বাংলাদেশে নগর বা নগরায়ন নিয়ে কথা কথা বলতে চাইলে যে নামটি সবার আগে ভেসে ওঠে তিনি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ বা নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। বিগত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় নিরলস ও নিবেদিতভাবে নগরচর্চায় ব্যয় করে বাংলাদেশের নগরায়ন ও নগর উন্নয়নে জ্ঞানের একটি নতুন ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন তিনি। তার ধানমণ্ডির বাসায় কথার শুরুটা হলো স্বপ্নের শহর নিয়ে। কেমন তা দেখতে? কেমন হবে তার মানুষ?

একটু ভাবলেন। তারপর শুরু করলেন, আমার স্বপ্নের শহর হবে সামাজিক সৌহার্দ্যের, সাংস্কৃতিক দিক থেকে উচ্চমার্গীয়, নান্দনিক। অর্থনৈতিকভাবে সাম্যের, বৈষম্যহীন। সামাজিকভাবে সহনশীল সৌহার্দ্যের শহর এবং সার্বিকভাবে পরিবেশবান্ধব সবুজ এক শহর। যে শহরে থাকবে দক্ষ মানুষের রাজনৈতিক পরিবেশ আর ব্যক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা।

অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ভাবনা থেকে ঢাকার দূরত্ব কত বলতেই একটুও না ভেবে বললেন, লক্ষ মাইল। শরীয়তপুরে জন্ম নেওয়া নজরুল ইসলামের জীবনের প্রথম ক'টি বছর কেটেছে গ্রামে। নদী-নালা-জল-বিল-খালে। লেখাপড়া পুরনো ঢাকার নবাবপুর হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশে। ভালো ছাত্রের তকমাটা তার বরাবরের। কর্মজীবনে ৫০ বছর কেটেছে বাংলাদেশের নগরায়ন ও নগর গবেষণা নিয়ে।

১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ঢাকার উচ্চবিত্ত মানুষের আবাসন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকতেই। সেই যে ঢাকা দিয়ে শুরু, এর পর একের পর এক গবেষণা। কখনও একা, আবার কখনও পুরো গবেষণা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে। দেশে ও বিদেশে নগর নিয়ে গবেষণার পরিধি প্রসারিত করেছেন। একজন নজরুল ইসলাম হয়ে উঠেছেন একজন নগর বিশারদ।

অধ্যাপক নজরুল ইসলামের গবেষণার বিষয় নগর ও নগরায়ন চর্চার বাইরে মূলত ছিলেন ভূগোলের একজন শিক্ষক। ভূগোল তার প্রিয় বিষয়। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্লাস নিতেন 'ভূগোলের দর্শন' বিষয়ে। বাংলাদেশ তখন একটি সদ্য স্বাধীন দেশ। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মূলমন্ত্রে দেশটি এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। 'ভূগোলের দর্শন' ক্লাসে আলোচনার মূল বিষয় ছিল_ কেমন হওয়া উচিত মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক? তার ব্যাখ্যায় প্রকৃত মানুষ হবে তার সমস্ত কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণ একজন যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানমনস্ক চরিত্রের। আর প্রকৃতি হবে তার কর্মকাণ্ড ও জীবনের সহায়ক। মানুষ ও প্রকৃতি একে অপরকে বৈরী করে তুলবে না। মানুষের বসবাস হবে প্রকৃতির সঙ্গে, সত্য ও সুন্দর জীবনের অন্বেষায়। মানবিক ভূগোলের দর্শনে তিনি বলতেন সমতাভিত্তিক সমাজের কথা। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ ছিল মানবিক ভূগোলের মূল দর্শন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন। আবার যা বলতেন তার প্রতিফলন দেখা যায় তার জীবনেও। ওই সময়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম সাইকেল চালিয়ে বিভাগে আসতেন। প্রযুক্তিবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তার কাজের ও চিন্তার বিনিময় ছিল নিয়মিত। স্থপতি, প্রকৌশলী ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনা ও সেমিনার করতেন নিয়মিত। এতে আবার ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পৃক্ত করতেন। অধ্যাপক নাজমুল করিমকে আমরা অধ্যাপক নজরুল ইসলামের অফিস কক্ষে আলোচনা করতে দেখেছি। অপরাপর শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞগণ সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে গবেষণার ফলাফল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও গণমানুষের কাছে পেঁৗছে দিতেন। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে প্রাণে বাঙালিয়ানা দর্শনের একজন প্রবক্তা। চাল চলনে অতি সাধারণ, কিন্তু অত্যন্ত আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, একা এবং ব্যক্তিগতভাবে নগরায়ন ও নগর সেক্টরের মতো একটি বিশাল ক্রমবর্ধমান সমস্যার ওপর গবেষণা সম্ভব নয়। তার এই উপলব্ধির বাস্তবতায় ১৯৭২ সালের ১৩ মে নগর গবেষণা কেন্দ্র নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। নগর গবেষণা কেন্দ্র বিগত ৪২ বছরে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রূপ লাভ করেছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বিদেশে অবস্থানের কিছু সময় ছাড়া পুরো এই ৪৩ বছর ধরে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম নগর গবেষণা কেন্দ্রের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। গবেষণা কেন্দ্রটি সম্পূর্ণভাবে বহুশাস্ত্রীয় এবং স্বাধীন। নগর গবেষণা কেন্দ্রের স্বাধীন সত্তা ও স্বকীয়তা ধরে রাখতে গিয়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এর প্রসারে গতানুগতিক কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করেননি। বরং গবেষণার মান ও গুণগত বিষয়ের ওপর সর্বদা জোর দিয়েছেন। নগর গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে বিগত ৪২ বছরে ৪০টিরও বেশি গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব গবেষণার ফলাফল দেশে ও বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে নগর গবেষণা কেন্দ্র ঢাকাসহ দেশের ছয়টি প্রধান নগরীতে বস্তিগুলোয় জরিপ ও মানচিত্র তৈরি করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার বস্তি মানচিত্রটি ২০১০ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অ্যাটলাসে ছাপা হয়েছে। এই গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

স্থিরচিত্র বা ফটোগ্রাফিতেও তার অনেক আগ্রহ। ফটো তোলা ও সংগ্রহ দুটোই পছন্দ করেন। তথ্য বিশ্লেষণে ফটোগ্রাফের ব্যবহার তার লেখালেখির মধ্যে সচরাচর দেখা যায়। বলেন, বিখ্যাত আর্ট ফটোগ্রাফার ড. নওয়াজেশ আহমেদ আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। ছবির বিষয় নিয়ে, বিশেষ করে প্রকৃতি ও জীবন কীভাবে ফটোগ্রাফের মাধ্যমে তুলে আনা যায় তা প্রায়ই আলাপ হতো আমাদের।

ড. নওয়াজেশ আহমেদ এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার নিবিড় বন্ধুত্বের অনেক স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে। অধ্যাপক নজরুল ইসলামও তাকে অনেক শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন; যার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন তার বিখ্যাত ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু অৎঃ ধহফ অৎঃরংঃং : ইধহমষধফবংয ধহফ ইবুড়হফ (২০১০) ড. নওয়াজেশ আহমেদকে উৎসর্গের মাধ্যমে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এই ছিয়াত্তরেও যথেষ্ট কর্মব্যস্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা সাতটা-আটটা পর্যন্ত অফিসে থাকেন। তার সময় কাটে পড়াশোনা আর গবেষণা নিয়ে। আড্ডা, টেলিভিশন ও খবরের কাগজ তার নিত্যসঙ্গী। রকমারি বাঙালি খাবার তার পছন্দ। তিনি গতিময় এক জীবনযাপন করেন, যাকে কোনো নিয়মে ফেলা যায় না। তিনি একজনই নজরুল ইসলাম।

মন্তব্য করুন