তুমুল গাঢ় সমাচার

ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা

নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

বিনায়ক সেন

পর্ব ::৪
[গত সংখ্যার পর]

৩. নব-জাগরণের ভাষা ও শহীদ কাদরী

শহীদ কাদরীকে আমি 'উত্তরাধিকার' কাব্যগ্রন্থের প্রসঙ্গ তুলে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তার ষাটের দশকের কবিতায় অবক্ষয়ের, যুদ্ধের, মড়কের, দাঙ্গার প্রভৃতি বিপর্যয়ের যত উল্লেখ, তা কতটা পরিমাণে সমকালীন বাস্তব দ্বারা চিহ্নিত, নাকি সেটা নিতান্তই তার কল্পনাপ্রসূত? নব-জাগরণের অকৃত্রিমতা বোঝার জন্য এ প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া জরুরি।

'উত্তরাধিকার'-এর একেকটি কবিতা ধরে ধরে কবি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধ-দাংগা অবক্ষয়-বোধ ষাটের দশকের নয়, এগুলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কলকাতার অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। উদাহরণত, নাম-কবিতায় তিনি স্মরণীয় করে লিখেছেন :

জন্মেই কুকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে-
সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন
দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে
নিমজ্জিত সবকিছু, রক্তচক্ষু সেই ব্লাক আউট আঁধারে।

এখানে সন্ত্রস্ত শহর, ব্লাক আউট আধার প্রভৃতি শব্দ ষাটের দশকের ঢাকাকে বোঝাচ্ছে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কলকাতার দীপহীন রাত্রিকে নির্দেশ করছে। অনেক যুদ্ধ, দাঙ্গা, মহামারী ও মন্বন্তর সূচিত শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে শহীদ কাদরী শ্রান্ত-ক্লান্ত কলকাতা থেকে উদ্ভিন্নযৌবনা ঢাকা শহরে এসে পা রাখলেন। দেশভাগের পরিণামে এক প্রকার উদ্বাস্তু হতে হয়েছিল তাকে। এর ফলে যেসব কবিতা বেরিয়েছিল তাকে নিছক কবির 'মনোজাত নাগরিক বিকলাঙ্গ জীবনজগতের সন্ধান' (জনৈক সমালোচকের উক্তি তুলে ধরছি) বলে চিহ্নিত করলে পুরোটা বলা হয় না। দেশভাগের ফলে উন্মূল উৎপাটিত খসড়া জীবনের কষ্টটা তাতে চাপা পড়ে যায়। উদ্বাস্তু জীবন থেকেই উদ্বাস্তু মনের উদ্ভব। তাই তিনি 'নপুংসক সন্তের উক্তি' কবিতায় বলেছেন :

'কেন এই স্বদেশ সংলগ্ন আমি, নিঃসঙ্গ উদ্বাস্তু,
জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা,
আঁধার টানেলে যেন ভূতলবাসীর মতো, যেন
সদ্য, উঠে আসা কিমাকার বিভীষিকা নিদারুণ!
আমার বিকট চুলে দুঃস্বপ্নের বাসা? সবার আত্মার পাপ
আমার দুচোখে শুধু পুঞ্জ পুঞ্জ কালিমার মত লেগে আছে
জানি, এক বিবর্ণ গোষ্ঠীর গোধূলীর যে বংশজাত আমি
বস্তুতই নংপুসক, অন্ধ, কিন্তু সত্যসন্ধা দুরন্ত সন্তান।

একে কেবল স্যাড জেনারেশন, হাংরি জেনারেশন, ষাটের অবক্ষয়বাদী কবিতার ধারা বলে শনাক্ত করা চলে না। এর একটি আশু তাৎপর্য এই যে, অবক্ষয়বোধের পেছনে শুধু হই-চই, শুধু প্রথাগতকে অস্বীকার করে তারুণ্যের স্বাক্ষর রাখার তাগিদ ছিল না। এর পেছনে রাষ্ট্র-সমাজজীবনের বিপর্যয়ের যোগসূত্র ছিল। ইতিহাসের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েই তবে লেখা সম্ভব ছিল 'উত্তরাধিকার'-এ :

'-এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা
এবং আমাকে নিস্কপর্দক নিষ্ফ্ক্রিয়, নঞর্থক
করে রাখে; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা!'

আগেই বলেছি, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এক গভীর দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ অবক্ষয়ের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়। কিন্তু দেশ-ভাবনাকে নিয়েও খেলেছিলেন তারা ছন্দে-উপমায় চিত্রকল্পে-সংকেতে। এর একটা বড় কারণ ছিল ষাটের কবিদের মধ্যে প্রবল সমকালীনতাবোধ। ষাটের দশকে শুধু ছয়-দফা আন্দোলনই নয়; ১৯৬৮ থেকে শুরু করে ফ্রান্স, আমেরিকা, চেকোশ্নোভাকিয়া, সারা বিশ্বেই ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল। ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল; চে গুয়েভারা মারা গেলেন বলিভিয়ায়, রবার্ট কেনেডি নিহত; নিক্সন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন। সত্তর সালের জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু হলো পূর্ববাংলার অসংখ্য মানুষের। আর সে বছরই নির্বাচনে জয় পেল শেখ মুজিবের দল, সেই মুজিব যিনি পান্নালালের গান ভালবাসতেন-'আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা।' এসবের প্রভাব এসে পড়েছিল কবিতার স্বগত উচ্চারণেও। শহীদ কাদরীর 'স্কিৎসোফ্রেনিয়া' এর উদাহরণ :

সংবাদপত্রের শেষ পৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে এসেছে
এক দীর্ঘ সাঁজোয়া-বাহিনী
এবং হেডলাইনগুলো অনবরত বাজিয়ে চলছে সাইরেন।
একটি চুম্বনের মধ্যে সচিৎকার ঝলসে গেল কয়েকটা মুখ,
একটি নিবিড় আলিঙ্গনের আয়ুস্কালে
৬০,০০০,০০ উদ্বাস্তুর উদ্বিগ্ন দঙ্গল
লাফিয়ে উঠলো এই টেবিলের 'পর;
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সুখাদ্যের ধোঁয়া
কেননা এক বাচাল বাবুর্চির
সবল নেতৃত্বে
আর সুনিপুণ তত্ত্বাবধানে
আমাদের সচ্ছল কিচেনে
অনর্গল রান্না হ'য়ে চলেছে আপন-মনে
নানা ধরনের মাংস-
নাইজেরিয়ার, আমেরিকার, সায়গনের, বাংলার
কালো, শাদা, এবং ব্রাউন মাংস।

সমসাময়িক জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এই তীব্র সচেতনতা ষাটের অবক্ষয়-পেরুনো জাগরণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ্য, সে যুগে 'সমাজতন্ত্র' শব্দটি ছিল গর্বের সাথে ধারণ করার মতো একটি শিরস্ত্রাণ। সেটি যত-না মাওবাদ বা সোভিয়েতের কারণে (১৯৬৮ সালে চেকোশ্নোভকিয়ায় গিয়েছিল রুশি ট্যাংক- সে স্মৃতি তখনও তাজা) তারচেয়ে বেশি পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প খোঁজার তাগিদে। প্রায় একই সময়ে ইন্দিরার কংগ্রেস, ভুট্টোর পিপিপি আর মুজিবের আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রকে তার অন্যতম আত্ম-পরিচয় হিসেবে স্বীকার করে নেয়। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই পরিবর্তন মাও সে তুং-এর 'রেড বুক'-এর কারণে হয়নি। ষাটের দ্বিতীয় ভাগের কবিতায় সমাজ-চেতনা সে ধরনের বোধে প্রধানত চালিত হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, পাকিস্তানে 'বাইশ পরিবার'-এর উত্থান প্রভৃতি অনুষঙ্গ ৬-দফাকে ১১-দফায় পরিণত করতে সাহায্য করেছিল। এই অর্থনৈতিক চেতনা কবিতার বলয়ে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে থাকবে। এক অসহায় বিপর্যস্ত মানবিক বোধে ষাটের কবিরা সমাজ-পরিবর্তন ও সাম্য-ধারণার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে দাঁড়ালেও সে তারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ছাড়তে চাননি। শহীদ কাদরী লিখেছেন :

চুলের চটুল অহঙ্কার সহনীয় নয় কোনো সুধীমণ্ডলীর কাছে
অতএব খাটো হতে হবে তাকে,
সমাজের দশটা মাথার মতো হতে হলে, দশটা মাথার মতো
অতএব বেঁটে হ'তে হবে তাকে
তবু সে আমার চুল
অন্ধ
মূক ও বধির চুল মাস না যেতেই
আহত অশ্বের মতো আবার লাফিয়ে উঠছে অবিরাম

শুধু শহীদ কাদরী নন; এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সামষ্টিক কল্যাণ কামনা অনায়াসে সহাবস্থান করছিল ষাটের দশকের প্রায় সব কবির মানসে-কবিতায়।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। ষাটের প্রতিনিধিত্বশীল কন্ঠ হিসেবে শহীদ কাদরীর আলোচনা কতদূর সঙ্গত? এটা তো সবারই জানা যে, শহীদ কাদরীর সাথে ছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের একদার গভীর বন্ধুত্ব, যা গড়ে উঠেছিল পঞ্চাশের দশকেই। তারপরও শহীদ কাদরীকে আলোচনায় টেনে আনা। কেননা, তিনি উভয় দশকেই তার পদচ্ছাপ রেখেছিলেন। ষাটের তরুণ ও তরুণতর কবিকুলের আড্ডায়-এমনকি সত্তরের দশকেও প্রবাসের পথে পাড়ি দেওয়া পর্যন্ত- তার ছিল নিয়মিত উপস্থিতি। এমনকি এসব আড্ডার অনেকাংশে তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। ষাট দশককে যদি জাগরণের পর্ব বলি, তাহলে সে সাংস্কৃৃতিক উত্থানের নিঃসঙ্গ যুবরাজ তিনি। এ নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাক্ষ্য তুলে ধরছি :

'উদ্দাম বলিষ্ঠ প্রাণশক্তি নিয়ে নাইল ভ্যালিতে আসত আরও একজন, শহীদ কাদরী-আমাদের সবার বিস্ময় ও মোটামুটি কেন্দ্রীয় আকর্ষণ।... বিশ শতকী ইউরোপীয় আধুনিকতার ও ছিল প্রায় মূর্ত-প্রতীক। পড়াশোনায় ও চেতানজগতে সেই আধুনিকতাকে ও ধারণ করত। প্রথম ষাটের অনেক তরুণ-লেখকের আধুনিকতার চেতনা অনেকখানিই ওর হাত থেকে পাওয়া। আমাদের দলের কেউ ছিল না ও, কখনো হয়ওনি তা, কিন্তু যাকে ঘিরে নাইল ভ্যালির আসর সবচেয়ে উদ্দাম আর ভরাট হয়ে থাকত সে ঐ শহীদ।... কেবল ষাটের লেখকদের নয়, পঞ্চাশ-ষাটের প্রায় সব লেখকের মূলবিন্দু ছিল শহীদ। ওর বলিষ্ঠ মাদকতাপূর্ণ আকর্ষণ সবাইকে ওর দিকে টেনে নিত। আমাদের অগ্রজ লেখকদের থেকে শুরু করে সে-সময়কার তরুণতম লেখকটির যা ছিল সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত-সেই পশ্চিমি আধুনিকতার উন্মূল মনোভঙ্গি, নিঃস্বতা, বোদলেয়ার বা আমেরিকার বিটনিক সম্প্রদায়ের বেহিশেবি বোহেমিয়ান জীবনযাত্রা, কাম্যুর উপন্যাসের বহিরাগত মানুষ বা এলিয়টের ফাঁপা মানুষ- সবকিছুকে নিজের ভেতর ধারণ-করা এক রহস্যময় মানুষ ছিল ও।... ওর কোনো দল ছিল না। ও ছিল একা। নিজের নিঃশব্দ একক দলের একচ্ছত্র অধিপতি।'

ষাটের রেনেসাঁর এই যোগ্যতম প্রতিনিধির মৃত্যু হয় প্রবাসেই, যদিও তখনও তিনি স্বদেশকে একটি অঙ্গুরীর মতো নৈকট্যে রেখেছিলেন। মৃত্যুর বছর কয়েক আগে নিউইয়র্কে তার বাসগৃহে এক দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল তার সাথে মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, নিম্নবর্গের ইতিহাস-চর্চা, হাক্সলির দ্য ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়ে। মিশেল ফুকো, জাঁক দেরিদা এবং অন্যান্য ফরাসি দার্শনিককে নিয়ে প্রচুর আগ্রহ ছিল তার। তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ 'আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও'-র অনেক কবিতায় সেসব বিষয় ঘুরে-ফিরে এসেছে। দেশভাগ, বোদলেয়ার, এলিয়ট, গিন্সবার্গ, অবক্ষয়-চেতনা, স্বদেশ-চিন্তা, প্রেম-অপ্রেম, কোলাহল-নিঃসঙ্গতা এসবের ভেতর দিয়ে একাকী অচেনা মাছের মতো তিনি চলছিলেন এক বৃহত্তর মানব-কল্যাণবোধে, দীপিত-তাপিত হয়ে; আমি 'অন্য সাম্যবাদ' বলব (যা প্রথাগত আদলের সমাজতন্ত্রের ধারণার বাইরে)।

[ক্রমশ]

পরবর্তী খবর পড়ুন : পয়দলে নগর পরিক্রমা

অন্যান্য