছেন গবেষণায়। আর এজন্য তার পছন্দ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে। তাই আবেদন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে। তবে শিক্ষক নিয়োগের আবেদনের শর্ত হিসেবে মাস্টার্স না থাকায় তাকে ডাকাই হয়নি মৌখিক পরীক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনে এমন শর্তের কারণে গবেষণার সুযোগ চাপা পড়ায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

সাজিদ আলী সমকালকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমার সব স্বপ্ন দেশকে ঘিরে। সুযোগ পেলে দেশে ফিরে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। কাউকে ধরে নয়, যোগ্যতার বিচারে যদি সুযোগ দেওয়া হয়, তা হলেই দেশে ফিরব। তবে সেই সুযোগ সম্ভবত হবে না। কারণ দেশে ফেরার ইচ্ছা থেকেই মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদন করি। তবে মাস্টার্স না থাকায় মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়নি। বর্তমানে ফিনল্যান্ডের জিভাসকিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল বিভাগের অধীনে বিবর্তনবাদ শাখায় গবেষক পদে নিযুক্ত আছি। এখানে আমার অধীনে অনেক মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে হলে আমাকে আবার মাস্টার্স করতে হবে? এটা কীভাবে সম্ভব?

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য গোটা ইউরোপের চেয়ে অনেক বেশি। সে হিসেবে একটু ভেবে দেখুন, আমাদের সম্ভাবনা কত! সাজিদ বলেন, দেশে একটি প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর বানাতে চাই। যেখানে প্রাণিবৈচিত্র্যের নমুনা সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গণসচেতনতা সৃষ্টি, নতুন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের সন্ধানে মৌলিক গবেষণা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন জাদুঘর রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় আমাকে রাশিয়া একাডেমি অব সায়েন্স এবং চায়না একাডেমি অব সায়েন্স এমন একটি জাদুঘর বানানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি না মেলায় এটি সম্ভব হয়নি। পরে ব্যাঙ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ২০০৯ সালে ব্যাঙমেলার আয়োজন করি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে এই মেলা বন্ধ করে দেয়।

তরুণ এই বিজ্ঞানী আরও বলেন, এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখির অভয়ারণ্য তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। তবে পর্যাপ্ত সহায়তা পাইনি। জানি না বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর বানাতে পারব কি-না। দেশকে অনেক ভালোবাসেন জানিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, এই দেশ নানা অজুহাতে কাজ করার সুযোগ আটকে দেয়।

জানা যায়, বর্তমানে সাজিদের আবিস্কৃত ব্যাঙের সংখ্যা চারটি। এমনকি তিনি জাকেরানা নামে প্রাণীর নতুন একটি গণেরও (মবহঁং) নামকরণ করেন। ২০১১ সালে প্রথম নতুন প্রজাতির ব্যাঙ আবিস্কারের পর আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির কিউরেটর ড. ড্যারেল ফ্রস্ট বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেন। ইতালির বিখ্যাত আন্তর্জাতিক জার্নাল জুট্যাক্সার ২৭৬১ নম্বর ভলিউমে তার প্রথম স্বীকৃতির খবর ছাপা হয়। সাজিদের এই কৃতিত্বে আকৃষ্ট হয়ে বেলজিয়ামের ফ্রি ইউনিভার্সিটি অব ব্রাসেলসের জীববিজ্ঞানের প্রবীণ অধ্যাপক ফ্রাঙ্কি বসুইট তার অধীনে মাস্টার্স করার আমন্ত্রণ জানান। তবে সেখানে তার যাওয়া হয়নি। বয়স ৩০ বছর পার করার আগেই তিনি বিবর্তনবিদ্যা নিয়ে সম্পন্ন করেছেন পিএইচডি। ২০১৫ সালে তিনি আবিস্কার করেন 'ইউফ্লিকটিস কলসগ্রামেনসিস'। কলস গ্রামে পাওয়া গেছে বলে ওই নামেই ব্যাঙটির নামকরণ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত জার্নাল 'প্লসওয়ান' সাজিদ আলীর আবিস্কৃত নতুন এই প্রজাতির ব্যাঙ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৬ সালে আবিস্কার করেন 'জাকেরানা ঢাকা' এবং 'মাইক্রোহাইলা নিলফামারিনেসিস' নামের আরও দুটি ব্যাঙ।

এর মধ্যে 'জাকেরানা ঢাকা' আবিস্কারের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্র্ড। এ ব্যাপারে নবম-দশম শ্রেণির জীববিজ্ঞান বইয়ের দ্বাদশ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া গবেষণার জন্য ২০১৩ সালে ফিনল্যান্ডের 'হেলসিঙ্কি কালচারাল ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৩' লাভ করেন তিনি।

সাজিদের নিয়োগ পরীক্ষার ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী সমকালকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের যেসব নীতিমালা রয়েছে, তার মধ্যে কোনো একটি পূরণ করতে না পারলে ওই প্রার্থীকে আমরা মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকতে পারি না। প্রার্থীর আবেদনের যোগ্যতার শর্ত পূরণ হয়েছে কি-না, তা প্ল্যানিং কমিটি যাচাই করে দেখে। যাচাই শেষে পুনরায় রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠায়। সেখানে কোনো যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়েছে কি-না, পুনরায় যাচাই করা হয়। পরে যারা আবেদনের শর্ত পূরণ করেছে, তাদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। সাজিদের হয়তো কোনো শর্ত পূরণ হয়নি, তাই তাকে ডাকা হয়নি। তবে এ ধরনের প্রার্থীকে নেওয়ার জন্য যদি নিয়ম করা হয়, তবে তার অপব্যবহার হওয়ার শঙ্কা থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. হাছান বলেন, আমাদের এখানে শিক্ষক নিয়োগে যে শর্ত রয়েছে, তা ওই প্রার্থীর পূরণ হয়নি। মাস্টার্স না থাকায় পিএইচডি থাকা সত্ত্বেও তাকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের প্রার্থীকে নেওয়ার নিয়ম করা হলে তার মিসইউজ (অপব্যবহার) হওয়ার শঙ্কা থাকে। তবে সাজিদ আলী তার ব্যাপারটি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আবেদন করতে পারেন, সেক্ষেত্রে উপাচার্য সংশ্নিষ্ট বিভাগগুলোতে ব্যাপারটি তুলে ধরতে পারেন।