আবুল মনসুর আহমেদের কথায় বলা যায়, 'আওয়ামী লীগ
মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিতে গিয়া শাহেদ আলী নিহত হইলেন অপজিশনের ঢিল-পাটকেলে অথচ পূর্ব বাংলার দুশমনেরা তখনও বলিলেন ও আজও বলেন আওয়ামী লীগ শাহেদ আলীকে হত্যা করিয়াছে।' ইতিহাসের সত্যপাঠ না করে, না জেনে অর্বাচীনের মতো বক্তব্য দিয়ে কিছুদিন হয়তো আলোচনায় অবস্থান করা কৌশল হিসেবে মন্দ নয়, কিন্তু সঠিক ইতিহাসের সার্বিক বিচারে তারা দেশ ও
জাতির কাছে অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবেন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কুৎসা রটানোর লোকের অভাব নেই। তাদের উদ্দেশ্য মোটেই ভালো নয়। এর সর্বশেষ নজির বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঘৃণ্য অপপ্রচার। '৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কোন্দলের কারণে ১৫ মে সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে ৯২(ক) ধারা জারি করা হয়। ১৪ নভেম্বর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের ঢাকা আগমন এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টির স্বঘোষিত অবসরগ্রহণকারী শেরেবাংলা ফজলুল হক ও আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খানের মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে মালা দেওয়ার এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
পুরস্কারস্বরূপ কেন্দ্রীয় সরকারে আওয়ামী লীগের শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ২০ ডিসেম্বর আইনমন্ত্রী হিসেবে এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদ লাভ করেন। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ বিদায় নেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা নতুন গভর্নর জেনারেল হন। ১০ আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকারে শেরেবাংলা ফজলুল হক যোগ দেন। চৌধুরী মোহাম্মদ আলী নতুন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বগুড়ার মোহাম্মদ আলী বিদায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিরোধী দলে বসেন।
পূর্ব পাকিস্তানে তখন প্রচণ্ড খাদ্যসংকট। এ অবস্থায় আবু হোসেন সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান আবু হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব সম্পর্কে সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আবু হোসেন সরকার অনাস্থা প্রস্তাব মোকাবেলা না করে ১৯৫৬ সালের ৩০ আগস্ট পদত্যাগ করেন। তখন প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা শহরে ভুখা মিছিল চলছিল। ৪ সেপ্টেম্বর মিছিলে গুলি হলে চারজন নিহত হন। গভর্নর ফজলুল হক অবস্থা বিবেচনায় আতাউর রহমান খানকে ৬ সেপ্টেম্বর সরকার গঠনের আহ্বান জানান। আতাউর রহমান খান গণতান্ত্রিক দল, কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কফিল উদ্দিন চৌধুরী উপদল) নিয়ে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
কেন্দ্রে গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ও প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রী বিদায় হন। রিপাবলিকান পার্টি ও আওয়ামী লীগের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ইস্কান্দার মির্জার সমর্থিত রিপাবলিকান পার্টির সমর্থন প্রত্যাহার করলে ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগ নেতা আইআই চুন্দ্রীগড় নতুন প্রধানমন্ত্রী হন।
এ অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা ফজলুল হক প্রাদেশিক পরিষদে অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন নেই_ এ অভিযোগে ১৯৫৮ সালের ৩০ মার্চ আতাউর রহমানকে পদচ্যুত এবং আবু হোসেন সরকারকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগদান করেন। কেন্দ্রে চুন্দ্রীগড় বিদায় হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মালিক ফিরোজ খান নূনকে দিয়ে শেরেবাংলা ফজলুল হককে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ১৯৫৮ সালের ১ এপ্রিল চিফ সেক্রেটারি গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যেই আবু হোসেন সরকারকে উৎখাত করেন। আতাউর রহমান খান নতুনভাবে মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু ১৯৫৮ সালের ১৮ জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হলে ন্যাপ সদস্যরা নিরপেক্ষ অবস্থান নিলে আতাউর রহমান খান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলেন। ১৯ জুন আবু হোসেন সরকার পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হন। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ সমঝোতা হলে অনাস্থা ভোটে আবু হোসেন সরকার আবার ক্ষমতাচ্যুত হন। আতাউর রহমান খান পুনরায় ২২ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহূত হয়। সরকারি ফ্রন্ট থেকে স্পিকার আবদুল হাকিমের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ২০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভাকে অপদস্থ ও হেয় করার হীন উদ্দেশ্যে দেশে আইনসভা থেকে ছয়জন সদস্যকে বহিষ্কারের দাবি তোলা হয়। বলা হয়, তারা সরকারি পদে থাকায় সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অযোগ্য ঘোষিত ওই রায় অধ্যাদেশবলে নাকচ করে দেয়।
স্পিকার আবদুল হাকিম ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার রুলিং সংরক্ষিত রাখেন। ন্যাপ সদস্য দেওয়ান মাহবুব আলী স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করলে স্পিকার উপস্থাপনের অনুমতি দেননি এবং হট্টগোলের একপর্যায়ে তিনি পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন। তখন ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পরিষদে স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মাহবুব আলীর প্রস্তাব ও পিএনসির পিটার পল গোমেজ আনীত প্রস্তাবে স্পিকারকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা করা হয় এবং হট্টগোলের মধ্যে প্রস্তাবটি পাস হয়। স্পিকার শাহেদ আলী ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য।
সংখ্যাশক্তির দিক থেকে তখন পরিষদে বিরোধী দল ছিল দুর্বল। সে জন্য তারা দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করে। ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে হাউস শুরু হয়। অপজিশন দলের হট্টগোল শুরু হয়। ইউসুফ আলী চৌধুরী, সৈয়দ আজিজুল হক, আবদুল লতিফ বিশ্বাস, আবদুল মতিন, গোলাম সারোয়ার, মহম্মদ-উন-নবী চৌধুরী প্রমুখ বিরোধীদলীয় সদস্য সমস্বরে দাবি জানান, শাহেদ আলী যেন কালবিলম্ব না করে স্পিকারের আসন ত্যাগ করেন। সাবেক কৃষক শ্রমিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের মতো ঠাণ্ডা মাথার মানুষও এত উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে তিনি তার সব স্থৈর্য ও ভদ্রতাবোধ হারিয়ে ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে চিৎকার করে বলে ওঠেন, 'আপনি যদি এ মুহূর্তে স্পিকারের চেয়ার না ছাড়েন, তবে আপনাকে আমরা খুনই করে ফেলব।' আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর বইতে আবুল মনসুর আহমেদ লিখেছেন, 'শুধু মৌখিক নয়, কায়িক। শুধু খালি-হাতে কায়িক নয়, সশস্ত্র কায়িক। পেপার ওয়েট, মাইকের মাথা, মাইকের ডাণ্ডা, চেয়ারের পায়া-হাতল ডেপুটি স্পিকারের দিকে মারা হইতে লাগিল। শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা করিয়া সরকারপক্ষ আগেই প্রচুর দেহরক্ষীর ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। তারা হাতে-চেয়ারে ডেপুটি স্পিকারকে অস্ত্র-বৃষ্টির ঝাপটা হইতে রক্ষা করিতে লাগিলেন। অপজিশনের কেউ কেউ মঞ্চের দিকে ছুটলেন। তাদের বাধা দিতে আমাদের পক্ষেরও স্বাস্থ্যবান শক্তিশালী দু-চারজন আগ বাড়িলেন। আমার পা ভাঙ্গা ছিল। তাই না যোগ দিতে পারলাম মারামারিতে, না পারলাম সাবধানীদের মতো হাউসের বাহিরে চলিয়া যাইতে। নিজ জায়গায় অটল-অচল বসিয়া-বসিয়া সিনেমায় ফ্রি স্টাইল বক্সিং বা স্টেডিয়ামে ফাউল ফুটবল দেখার মতো এই মারাত্মক খেলা দেখিতে লাগিলাম।'
দেহরক্ষীরা চেয়ারের ওপর চেয়ার দাঁড় করিয়ে ডেপুটি স্পিকারের সামনে প্রাচীর গড়ে তোলে। সে প্রাচীর সত্ত্বেও হামলাকারীদের পাটকেল ডেপুটি স্পিকারের মাথায়-নাকে-মুখে আঘাত হানে। শাহেদ আলী ছিলেন নিরীহ, শান্ত ও জ্ঞানী মানুষ। দর্শনের চর্চা করতেন। চালচলন, কথাবার্তা বলতেন দার্শনিকের মতো। আহত অবস্থায় ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরের দিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
শাহেদ আলী হত্যা ছিল একটি পরিকল্পিত চক্রান্তের পরিণতি। এস এ করিম 'শেখ মুজিব ট্রাম্প অ্যান্ড ট্র্যাজেডি' বইয়ের ৯০-৯১ পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন, তার মর্মার্থ হলো, 'ইস্কান্দার মির্জা কেএসপি সদস্যদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখতেন এবং আইন পাসে বাধা এবং পার্লামেন্টে যাতে গণ্ডগোল হয়, সে জন্য মোহন মিয়া ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে বারবার সাক্ষাৎ করেন। কথা দিয়েছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের পরিষদে তিনি ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড ঘটাবেন, যাতে মানুষের মন থেকে গণতন্ত্র ও পার্লামেন্ট সম্পর্কে বিরূপ ধারণা বদ্ধমূল হয়। এর পূর্বে আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র গমন করে সিআইএ প্রধান অ্যালেন ড্যালেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাকিস্তানের সামরিক শক্তিবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ যে জরুরি এ বিষয়ে উভয়ে একমত হন।'
অথচ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে যোগদান না করেও ফিরোজ খান নূনকে সমর্থন দিয়েছিল এই শর্তে যে, পাকিস্তানে ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেবেন এবং এই মর্মে জাতির উদ্দেশে ঘোষণা প্রদান করেন। অন্যদিকে নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত না হয়, সে লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খান নির্বাচন বানচাল করার জন্য চক্রান্ত শুরু করেন। এ লক্ষ্যে ইস্কান্দার মির্জা বিরোধীদের নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য করাচি থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত লংমার্চ করার ব্যবস্থা করেন। এ সুযোগে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসেন। ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারির প্রাক্কালে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর এক ভাষণে বলেন, 'স্পিকারকে মারধর ও ডেপুটি স্পিকারকে হত্যা করার মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা দেশের মর্যাদা বিপন্ন করেছেন।' যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জনগণের অধিকার, বৈষম্য বিলোপ ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ধ্বংস করার এটা ছিল একটি পরিকল্পিত চক্রান্ত। আবুল মনসুর আহমেদের কথায় বলা যায়, 'আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করিতে গিয়া শাহেদ আলী নিহত হইলেন অপজিশনের ঢিল-পাটকেলে অথচ পূর্ব বাংলার দুশমনেরা তখনও বলিলেন ও আজও বলেন আওয়ামী লীগ শাহেদ আলীকে হত্যা করিয়াছে।' ইতিহাসের সত্যপাঠ না করে, না জেনে অর্বাচীনের মতো বক্তব্য দিয়ে কিছুদিন হয়তো আলোচনায় অবস্থান করা কৌশল হিসেবে মন্দ নয়, কিন্তু সঠিক ইতিহাসের সার্বিক বিচারে তারা দেশ ও জাতির কাছে অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবেন।

'৭২-এর খসড়া সংবিধান প্রণেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী

মন্তব্য করুন