বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার মানসে প্রবর্তিত 'ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার'-এর তৃতীয় আবর্তন এ বছর। ২০ জুন হোটেল সোনারগাঁওয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন_ মঈনুল আহসান সাবের [কবিতা ও কথাসাহিত্য শাখায় 'এখন পরিমল' গ্রন্থের জন্য], মাসরুর আরেফিন [প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ শাখায় 'ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র-১' গ্রন্থের জন্য] এবং বদরুন নাহার [হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার শাখায় 'বৃহস্পতিবার' গ্রন্থের জন্য]। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলেন দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের অগ্রগণ্য নক্ষত্রেরা। ছিলেন মনোনয়নপ্রাপ্ত বইয়ের নির্বাচক, চার বিচারক_ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আসাদ চৌধুরী ও সেলিনা হোসেন। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা জানিয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল পুরস্কার নিয়ে তাদের কথা। কালের খেয়ার বিশেষ আয়োজন...


গোলাম সারওয়ার
সম্পাদক, সমকাল
দৈনিক সমকাল সাহিত্যমনস্ক একটি সংবাদপত্র। প্রকাশের প্রথম থেকেই এ বৈশিষ্ট্যটি সমকালের সাহিত্যপ্রিয়তাকে স্পষ্ট করেছে বারবার। শুক্রবারে আমাদের যে সাপ্তাহিক সাহিত্য আয়োজন 'কালের খেয়া'_ এটি সাহিত্য অনুরাগীদের খুবই প্রিয়। সমকালের এই সাহিত্য প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে 'ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার'। ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে সমকালের চিন্তা ও আগ্রহের যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে, তারই প্রয়াস এই সাহিত্য পুরস্কার। এবারও সে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে দেশের তিনজন মেধাবান সাহিত্যকর্মীর হাতে। আমাদের সাহিত্যজগৎকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এবারের পুরস্কারটি আমাদের তৃতীয় পদক্ষেপ। প্রতি বছর প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলোকে সম্মানিত করতে ব্র্যাক ব্যাংক এবং সমকালের এ যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং উত্তরোত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যকে প্রেরণা জোগাবে_ এটাই আমার স্বপ্ন এবং বিশ্বাস। এবার আমরা প্রায় ছয়শ' বইয়ের মধ্য থেকে তিনটি যথার্থ অনন্যসাধারণ কর্মকে পুরস্কৃত করতে পেরে আনন্দিত।
এটা অত্যন্ত আনন্দের যে, অভিজ্ঞ বিচারকমণ্ডলী একেবারে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেই এ পুরস্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যোগ্য সাহিত্যিককে পুরস্কৃত করার পাশাপাশি তরুণ সাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যেও এ আয়োজন ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। সে উদ্দেশ্যেই এ সাহিত্য পুরস্কারে যুক্ত করা হয়েছে তরুণ সাহিত্যিক শাখা। আমাদের প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে গত বছর থেকে সেই পুরস্কারটির নাম রাখা হয়েছে, 'হুমায়ূন আহমেদ (তরুণ) সাহিত্য পুরস্কার'। যারা এ বছর সাহিত্য পুরস্কার পেলেন, তাদের সকলকে সমকাল ও ব্র্যাক ব্যাংক পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন।


মুস্তাফা নূরউল ইসলাম
সদস্য, জুরি বোর্ড
ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩
লেখককে অনুপ্রাণিত করতে, সামনের দিনে ভালো সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করতে পুরস্কার সব সময়ই অনন্য ভূমিকা পালন করে। লেখক-সাহিত্যিকদের কাজের মূল্যায়নে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার একটি অনন্য সংযোজন বলেই মনে করি। বিজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে কী কী রয়েছে, সেটা যারা পাঠ করবেন, তারাই অনুধাবন করবেন। বিচারক আমরা, নির্লিপ্তভাবে খানিকটা মূল্যায়নের চেষ্টা করেছি। গ্রন্থের বড় কথাটি হচ্ছে গ্রন্থ নতুন করে স্রষ্টাকে, শিল্পীকে, লেখককে সৃষ্টি করে থাকে, মূল্যায়নে ওটাই উঠে আসছে যে, আমরা যারা পাঠক, আমরা নতুন করে কতটা পেলাম। সেরা বইগুলো বাছাইয়ের কাজটি খুব সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমরা তিন বিভাগের সেরা তিনজনকে নির্বাচন করেছি। সমকাল এবং ব্র্যাক ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাদের কাছে আশা করব ভবিষ্যতে যেন তাদের কর্মপরিসর বিস্তৃতি লাভ করে। এই উদ্যোগকে আমি ধন্যবাদ জানাই, এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে কৃতার্থ মনে করছি।


আসাদ চৌধুরী
সদস্য, জুরি বোর্ড
ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩
ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার তৃতীয় বছরের মতো প্রবীণ ও তরুণদের কাজের মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। এটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগার দিক।
অধিকাংশ পুরস্কারেই আমরা দেখব, আগে যখন একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদক দিত, যারা পুরস্কার পেতেন, তাদের নামের শুরুতে মরণোত্তর পড়তে পড়তে হয়রান হয়ে যেতাম। অন্তত জীবদ্দশায় একজন লেখক জেনে গেলেন তার কাজের স্বীকৃতি, তার মনোযোগ কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে অন্তত বিচারকদের কাছে।
নিজের বিচার-বুদ্ধি সম্পর্কে খুব একটা যে অশ্রদ্ধা আছে তা না, কিন্তু এবার আমি সংশয়ের মধ্যে পড়েছি, এটা বলতেই হবে, এত ভালো বই জমা পড়েছে, বিচারকার্যে সিদ্ধান্তে পেঁৗছতে সমস্যাই হয়েছে। এটা বলতেই হয় যে, আমাদের সাহিত্যের নতুন করে যেন ধারা তৈরি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যদিও পত্রপত্রিকা যথেষ্ট, প্রতিটা পত্রিকারই সাহিত্য আয়োজন আছে, যথেষ্ট সুন্দর করে তারা সেগুলো প্রকাশ করে, তারপরও মনে হয়, পুরস্কার লেখককে যেন আলাদা করে চিহ্নিত করে, পুরস্কার শনাক্ত করে দেয় ভালো বইটাকে। পুরস্কৃত তিনজনকে অভিনন্দন। ভবিষ্যতে আমরা তাদের দিকে তাকিয়ে আছি, যারা সাহিত্য ও চিন্তার আরও গভীরে যাবেন, আরও মর্মে ঢুকবেন এবং আমাদের সহজ ভাষায় সত্য কথাটি অবহিত করাবেন, বলবেন এবং আমরা উপকৃত হব।


জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
সদস্য, জুরি বোর্ড, ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩
ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর একজন আমি। বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও এই দায়িত্ব বর্তেছে আমার ওপর। একটি সাহিত্য পুরস্কারে বিচারকদের দায়িত্ব হলো বইগুলো পড়ে তার সম্পর্কে তাদের নিজস্ব মতামত গঠন করা, সৃজনশীলতার দিক বিবেচনায় বইগুলোর মেধাক্রম তৈরি করা। কে, কীভাবে কোন বইটা লিখেছেন সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার। বিচারকরা সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন এবং তাদের মতামত দিয়েছেন। সে মতামতের ভিত্তিতে তিনজনকে নির্বাচন করা হয়েছে।
সবাই জানেন যে, এই পুরস্কারের সঙ্গে বেশ কিছু জ্ঞানী লোক যুক্ত আছেন, বোদ্ধা ব্যক্তি যুক্ত আছেন, তাদের মতামতের ভিত্তিতেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং অনানুষ্ঠানিকভাবে মুখে মুখে একের মুখে শুনে অন্যরা প্রভাবিত হয়ে যেভাবে একটা বই কিংবা একজন লেখক সম্পর্কে জানেন, তাদের মতামত গঠন করেন, তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও একটি প্রক্রিয়া, এটাই পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া। বাংলা সাহিত্যের একটা ইতিহাস আছে, এর একটা ঐতিহ্য আছে, সেই ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সাহিত্যিক যারা, তারা কাজ করে যাচ্ছেন, কিন্তু তারা পুরস্কারের কথা ভেবে কাজ করেন না। সবশেষে এই আশাই পোষণ করব যে, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার অতীতের মতোই থাকবে, ব্যবস্থাটা স্থায়ী হবে এবং এই পুরস্কারটাও কালক্রমে একটা গৌরবজনক পুরস্কার হিসেবে সবার স্বীকৃতি আদায় করে নেবে।

সেলিনা হোসেন
সদস্য, জুরি বোর্ড, ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩
সাহিত্য পুরস্কারে বিচারকদের বইয়ের মান নির্বাচনের মতো একটি দুরূহ কাজ সম্পাদন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বলব, নির্বাচনটা আমরা যথাযথভাবে করেছি, তা নয়_ বই পড়ে ভালো লাগার জায়গা থেকে আমাদের নির্বাচিত করতে হয়েছিল। ভাষা, শিল্প দৃষ্টি, যে বিষয়টি তিনি নির্বাচন করেছেন এবং যে বিষয়ের মাধ্যমে তিনি বইটি উপস্থাপন করেছেন, তার সবটুকুই মান বিচারের ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হয়েছিল।
এ ধরনের পুরস্কার অনেককেই অনুপ্রাণিত করে, লেখকদের অনুপ্রাণিত করে, পাঠকদেরকেও অনুপ্রাণিত করে। আমরা চাই আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দীর্ঘ হোক। আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে অনুপ্রাণিত হোক সমাজের মানুষ এবং এ ধরনের পুরস্কার সমাজকে এগিয়ে নিক। এ ধরনের পুরস্কার আমাকেও নানাভাবে অনুপ্রাণিত করে। আমি অনেক নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হই, সমকালীন লেখকের সঙ্গে পরিচিত হই, বিশেষ করে তরুণ লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হই এবং আমাদের অগ্রজরা কি লিখছেন সেটাও পাঠের সুযোগ হয়। ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমার অভিনন্দন এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণের জন্য। সবশেষে তিন বিভাগে পুরস্কৃত তিনজনকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন।

মন্তব্য করুন