২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে মোট ৩৪টি ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে, যার ১৯টি স্টিলের তৈরি এবং বাকিগুলো কংক্রিটের। এর মাত্র কয়েকটি ভালোভাবে ব্যবহার হচ্ছে; বাকিগুলোর তেমন ব্যবহার নেই। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় ফার্মগেটে তৈরি ফুট ওভারব্রিজটি, যার বহুমুখী অর্থাৎ অনেক লুপ বা ওঠানামার পথ রয়েছে। সেই ফুট ওভারব্রিজটির ওপর দিয়ে অনেক সময় ভিড়ের কারণে হাঁটাও যায় না। শহরের বাকি ফুট ওভারব্রিজগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি সারাদিনে কয়েকশ' লোক ব্যবহার করে। আর ৬০-৭০ শতাংশ ফুট ওভারব্রিজ সারাদিনে কেউই ব্যবহার করে না। যেগুলো কেউ দিনে ব্যবহার করে না সেগুলো রাতে সমাজবিরোধীরা বিভিন্ন প্রকার সমাজবিরোধী কাজে এবং কোথাও কোথাও ভাসমান ব্যক্তিরাও ব্যবহার করে। এ ছাড়া শহরে যখন সহিংস আন্দোলন চলতে থাকে তখন সেসব জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ পাহারার প্রয়োজন পড়ে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে_ কেন এগুলো ব্যবহার করা হয় না? তার আগে জানা দরকার কোথায় ফুট ওভারব্রিজ তৈরি করতে হয় আর কোথায় আন্ডারপাস তৈরি করতে হয়। কারণ একটি অন্যটির বিকল্প। যদি ফুট ওভারব্রিজ আন্ডারপাসের জায়গায় তৈরি করা হয়, তাহলে সেখানে অবশ্যই ফুট ওভারব্রিজ কেউ ব্যবহার করবে না।
ফুট ওভারব্রিজ তৈরির ক্ষেত্রে কতগুলো বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। প্রথমত, স্থান নির্বাচন। এটি সাধারণত কানেকটিং পয়েন্ট বা ক্রসিং পয়েন্টে করতে হয়, যাতে লোকদের দূর দিয়ে হেঁটে গিয়ে রাস্তা পার হতে না হয়। ফুট ওভারব্রিজের কাছে হেঁটে যাওয়ার দূরত্ব যদি রাস্তা ক্রস করার দূরত্বের চেয়ে বেশি হয় তাহলে সম্ভাব্য ব্যবহারকারীরা সরাসরি হেঁটে রাস্তা পার হবে; ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করবে না। দ্বিতীয়ত, রাস্তার প্রশস্ততা। যদি রাস্তাটি কম প্রশস্ত হয় তাহলে লোকেরা রাস্তাটি সরাসরি হেঁটে পার হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হবে বেশি। তৃতীয়ত, ফুট ওভারব্রিজের উচ্চতা। তা যদি বেশি উঁচু হয় তাহলেও লোকেরা তা ব্যবহার না করে সরাসরি রাস্তা পার হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ ফুট ওভারব্রিজ অত্যন্ত উঁচু, যেখানে একটি ডবল ডেকার বাসের ওপর দিয়ে আরও এক মিটার ফাঁকা রাখা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ব্রিজের ৪০টির মতো সিঁড়ি রয়েছে। কোথাও কোথাও তা খুবই খাড়া। ফলে একজন পথচারীকে প্রায় চার তলা বিল্ডিংয়ের সমপরিমাণ উচ্চতায় ওঠার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে খুব সহজে রাস্তার দূর থেকে স্লোপ করে উচ্চতা অনেক কমানো সম্ভব এবং ইচ্ছা করলে গাড়িগুলো চলার পয়েন্টে ঢালু করে দিয়ে ফুট ওভারব্রিজের উচ্চতা আরও কমানো সম্ভব। সে ক্ষেত্রে কেবল দক্ষতার সঙ্গে বৃষ্টির পানি ড্রেনে ফেলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বর্ষায় যেন পানি জমার সুযোগ না থাকে। এভাবে ফুট ওভারব্রিজের উচ্চতা যতটুকু কমানো সম্ভব ততটাই করার চেষ্টা দরকার।
এখন দেখা যাক আন্ডারপাস তৈরির বিষয়টি। আন্ডারপাসের একটি বড় সুবিধা হলো, তা কেবল রাস্তাকে উঁচু করে দিয়ে মাত্র ৮ ফুট গভীর করে অর্থাৎ একতলা ভবনের কম উচ্চতা দিয়েও করা সম্ভব। যদি কোনো একটি আন্ডারপাস কেবল ৮ ফুট গভীর করে করা হয় তাহলে লোকদের তাতে সহজে ওঠানামা করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব। সেই আন্ডারপাসে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেই চলে। যেমন, সেখানে নিচে দোকানের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, যাতে লোকদের সহজে সেখানে ঢোকার অভ্যাস গড়ে ওঠে। এ ছাড়া সেখানে টয়লেটের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে দেওয়া যেতে পারে। ফলে সেটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আর সিটি করপোরেশনকে বহন করতে হবে না।
আন্ডারপাস কোথায় নির্মাণ করা যাবে? যেখানে রাস্তার প্রশস্ততা কম এবং যেখানে লোকেরা খুব সহজে রাস্তা পার হতে চায় সেখানে আন্ডারপাস ফুট ওভারব্রিজের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা যেতে পারে। আর অবশ্যই তা কানেক্টিং পয়েন্ট বা ক্রসিং পয়েন্টে হতে হবে।
আসলে ফুট ওভারব্রিজ তৈরির পরিকল্পনা করার সময় এ জন্য নিরীক্ষা পরিচালনা করা দরকার। বিশেষ করে ব্যবহারকারীদের আচরণ বিষয়ে আরও গভীর পর্যালোচনা করা দরকার ছিল। প্রতিটি স্থানে চলাচলকারী এসব স্থানীয় দোকানদার ও অধিবাসীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা দরকার ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যেখানে খালি জায়গা পাওয়া গেছে সেখানেই ফুট ওভারব্রিজ করা হয়েছে। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি_ আসলে সেখানে ফুট ওভারব্রিজ দরকার, নাকি আন্ডারপাস এবং ফুট ওভারব্র্রিজের দরকার হলে তার স্থানটি কোথায় হবে। তাই বর্তমানে ফুট ওভারব্রিজগুলো খুলে যেখানে ক্রসিং পয়েন্ট আছে সেখানে নিতে হবে। যেগুলো স্টিলের তৈরি তা সহজে স্থানান্তর সম্ভব। এর উচ্চতা কমাতে হবে। তার জন্য ব্রিজের গোড়া থেকে রাস্তার দিকে প্রয়োজনে ঢালু করে দিতে হবে, যাতে উচ্চতা কমে আসে। এতে অন্তত ৪-৫ ফুট কমানো সম্ভব। এ ছাড়া যদি দরকার হয় রাস্তাকেও নিচু করা যেতে পারে, বিশেষ করে যেখানে রাস্তা এমনিতেই উঁচু আছে। ফলে সেখানে আর পানি জমার আশঙ্কা থাকবে না।
বর্তমানে লোকেরা অনেক সময় গাড়ির সিগন্যালের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পার হয়। এটি বন্ধ করতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তার আগে অবশ্যই ফুট ওভারব্রিজগুলোর সংস্কার করতে হবে। শুধু তাই নয়; এসকেলেটর দেওয়া হলেও শিক্ষিত-অশিক্ষিত কিংবা গ্রামীণ ও শহুরে লোক হেঁটেই রাস্তা পার হবে। বনানীর কাকলিতে ফুট ওভারব্রিজে এসকেলেটর দেওয়ার পরও ২০ শতাংশ লোক হেঁটে রাস্তা পার হয়। তাদের এ আচরণ পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ফুট ওভারব্রিজে যদি এসকেলেটর লাগানো হয় তাতে তার ব্যবহার বাড়বে কিন্তু তা সর্বজনীন হবে_ এমন কোনো কথা নেই। তবে তা নারী-শিশু-অসুস্থ লোকদের জন্য অনেক বেশি কার্যকর হবে।
পরিশেষে বলা দরকার, আমাদের দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে চারটি খারাপ বিষয় সবসময় লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, বেঠিক জায়গা বা বেঠিক কাঠামো চিহ্নিত করা; দ্বিতীয়ত, খারাপ ডিজাইন তৈরি করা; তৃতীয়ত, খারাপভাবে বাস্তবায়ন করা এবং চতুর্থত, ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা। বর্তমানে তৈরিকৃত ফুট ওভারব্রিজগুলোর ক্ষেত্রে এর সব ক'টিই প্রযোজ্য। তাই এগুলোকে সংস্কার না করলে মানুষ তা ব্যবহার করবে না।

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

মন্তব্য করুন